ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করতে পারেননি হালান্ড। তার দল নরওয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে বিদায় নিয়েছে এবারের আসর থেকে। সময়ের হিসাবে ৬৩৬ দিন পর হালান্ডকে গোলহীন রাখল কোনো দল। গোল করাটা যেন অভ্যাস নয়, হালান্ডের কাছে হয়ে উঠেছিল একটা নিয়ম। টুর্নামেন্ট বদলায়, মাঠ বদলায়, প্রতিপক্ষ বদলায়—তবে বদলাননি হালান্ড। নরওয়ে কিংবা ম্যানচেস্টার সিটি—যেকোনো দলের জার্সিতেই তার কাজ যেন গোল করো আর প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করো। সেটাই তিনি করে গেছেন প্রতিনিয়ত। ঐতিহাসিক ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপেও একের পর এক রূপকথা লিখে তিনি এবার বিদায় নিলেন।

জোড়া গোলে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে বাড়ি পাঠিয়ে চলতি আসরের আলোচিত নাম হয়ে ওঠেন হালান্ড। ইরাকের বিপক্ষে দুটি ও সেনেগালের বিপক্ষে দুটি গোল করা হালান্ডকে ফ্রান্স ম্যাচে খেলাননি নরওয়ের কোচ। শেষ বত্রিশে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে করেন এক গোল। এরপর ব্রাজিল ম্যাচে তার জাদুকরী জোড়া গোলে বিমোহিত হয় গোটা বিশ্ব। কোটি কোটি সেলেসাও সমর্থককে কাঁদিয়ে জোড়া গোল করেন তিনি। সেই পারফরম্যান্সে তার ওপর নরওয়ের প্রত্যাশাও যেন বেড়ে যায় বহুগুণ। যদিও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে দীর্ঘদেহী এ স্ট্রাইকারকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখতে সমর্থ হয় ইংল্যান্ডের ডিফেন্স। কোয়ার্টার ফাইনালে ২-১ গোলে জিতে সেমিফাইনালে উঠে যায় ইংলিশরা। এ হারের মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে যায় নরওয়ের ইতিহাসে সেরা বিশ্বকাপ অভিযানও।

টুর্নামেন্টে নিজের প্রথম চার ম্যাচে সাত গোল করা হালান্ড এবার প্রথমবারের মতো গোলশূন্য থাকলেন। পুরো ম্যাচে তিনি মাত্র দুটি শট নিতে পেরেছেন, যার একটি ছিল লক্ষ্যে। ইংল্যান্ডের তরুণ মিডফিল্ডার মর্গান রজার্স ম্যাচের আগের দিন বলেছিলেন, হালান্ডের বল পাওয়ার সাপ্লাই চেইনটা কেটে দিতে চান তারা। হালান্ডকে এদিন বলই পেতে দেননি তারা, ফলে ম্যাচজুড়েই ছিলেন বেশ নিষ্প্রভ। আর হালান্ডের নিষ্প্রভতায় নরওয়েকেও হারতে হয়েছে ম্যাচটি। অতিরিক্ত সময়ের শেষ ১৫ মিনিটে তাকে আর না খেলানোর সিদ্ধান্ত নেন নরওয়ের কোচ স্টালে সলবাক্কেন। হালান্ডের বদলি হিসেবে মাঠে নামেন স্ট্র্যান্ড লারসেন।

হালান্ডকে তুলে নেয়ার বিষয়ে কোচ সলবাক্কেন বলেন, ‘তাকে তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত কঠিন ছিল না। ও পুরোপুরি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। হয়তো আরো ১০ মিনিট আগেই বদলি করা উচিত ছিল। এছাড়া দ্বিতীয়ার্ধে ওর পায়েও চোট লাগে। ক্লান্তি আর সেই চোট মিলিয়ে ও যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছে।’ ম্যাচ শেষে হালান্ডও স্বীকার করেন, ম্যাচ যত গড়িয়েছে ততই তার শক্তি ফুরিয়ে যাচ্ছিল।

ইংল্যান্ডের পরিকল্পনাই ছিল হালান্ডকে বল থেকে দূরে রাখা। ম্যানচেস্টার সিটিতে তার সঙ্গে খেলা ফুটবলারদের অভিজ্ঞতাও সেই কৌশল নির্ধারণে এদিন বেশ কাজে লাগে। টমাস টুখেলের দল সেই পরিকল্পনায় সফল হয় দারুণভাবে।

হালান্ড না পারলেও পেরেছেন বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে তার সাবেক সতীর্থ জুড বেলিংহ্যাম। তিনি জোড়া গোল করে ইংল্যান্ডের জয়ের নায়ক। ম্যাচ শেষে দুই তারকা একে অন্যকে আলিঙ্গন করেন। এরপর ধীর পায়ে মাঠ ছেড়ে ড্রেসিং রুমে ফিরে যান হালান্ড। তবে দুজনের ড্রেসিং রুমে ফেরাটা এদিন ছিল ভিন্ন অনুভূতি নিয়ে। হালান্ড চলতি আসরে আর মাঠে ফিরছেন না, বেলিংহ্যাম ফিরবেন সেমিফাইনালে।

সেমিতে উঠতে ব্যর্থ হলেও হাসিমুখেই বাড়ি ফিরছেন নরওয়ের প্রাণভোমরা হালান্ড। বিশ্বকাপে আসার আগেই তিনি ছিলেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা। তবে এ আসরে তার লম্বা দেহ, স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব ও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাকে আরো জনপ্রিয় করে তুলেছে। তার জীবনযাপন নিয়ে তৈরি হয়েছে বহু স্টোরি। তিনি নিজেও জানেন, এ আসর তাকে খ্যাতির তুঙ্গে পৌঁছে দিয়েছে। ম্যানচেস্টার সিটির এ মহাতারকা বলেন, ‘সত্যি বলতে, এই বিশ্বকাপ আমার জীবনই বদলে দিয়েছে। এটা ছিল অভাবনীয় এক যাত্রা।’

হারলেও নরওয়ের ইতিহাসে এটিই সেরা বিশ্বকাপ অভিযান। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে আরো ভালো করার লক্ষ্য নিয়েই সামনে এগোতে চান হালান্ড। তার ভাষায়, ‘আমার মনে হয়, আমরা নরওয়েকে বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে তুলে ধরতে পেরেছি।’