টেনিসের এক বর্ণিল অধ্যায়ের সমাপ্তি। বিদায় নিলেন এক চ্যাম্পিয়ন, এক গ্ল্যাডিয়েটর। আমেরিকান কৃষ্ণকলি সেরেনা উইলিয়ামসকে আর টেনিস কোর্টে লড়তে দেখা যাবে না। বিদায়ের ঘোষণা তিনি আগেই দিয়ে রেখেছিলেন। দারুণ দুটি জয়ে উঠে যান তৃতীয় রাউন্ডে। যদিও এরপর আর এগোনো হলো না আমেরিকান সুপারস্টারের। তৃতীয় রাউন্ডে শেষ হলো তার শেষ যাত্রা। অস্ট্রেলিয়ান তারকা আইলা টমলিয়ানোভিচের কাছে ৭-৫, ৬-৭ (৪-৭) ও ৬-১ গেমে হেরেছেন সেরেনা। এর সঙ্গে থেমে গেল টেনিস কোর্টে এ কিংবদন্তির ২৫ বছরের পথচলা।

চোটের জন্য গত কয়েক বছর কোর্টে নিয়মিত ছিলেন না ৪১ বছরে পা দিতে চলা সেরেনা। সর্বশেষ গ্র্যান্ড স্লাম জেতেন ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে, যখন তিনি আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা! কন্যাসন্তান অলিম্পিয়ার মা হিসেবে এরপর ফিরেছেন টেনিসে, তবে আগের সেই লড়াকু সেরেনাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। অবশ্য মাঝের এই সময়ে যে একেবারে যাচ্ছেতাই পারফর্ম করেছেন তা নয়। বেশ একাধিক গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে উঠে মার্গারেট কোর্টের সর্বোচ্চ ২৪ গ্র্যান্ড স্লাম জয়ের রেকর্ড ছোঁয়ার সুযোগ এসেছিল। অল্পের জন্য সেই সুযোগ হারিয়েছেন। এবার ইউএস ওপেনে শেষ সুযোগও কাজে লাগাতে পারলেন না। তাই উন্মুক্ত যুগে মেয়েদের টেনিসে গ্র্যান্ড স্লাম জয়ে তাকে দ্বিতীয় হয়েই থাকতে হলো।

১৯৯৯ সালে জয় করেন প্রথম গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা। সেই থেকে একে একে জিতেছেন মোট ২৩টি গ্র্যান্ড স্লাম মুকুট। বড় বোন ভেনাস উইলিয়ামসের সঙ্গে জুটি বেঁধে ডাবলসেও ১৪টি গ্র্যান্ড স্লাম জিতেছেন সেরেনা। সিঙ্গেল ও ডাবলস মিলিয়ে অলিম্পিকে চারবার স্বর্ণপদক জেতেন এ কিংবদন্তি।

তিনি উইমেন্স টেনিস অ্যাসোসিয়েশনের (ডব্লিউটিএ) র্যাংকিংয়ে ৩১৯ সপ্তাহ এক নম্বরে ছিলেন, যা তৃতীয় সেরার রেকর্ড। সাবেক জার্মান কিংবদন্তি স্টেফি গ্রাফ শীর্ষে ছিলেন সর্বোচ্চ ৩৭৭ সপ্তাহ। যিনি ২২ বার গ্র্যান্ড স্লাম জয় করেন। টানা ১৮৬ সপ্তাহ এক নম্বরে থাকার যৌথ রেকর্ড রয়েছে গ্রাফ ও সেরেনার।

১৯৯৫ সালে ১৪ বছর বয়সে পেশাদার টেনিসে যাত্রা সেরেনার। এরপর ১ হাজার ১৪ ম্যাচ খেলে জিতেছেন ৮৫৬টি। সেরেনা এ নিয়ে স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, এটা দীর্ঘ সময়। আমি তো আমার গোটা জীবনই টেনিস খেলেছি। এটা খুব দ্রুতই হয়ে গেল। তবে আমি এটা চেয়েছিলাম, এটা আমি চাই। কিন্তু এটা কষ্টের কান্না নয়, আপনারা জানেন?

তার বিদায়ে শুভকামনা জানিয়ে টুইট করেছেন ক্রীড়াঙ্গনের বড় তারকারা। যুক্তরাষ্ট্রের বাস্কেটবল গ্রেট লেব্রন জেমস বলেছেন, আমি যে কোথা থেকে শুরু করি। তুমি একজন গোট (গ্রেট অব অল টাইম)। তুমি টেনিস ও নারীদের জন্য যা করেছ তা নজিরবিহীন। তোমার যাত্রা দেখাটাও ছিল সম্মানের।

সাবেক গ্র্যান্ড স্লাম বিজয়ী বেলজিয়ান তারকা কিম ক্লিস্টার্স বলেছেন, এখন ট্যুরে অসংখ্য মেয়ে খেলছে যারা তাদের গোটা শৈশবকালে সেরেনাকে দেখে বড় হয়েছে। তার সঙ্গে বেশকিছু বছর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পেরেছি বলে আমি ভাগ্যবান। তিনি তো ক্রীড়াকেও ছাপিয়ে গেছেন। খেলাধুলা আর নারীদের জন্য সেরেনা ও ভেনাস যা করেছেন তা অনন্য। আমি এখন যুক্তরাষ্ট্রে থাকি। সেখানে নন-টেনিস মানুষের ওপরও সেরেনার বিরাট প্রভাব।

২০০২, ২০১৩ ও ২০১৫ সালে ফ্রেঞ্চ ওপেন জয় করেন সেরেনা। তাকে নিয়ে রোলাঁ গাঁরোর অফিশিয়াল টুইটার পেজে বলা হয়েছে, আর কখনই অন্য রানী আসবে না।

অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতেছেন সাতবার। প্রথম শিরোপা জেতেন ২০০৩ সালে। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের অফিশিয়াল পেজে লেখা হয়েছে, টেনিসের চেয়েও বেশি কিছু। অন্যতম সেরার চেয়েও বেশি কিছু। আমরা যতটা বলতে পারি, তুমি তার চেয়েও বেশি কিছু। কিংবদন্তিতুল্য এ ক্যারিয়ারের জন্য অভিনন্দন।

সেরেনার অন্যতম ঘাঁটি উইম্বলডন। অল ইংল্যান্ড ক্লাবে শিরোপা জিতেছেন মোট সাতবার। উইম্বলডনের টুইটার পেজে বলা হয়েছে, একজন খেলোয়াড়, একটি ক্যারিয়ার ও একটি গল্প হিসেবে তিনি সবার চেয়ে আলাদা। ধন্যবাদ সেরেনা। শুধু সংখ্যার বিচারে উত্তরাধিকারের সংজ্ঞা করা হয় না, এটা করা হয় তিনি কত মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছেন তার ওপর ভিত্তি করে। আমাদের খেলার প্রতি যে অসংখ্য মানুষ ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়েছেন, এজন্য সেরেনা আপনাকে ধন্যবাদ। আমেরিকান টক শো গ্রেট অপরাহ উইনফ্রে লিখেছেন, ২৫ বছর। চ্যাম্পিয়ন। কিংবদন্তির অমর হোক।