শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে লরা ব্লার গোল্ডেন গোলে ভাঙে জট, সেবার বিশ্বকাপ জিতেছিল ফ্রান্স। ২৮ বছর পর ফিলাডেলফিয়ায় যেন ফিরে এল সেই গল্পেরই নতুন সংস্করণ। প্রথমার্ধজুড়ে পাঁচজনের রক্ষণভাগ সাজিয়ে প্যারাগুয়ে রীতিমতো শ্বাসরোধ করে রাখল টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্দান্ত খেলতে থাকা ফরাসি আক্রমণভাগকে। গোলমুখে কোনো শটই রাখতে পারেনি ফরাসি শিবির। বিরতির পর ম্যাচ ফুটবলের চেয়ে বেশি হয়ে উঠল মারমুখী লড়াই। ফাউল, ধাক্কাধাক্কি, অযথা সময়ক্ষেপণ, উসকানি আর বিশৃঙ্খলায় ভরে উঠল মাঠ। কিন্তু সেই উত্তপ্ত আবহেও মাথা ঠাণ্ডা রাখলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। দেজিরে দুয়ের আদায় করা পেনাল্টি নিখুঁতভাবে জালে পাঠিয়ে শুধু ফ্রান্সকে কোয়ার্টার ফাইনালেই তোলেননি, ফিরিয়ে এনেছেন ১৯৯৮ সালের সেই শিরোপা অভিযানের স্মৃতিও।
প্রথমার্ধে প্যারাগুয়ের রক্ষণশৈলী প্রশংসা কুড়ালেও বিরতির পর ম্যাচটি হারিয়ে ফেলে ফুটবলীয় সৌন্দর্য। খেলার চেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ফাউল, ধাক্কাধাক্কি, সময়ক্ষেপণ আর উসকানি। বল ছাড়াই এমবাপ্পেকে ফাউল করেন মাতিয়াস গালারজা, পরে জুল কুন্দেকেও কনুইয়ের আঘাতে মাটিতে ফেলে দেন। উত্তেজনার এক পর্যায়ে আন্দ্রেস কুবাসকে বুকে ঠেলে প্রতিক্রিয়া জানান এমবাপ্পেও। বারবার রেফারিকে ঘিরে প্রতিবাদ, পেনাল্টি স্পট নষ্ট করার চেষ্টা এবং প্রতিটি বিরতিকে দীর্ঘ করার কৌশলে ম্যাচের ছন্দ ভেঙে দেয় প্যারাগুয়ে। চরম শারীরিক ফুটবল খেলার পরও বিস্ময়করভাবে তাদের একজন খেলোয়াড়ও হলুদ কার্ড দেখেননি। উল্টো ফ্রান্সের মানু কোনো, মাইকেল অলিসে ও বারকোলা হলুদ কার্ড দেখেছেন।
শুরু থেকেই প্যারাগুয়ের পরিকল্পনা পরিষ্কার ছিল। ফ্রান্সকে জায়গা দেয়া যাবে না, গতি থামিয়ে দিতে হবে, বারবার খেলার ছন্দ ভেঙে দিতে হবে। পাঁচজনের রক্ষণভাগ, তার সামনে ঘন মাঝমাঠ, আর সামনে একা জুলিও এনসিসো—এই ছিল গুস্তাভো আলফারোর ছক। আগের রাউন্ডে জার্মানিকে টাইব্রেকারে বিদায় করা দলটি আবারো ম্যাচটাকে সে পথে নিয়ে যেতে চাইছিল। প্যারাগুয়ের ফুটবল ছিল সংকীর্ণ, কিন্তু কার্যকর। ফ্রান্সের আক্রমণভাগে এমবাপ্পে, ওসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিসে ও ব্র্যাডলি বারকোলা থাকলেও প্রথমার্ধে তারা প্রায় বন্দি হয়ে পড়েন প্যারাগুয়ের রক্ষণ দেয়ালের সামনে। ফরাসি ফরওয়ার্ড লাইনকে আটকাতে প্যারাগুয়ে বেছে নিয়েছিল কট্টর শারীরিক ফুটবলের পথ। বলের চেয়ে ফরাসি খেলোয়াড়দের শরীরকে লক্ষ্য করেই যেন বেশি চড়াও হচ্ছিলেন দক্ষিণ আমেরিকার দলটির ডিফেন্ডাররা।
দ্বিতীয়ার্ধের কিছু সময় পরও যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি ফরাসিদের হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, তখনই ডাগআউট থেকে মাস্টারস্ট্রোকটি দেন কোচ দিদিয়ের দেশম। দলের ফরওয়ার্ডরা যখন প্যারাগুয়ে ডিফেন্ডারদের ফাঁদে পা দিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন, তখন ৬০ মিনিটের মাথায় ব্র্যাডলি বারকোলাকে তুলে নিয়ে মাঠে নামানো হয় তরুণ প্রতিভা দেজিরে দুয়েকে। প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ে বারকোলার সতীর্থ এ উইঙ্গার মাঠে নেমেই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেন। বারকোলার মতো প্রচণ্ড গতি হয়তো দুয়ের নেই, কিন্তু তার দুর্দান্ত ড্রিবলিং ক্ষমতা প্যারাগুয়ের ক্লান্ত ডিফেন্ডারদের বড় পরীক্ষায় ফেলে দেয়।
মাঠে নামার মাত্র ৪ মিনিট পর ম্যাচের ৬৪তম মিনিটে বাঁ প্রান্ত থেকে এক অসাধারণ একক দৌড়ে প্যারাগুয়ের ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন দুয়ে। একে একে দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে তৃতীয় ডিফেন্ডারের মুখোমুখি হতেই দিয়েগো গোমেজ তাকে পেছন থেকে ফাউল করে মাটিতে ফেলে দেন। রেফারি তান্তাশেভ প্রথমে পেনাল্টির আবেদন নাকচ করে দিলেও ভিএআরের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত স্পট কিকের নির্দেশ দিতে বাধ্য হন।
