বদলি হিসেবে মাঠে নামার মাত্র ২ মিনিটের মাথায় গোল করে স্পেনকে তাদের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিতে তুললেন আর্সেনালের এ স্ট্রাইকার। শেষ মুহূর্তের গোলে স্পেনকে জেতানোর পর মিকেল মেরিনো বলেছেন, তার যেন নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না। স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেও শিষ্যর পারফরম্যান্সে ভীষণ মুগ্ধ।

দলকে জেতানোর পর মেরিনো যেন অনুভূতি প্রকাশের ভাষা হারিয়ে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘আমি আসলে বুঝতে পারছি না কী বলব। আমার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না। এটা একবার করতে পেরে ভাবছিলাম, হয়তো সহসাই এমনটা আর হবে—কিন্তু আবারো এমনটি করতে পেরেছি। আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি, তবে আমার মনে হয় না এটা ভাগ্যের জোরে হয়েছে। এটা আসলে সময়মতো আপনার তৈরি থাকার ব্যাপার। কাজেই আমাকে শেষ কয়েক মিনিটে গোল করতে দেখে বিস্মিত হবেন না, কেননা আমি যখনই মাঠে নামি, মানসিকভাবে তৈরি থাকি। তবে এটাও ঠিক, টানা দুই ম্যাচে বদলি হিসেবে দলকে সাহায্য করতে পারাটা পরাবাস্তব মনে হয়। আমার সতীর্থরা তো আমাকে বলছিল: “‍তুমি তো আবার গোল করতে যাচ্ছ।” আমি সবসময়ই দলের উন্নতিতে ও দলকে সাহায্য করতে চাই।’

বদলি হিসেবে নেমে স্পেনকে জেতানোর কাজটি তিনি এই প্রথমবার নয়—করে যাচ্ছেন বারবার।

দুই বছর আগে জার্মানির মাঠে স্বাগতিক জার্মানির বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের ১১৯তম মিনিটে গোল করেন মেরিনো। কোয়ার্টার ফাইনালের চারদিন আগে পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে ৯১তম মিনিটে স্পেনের জয়সূচক গোলটিও তারই করা। এবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের মতো দলের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোলে জেতালেন স্পেনকে। বড় ম্যাচ, ইউরোপের তিন পরাশক্তির বিপক্ষে স্পেনের জয়সূচক গোল করে নায়ক মিকেল মেরিনো।

৩০ বছর বয়সী মিকেল মেরিনো মূলত একজন মিডফিল্ডার। তবে খেলার গতিপ্রকৃতি তিনি দারুণভাবে বুঝতে পারেন বলেই সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় গিয়ে হাজির হন। কুবারসির শটটা বেলজিয়ান গোলকিপার গ্লাভসে জমাতে পারলেন না, বল গ্রিপ থেকে বেরিয়ে সামনে আসতেই দ্রুত বাম কোনা দিয়ে জালে জড়িয়ে দেন মেরিনো।

জয় শেষে মেরিনোকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তিনি বলেন, ‘মিকেল (মেরিনো) অবিশ্বাস্য। তার দক্ষতা অনেক। সে বিশ্বকাপের অন্যতম খেলোয়াড় যাকে যখন যে পজিশনে নিয়োগ করা হবে, সেখানেই খেলতে সমর্থ এবং দুর্দান্ত পারফর্ম করছে। আমাদের জন্য সে হলো এ ধারণার ও এ মডেলের একটা মানদণ্ড। তাকে ও অন্যদের পেয়ে আমি খুশি, তবে বিশেষ করে তার জন্য আমি খুশি। আমরা জানি, অব্যর্থভাবে সে সঠিক জায়গায় থাকবে। খেলাটি বোঝার কারণে সে সেরা স্ট্রাইকার ও সেরা মিডফিল্ডার হতে পারে। সে সঠিকভাবে খেলাটি বুঝতে পারে। সে অঙ্গীকারবদ্ধ আর উদারও। সানন্দে নিজের কাজটি করে যায় সে।’

ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার ওয়েন রুনি স্পেনের তারকাকে নিয়ে বলেন, ‘মেরিনো এমন কিছু খেলোয়াড়ের একজন যারা সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় গিয়ে হাজির হয়।’

টানা দুই ম্যাচে স্পেনের জয়ের নায়ক মেরিনোর জায়গা হয় না মূল একাদশে। তাকে খেলতে হয় বদলি হিসেবে। মেরিনো ও বাকিদের নিয়ে স্পেন কোচ পড়েছেন মধুর সমস্যায়। বেশির ভাগ দলের কোচই প্রত্যাশামতো স্ট্রাইকারের অভাব অনুভব করেন। আর স্পেন কোচ কাকে রেখে কাকে খেলাবেন, সেই সমস্যায় পড়েন। বিষয়টি তিনি উপভোগই করছেন। বেলজিয়ামকে হারানোর পর লা ফুয়েন্তে জানান, স্পেনের শক্তি কেবল সেরা খেলোয়াড়রা নয়, তাদের মধ্যে থাকা পারস্পরিক সম্মান ও ঐক্যও। দলে জায়গা পাওয়ার জন্য তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা সত্ত্বেও খেলোয়াড়দের কীভাবে সন্তুষ্ট রাখছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে স্পেন কোচ খেলোয়াড়দের পরিপক্বতা ও পেশাদারত্বের প্রশংসা করেন।

২০১০ সালে প্রথমবার সেমিফাইনালে উঠে শিরোপা জয় করে স্পেন। ‘লা রোজা’রা ১৬ বছর পর আরেকবার সেমিতে জায়গা করে নিয়েছে। এ সাফল্যের পেছনে দলের সম্মিলিত অবদান দেখছেন দে লা ফুয়েন্তে। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দল। ম্যাচ কারা শুরু করল তা কোনো বিষয় নয়। প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি যারা খেলেনি তারাও। দল হিসেবে আমাদের অন্যতম শক্তি হলো—আমাদের কেবল বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়রাই নেই, বরং ভালো মনের কিছু মানুষও আছে, যারা একে অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে থাকাটা সহজ করে তোলে। তাই তারা নিজেদের ভূমিকা বুঝতে পারে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ আমি বিশ্বাস করি, যেকোনো ক্ষেত্রেই, যেকোনো পেশায় এটা সম্ভব। পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতেই আমরা সবকিছু গড়ে তুলেছি, আর এই জাতীয় দলও তার একটি উদাহরণ।’

এ ম্যাচে অভিজ্ঞ পেদ্রিকে বসিয়ে ফাবিয়ান রুইজকে শুরুর একাদশে খেলান তিনি। ৩০তম মিনিটে দলকে এগিয়ে নেন রুইজ। ৭৯তম মিনিটে মিকেল ওয়ারজাবালকে তুলে নামান মেরিনোকে। মাঠে নামার ২ মিনিটের মাথায় বেলজিয়ামের গোলকিপারের ভুলের সুযোগ নিয়ে ব্যবধান গড়ে দেন মেরিনো।

একের পর এক ম্যাচে বদলি নেমে ব্যবধান গড়ে দেয়া মেরিনোর শুরুর একাদশে জায়গা না পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এ নিয়ে দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘মিকেলের শুরু থেকে খেলতে না পারাটা অন্যায্য, তবে অন্য আরেকজনকে বাদ দেয়াটাও তো অন্যায় হতো। কেবল ১১ জনই খেলতে পারে। তারা এটা বোঝে—কোন মুহূর্তে তাদের কী ভূমিকা পালন করতে হবে। তারা যখন মাঠে নামে, তারা জানে তাদের কী করতে হবে। এ কারণেই তাদের কোচ হতে পারাটা আনন্দের।’