যখন টেমসের পাড় থেকে আসা ব্রিটিশ অহংকার গ্যালারিজুড়ে জয়ের সুবাস ছড়াচ্ছিল, টমাস টুখেলের রক্ষণাত্মক দেয়াল আর জর্ডান পিকফোর্ডের গ্লাভস যখন হয়ে উঠেছিল দুর্ভেদ্য, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে মহাজাগরণ। জিউসের বজ্র যেন এনজোর পায়ে, আটলাসের কাঁধে লাউতারো। একজন দূর থেকে ছুড়লেন আগুন, আরেকজন মাথায় তুলে নিলেন গোটা আকাশ।

ম্যাচের ৮৪ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড। কর্নার থেকে বল পেয়েছিলেন মেসি, ছোট করে খেলেছিলেন রদ্রিগো ডি পলকে। ডি পল আবার ফিরিয়েছিলেন লিওর কাছে। সেখান থেকে বল যায় আবার এনজোর পায়ে। আকাশ চিরে নেমে আসা এক ঝড়ের মতো এনজোর সেই বুলেট গতির শট পিকফোর্ডকে কোনো সুযোগ না দিয়ে আছড়ে পড়ল ইংল্যান্ডের জালে। স্তব্ধতা ভেঙে গ্যালারি রূপ নিল এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরিতে। মিনিট কয়েক আগেই দূরপাল্লার এক শট তিনি পাঠিয়েছিলেন বারের ওপর দিয়ে, ইংলিশ গোলরক্ষক কর্নারের বিনিময়ে বাঁচিয়েছিলেন সেটি। কিন্তু হার মানার পাত্র ছিলেন না চেলসির এ মিডফিল্ডার।

কিন্তু মহাকাব্যের শেষ অংকটা তো তখনো বাকি ছিল, যার চিত্রনাট্য যেন ডাগআউটের এক কোনায় বসে নিভৃতে লিখছিলেন আরেকজন। বেঞ্চে বসে সতীর্থদের কানে কানে যে প্রতিজ্ঞার কথা শুনিয়েছিলেন লাউতারো মার্টিনেজ, মাঠে নেমে তার প্রতিদান দেয়ার সময় এসে গিয়েছিল। বিশ্বকাপে নিজের শুরুর একাদশ হারানোর বেদনা, ফর্মের জন্য তীব্র সমালোচনা আর বেঞ্চের সেই দীর্ঘ নীরবতা—সবকিছুকে এক নিমেষে এক পাশে সরিয়ে রেখে তিনি হয়ে উঠলেন অদম্য। ম্যাচের ৯১তম মিনিটে যখন লিওনেল মেসির বাঁ পায়ের সেই জাদুকরী, শূন্যে ভাসানো নিখুঁত ক্রসটি পেনাল্টি বক্সের ভেতরে ধেয়ে আসছিল, তখন লাউতারো মার্টিনেজ যেন শুধু লাফিয়ে ওঠেননি; তিনি বাতাসে ভেসেছিলেন আর্জেন্টিনার কোটি মানুষের আজন্মলালিত স্বপ্ন বুকে নিয়ে। নিখুঁত টাইমিংয়ের মতো শূন্যে ভেসে মাথা ছোঁয়ালেন বলটিতে, আর তাতেই ইংল্যান্ডের সব প্রতিরোধ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে বল জড়াল জালে।

অথচ এ বিশ্বকাপে লাউতারোর পথটা মসৃণ ছিল না। শুরুতে ছিলেন প্রথম একাদশে, পরে জায়গা ছাড়তে হয়েছিল হুলিয়ান আলভারেজকে বক্সের কেন্দ্রে ফেরানোর জন্য। বেঞ্চে বসেও হাল ছাড়েননি এ বৃষ। এর আগে মিসরের বিপক্ষে ম্যাচের শেষদিকে এনজো ফার্নান্দেজের মাথায় নিখুঁত ক্রস বাড়িয়েছিলেন তিনিই। সুইসদের বিপক্ষেও গোল করেছেন।

ম্যাচ শেষে লাউতারো বলছিলেন, আলেক্সিসকে তিনি আগেই বলে রেখেছিলেন গোল করবেন। ফাকু মেদিনাকেও বেঞ্চে বসে বলেছিলেন, মাঠে নেমে জেতাবেন দলকে। এবার তার পালা ছিল। ঠাণ্ডা মাথায় তিনি বিশ্লেষণ করছিলেন পুরো ম্যাচটা। ইংল্যান্ড ৬০ মিনিট চাপ ধরে রেখেছিল, তারপর ক্লান্ত হয়ে রক্ষণে গুটিয়ে গিয়েছিল, আর সেই ফাঁকেই মাঠ চওড়া করে গোল দুটো তুলে নেয় আর্জেন্টিনা। তিন বছর পর আবার তারা বিশ্বকাপের ফাইনালে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে হয়তো এ ম্যাচটি অনেকেই মনে রাখবেন মেসির আরেকটি জাদুকরী রাত হিসেবে। কিন্তু আর্জেন্টিনার সমর্থকদের স্মৃতিতে আরো দুটি নামও খোদাই হয়ে থাকবে চিরকাল—যখন এনজো ফার্নান্দেজ জেগে উঠেছিলেন ঘুমন্ত সিংহের মতো, আর লাউতারো মার্টিনেজ অবশেষে মুক্তি পেয়েছিলেন নিজেরই ভেতরে জমে থাকা অভিমানের কারাগার থেকে।