আমেরিকান স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড নাইকি ছেড়ে সুইস ব্র্যান্ড ‘অন’-এর সঙ্গে চুক্তি করেছেন ফরাসি ফুটবল সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপ্পে। নাইকি নয় বছর বয়স থেকে এমবাপ্পেকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছিল এবং রিয়াল মাদ্রিদের এ ফরওয়ার্ড তাদের মার্কারিয়াল বুট পরতেন। এবার তিনি একটি সাহসী ও বড় সিদ্ধান্ত নিলেন।
চুক্তির বিস্তারিত তথ্য কোনো পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি। তবে সুইস ব্র্যান্ডটি জানিয়েছে, ফরাসি সুপারস্টারকে নগদ অর্থে কিংবা শেয়ারের মালিকানা হস্তান্তর করতে পারে কোম্পানিটি।
‘অন’ স্পোর্টসওয়্যার একটি উদীয়মান ব্র্যান্ড। ২০১০ সালে রানিং জুতা প্রস্তুতকারক হিসেবে যাত্রা করা ‘অন’ ২০১৯ সালে সুইস টেনিস কিংবদন্তি রজার ফেদেরারকে সহমালিক হিসেবে যুক্ত করে। এবার তারা প্রবেশ করছে ফুটবলের বাজারে এবং ফ্রান্সের সাবেক ফুটবল গ্রেট থিয়েরি অঁরিকে তাদের ফুটবল ডিরেক্টর (পরিচালক) হিসেবে ঘোষণা করেছে। এমবাপ্পে তার এ নতুন স্পন্সরের বৈশ্বিক দূত (গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর) হওয়ার পাশাপাশি সরাসরি তাদের প্রডাক্ট টিমের সঙ্গে কাজ হবেন বলে ‘অন’-এর একটি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
নতুন চুক্তি নিয়ে এমবাপ্পে বলেন, ‘শুরু থেকেই ‘‘অন’’-এর যে বিষয়টি আমাকে আকর্ষণ করেছে, তা হলো একসঙ্গে সম্পূর্ণ নতুন কিছু তৈরি করার সুযোগ, যা আগামী দিনের ফুটবলকে নতুন রূপ দিতে সাহায্য করবে। আমি আমার অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমাদের উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত হতে চাই, উদ্ভাবনের মাধ্যমে সম্ভাবনার শেষ সীমা পর্যন্ত যেতে চাই এবং সবসময় ফুটবলের আসল আনন্দ ধরে রাখতে চাই। আমাদের একটি যৌথ স্বপ্ন আছে, আর এটি তো কেবল শুরু।’
‘অন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সহ-সিইও ডেভিড অ্যালেম্যান তাদের তাঁবুতে এমবাপ্পেকে সফলভাবে যুক্ত করার পর নিজেদের লক্ষ্য নিয়ে বলেন, ‘ফুটবলে একই কাজ বারবার করার জন্য নতুন কোনো স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ডের প্রয়োজন নেই। ফুটবলের প্রয়োজন নতুন আইডিয়া এবং সম্ভাবনার সীমানাকে চ্যালেঞ্জ করা। আমরা যখন কোনো খেলায় প্রবেশ করি, তখন আমরা সত্যিকারের উদ্ভাবন ও সমসাময়িক ডিজাইনের মাধ্যমে ভবিষ্যতের ব্র্যান্ড হতে চাই। আমাদের লক্ষ্য হলো ‘‘অন’’-এর এ দৃষ্টিভঙ্গিকে মাঠ, রাস্তা ও রানওয়েতে নিয়ে আসা; যা এলিট পারফরম্যান্সের সঙ্গে এ খেলার চারপাশের সংস্কৃতিকে যুক্ত করবে। ফুটবলের ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে সে স্বপ্ন দেখার জন্য কিলিয়ান আমাদের একদম উপযুক্ত সঙ্গী।’
ফ্রান্স, বার্সেলোনা ও আর্সেনালের সাবেক কৃতী স্ট্রাইকার থিয়েরি অঁরি ‘অন’-এর ভিশন নিয়ে বলেন, ‘ফুটবলে নতুন কিছু তৈরি করতে হলে একটি সাহসী ও মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন। গত এক বছরে আমি দেখেছি যে ‘‘অন’’ টিম এ প্রক্রিয়ায় কতটা কৌতূহল ও খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দেয়। আমরা খেলোয়াড়দের কথা শুনতে চাই, তাদের কী প্রয়োজন তা বুঝতে চাই এবং এমন কিছু তৈরি করতে চাই যা সত্যিই এ খেলায় নতুন কিছু যোগ করতে পারে। আগামী দিনের রূপরেখা তৈরির অংশ হতে পেরে আমি গর্বিত।’