প্যারাগুয়ের খেলোয়াড়রা পেনাল্টি স্পট নষ্ট করার চেষ্টা করে, সময়ক্ষেপণের সর্বশেষ কৌশল প্রয়োগ করে। কিন্তু সেসব কিছুই বিচলিত করতে পারেনি এমবাপ্পেকে। অরলান্ডো গিলকে ভুল দিকে পাঠিয়ে বল জালে পাঠালেন তিনি। গোলটি ছিল চলতি বিশ্বকাপে তার সপ্তম, বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে ১৯তম এবং নকআউট পর্বে ১১তম। মাত্র ১৯ ম্যাচে ১৯ গোল। নকআউট পর্বে তার গোলসংখ্যা এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে গেছে, যা ইতিহাসের বড় বড় নামকেও পেছনে ফেলছে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পুরো বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের গোলসংখ্যার সমান গোল শুধু নকআউটেই করে ফেলেছেন এমবাপ্পে। আর বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোলের দিক থেকে লিওনেল মেসির চেয়ে তিনি মাত্র এক ধাপ পেছনে।
এ ম্যাচে এমবাপ্পের গুরুত্ব শুধু গোলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ফ্রান্সের মানসিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন। প্যারাগুয়ে ম্যাচটাকে রুক্ষ ও বিরক্তিকর করে তুলেছিল। এমবাপ্পে সেই ফাঁদে পুরোপুরি পা দেননি। পেনাল্টিতে পিছিয়ে পড়ার পর প্যারাগুয়ে ভেঙে পড়েনি, বরং শেষ কুড়ি মিনিটে তারা মরিয়া হয়ে উঠল। মাইক মাইনান একবার দারুণ সেভে বাঁচালেন মারিসিওর শট, আর অতিরিক্ত সময়ে গিল নিজেও দুর্দান্ত দুটি সেভ করে এমবাপ্পেকে বঞ্চিত করলেন জোড়া গোল থেকে। শেষ ১০ মিনিট ফ্রান্সকে কাটাতে হলো এক অস্বস্তিকর উত্তেজনার মধ্য দিয়ে, যেন জয়টা হাতের মুঠোয় থেকেও পিছলে যেতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজতেই সেই আশঙ্কা মিলিয়ে গেল বাতাসে, আর ফ্রান্স নিশ্চিত করল কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট।
ম্যাচ শেষে এমবাপ্পের কণ্ঠে অবশ্য ম্যাচ নিয়ে কোনো অভিযোগ ছিল না। প্যারাগুয়ের শারীরিক ও বিশৃঙ্খল ফুটবলের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা হয়তো ভেবেছিল আমরা টাক্সিডো (স্যুট-বুট) পরে মাঠে কেবল সুন্দর ফুটবল খেলতে এসেছি। কিন্তু আমরা দেখিয়ে দিয়েছি, প্রয়োজনে আমরাও কুৎসিত ফুটবল খেলেও জিততে জানি। তাদের চেয়ে আমরা সব দিক দিয়েই এগিয়ে ছিলাম এবং শেষ পর্যন্ত জয় আমাদেরই হয়েছে।’
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচেও ঠিক একই রকম এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল ফরাসিরা। সেদিনও তাদের প্রতিপক্ষ ছিল হোসে লুইস চিলাভার্টের নেতৃত্বাধীন অতি রক্ষণাত্মক ও নাছোড়বান্দা প্যারাগুয়ে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে সেই ম্যাচেও ফ্রান্সকে গোল পেতে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত লরা ব্লার ঐতিহাসিক গোল্ডেন গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল ফ্রান্স এবং সেই কঠিন জয়টিই তাদের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের পথ সুগম করেছিল। সেদিনের সেই বিশ্বজয়ী দলের অধিনায়ক ছিলেন আজকের কোচ দিদিয়ের দেশম।
ফিলাডেলফিয়ার এ জয়ের পর দেশম হয়তো মনে মনে সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছেন। ১৯৯৮ সালের মতোই একটি অতি রক্ষণাত্মক ও শারীরিক খেলার দল প্যারাগুয়েকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রেখেছে তার দল।
আগামী বৃহস্পতিবার বোস্টনের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ মরক্কো। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এ মরক্কোকেই ২-০ ব্যবধানে হারিয়েছিল ফরাসিরা। বিশৃঙ্খল এক ম্যাচ জিতে এমবাপ্পে যে ইতিহাসের ছায়া ফিরিয়ে এনেছেন, তা শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে আরো একটি বিশ্বকাপ ট্রফি এনে দিতে পারে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।