২০২৫ সাল থেকে ‘অন’-এর সঙ্গে কাজ করা সিডনি শার্টেনলেইব এখন তাদের ফুটবলের প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ও টেস্টিং বিভাগে কাজ করবেন। কোম্পানিটি নিয়ে তিনি বলেন, ‘অন পারফরম্যান্স এবং ডিজাইন নিয়ে কতটা ভিন্নভাবে চিন্তা করে তা আমি এরই মধ্যেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। তাই ফুটবলে এর যাত্রার অংশ হতে পারাটা সত্যিই রোমাঞ্চকর। একজন খেলোয়াড় হিসেবে ‘‘অন’’-এর সঙ্গে সরাসরি কাজ করা এবং ডেভেলপমেন্ট প্রক্রিয়ায় নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার সুযোগ পাওয়াটা সত্যিই বিশেষ কিছু। আমি সততার সঙ্গেই বলতে পারি, টিম যে প্রডাক্টটি নিয়ে কাজ করছে, তাতে বলের যে স্পর্শ আমি পেয়েছি তা আগে কখনো অনুভব করিনি।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমবাপ্পের একটি বিবৃতি শেয়ার করা হয়েছে। তাতে লেখা ছিল, ‘ড্রিম অন, ফুটবল। আমি এখনো ফুটবল খেলার স্বপ্ন দেখি। যারা ফুটবলকে পেশা হিসেবে নিয়েছে, তাদের কাছ থেকে এমন কথা শুনলে হয়তো আপনারা অবাক হতে পারেন। কিন্তু এটাই সত্যি। আমি এখনো বন্ধুদের সঙ্গে খেলার স্বপ্ন দেখি। সূর্যাস্ত পর্যন্ত খেলে যাওয়া, রাতের খাবার পর্যন্ত খেলে যাওয়া। এটি কেবল একটি খেলা বলেই নয়, পেশা হয়ে ওঠার অনেক আগে যেমনটা খেলতাম।
‘যতদূর মনে পড়ে, আমি এ স্বপ্নটাই তাড়া করে বেড়িয়েছি। আরো একবার এটি আমাকে আমার জীবনের অন্যতম বড় পরিবর্তনের দিকে নিয়ে এসেছে। এখন আমি নিজেকে এমন কিছু উদ্ভাবকের মধ্যে আবিষ্কার করেছি, যারা আমার মতোই স্বপ্ন দেখে।’
নাইকি থেকে এমবাপ্পের বিদায়ের আগে আমেরিকান এ বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডটি ছেড়ে দিয়েছেন বার্সেলোনার সুপারস্টার লামিনে ইয়ামালও। স্পেনের হয়ে এ বছর বিশ্বকাপ জয় করা ইয়ামাল যোগ দিয়েছেন অ্যাডিডাসের সঙ্গে।
নাইকির অন্যতম বড় নাম হয়ে দীর্ঘদিন চুক্তিবদ্ধ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তার বয়স ৪১ বছর হয়ে যাওয়ায় কোম্পানিটি এমবাপ্পের মতো ইনফর্ম সুপারস্টারের দিকে বেশি ঝুঁকছিল। যদিও তিনি আর থাকলেন না আমেরিকান পরাশক্তির সঙ্গে। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ জয়, ২০২২ বিশ্বকাপে অনবদ্য পারফরম্যান্স ও ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটজয়ী এমবাপ্পে ছিলেন এ বছর উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ঘিরে নাইকির ফুটবল মার্কেটিংয়ে প্রাণ। এবার তিনি ঠিকানা গড়লেন ‘অন’-এর সঙ্গে।
২০০৬ সালে কিশোর বয়সে নাইকির সঙ্গে যোগ দেন এমবাপ্পে। তিনি প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি), ফ্রান্স জাতীয় দল ও বিশ্বকাপে ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোলের মালিক। তাকে হারানোটা নাইকির জন্য বড় ধাক্কাই। যদিও ফ্রান্স জাতীয় দলের কিট সরবরাহকারী হিসেবে ফেডারেশনের সঙ্গে ২০৩৩-৩৪ সাল পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন করেছে নাইকি। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগকে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বল সরবরাহ করে আসছিল নাইকি, যে চুক্তিটা গত বছর হারিয়ে ফেলে তারা। তাদের জায়গা নেয় পুমা। যদিও সে সময় তারা জার্মানি জাতীয় দলের সঙ্গে কিট অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট চুক্তিটা পেয়ে যায়, যা শুরু হবে ২০২৭ সালে।
এক বিবৃতি দিয়ে এমবাপ্পের জন্য শুভকামনা জানিয়েছে নাইকি, ‘দুই দশক ধরে আমরা একত্রে কাজ করে ফুটবলকে বদলে দিতে ভূমিকা রেখেছি। তিনি ছিলেন নাইকি ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাঠে ও মাঠের বাইরে একসঙ্গে যা কিছু অর্জন করেছি তা নিয়ে আমরা গর্বিত। তিনি তার ক্যারিয়ারের পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করায় আমরা তার জন্য অফুরন্ত শুভকামনা জানাই। আশা করি, তিনি ভবিষ্যতে সফলতা অর্জন করবেন।’
এমবাপ্পের মতো সুপারস্টারকে হারিয়ে ফেললেও নাইকির তাঁবুতে এখনো আছেন আর্লিং হালান্ড, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, অ্যালেক্সিয়া পুতেলাস ও স্যাম কেরের মতো তারকা।
ইএসপিএন, সিএনবিসি ও রয়টার্স










