সংখ্যার ভাষায় দেখলে মনে হতে পারে, লামিনে ইয়ামালের বিশ্বকাপ খুব একটা উজ্জ্বল নয়। অথচ মাঠের গল্প বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। স্পেন যখন ২০১০ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে, তখন তাদের সবচেয়ে বড় আক্রমণাত্মক অস্ত্রের নাম কিন্তু লামিনে ইয়ামালই।

পরিসংখ্যানের গোলকধাঁধায় যারা শুধু সংখ্যার খোঁজে ঘোরেন, তাদের জন্য চলতি বিশ্বকাপে ইয়ামালের খতিয়ানটি এক অদ্ভুত ধাঁধা। ছয়টি ম্যাচে ৪০৫ মিনিট মাঠে থেকে তার নামের পাশে গোল মাত্র ১টি, অ্যাসিস্টের ঘর শূন্য। কিন্তু এ তথাকথিত ‘অনূর্ধ্ব’ পারফরম্যান্সের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভিন্ন রূপকথা। টুর্নামেন্টে এ পর্যন্ত ১৫টি শট নিয়েছেন তিনি। যার মধ্যে ১০টিই ছিল অন-টার্গেট বা লক্ষ্যভেদী। তার পা থেকে আসা ১৮৮টি পাসের মধ্যে ১৫৬টিই ছিল নিখুঁত, যার পাস কমপ্লিশন রেট ৮২ শতাংশ। ৪০ বার ড্রিবল করার দুঃসাহস দেখিয়েছেন প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের ব্যূহ ভেদ করতে। যার মধ্যে ২১ বারই তিনি সফল হয়েছেন—শতকরা হিসেবে যা ৫২.৫ শতাংশ। এই শুষ্ক সংখ্যাগুলো আসলে মাঠের সেই দৃশ্যপটকে বোঝাতে পারে না, যেখানে ইয়ামাল বল পাওয়া মাত্রই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে অদৃশ্য সাইক্লোন তৈরি হয়। তিনি যখন ডান প্রান্ত দিয়ে ডিফেন্ডারদের নাচিয়ে ভেতরে ঢোকেন, তখন পুরো স্টেডিয়ামের শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে।

১৮ বছর বয়সী এ বিস্ময়বালককে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। ইউরো ২০২৪-এ এক গোল ও টুর্নামেন্ট-সেরা চার অ্যাসিস্ট করে স্পেনকে শিরোপা জেতানো ফুটবলারকে অনেকেই ভেবেছিলেন বিশ্বকাপেও গোলের বন্যা বইয়ে দেবেন। কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে ভিন্ন। ছয় ম্যাচে মাত্র এক গোল। তবু স্পেনের প্রতিপক্ষ কোচদের প্রথম আলোচনার বিষয়টি এখনো ইয়ামালই। ইয়ামাল বল পেলেই দুই বা তিনজন ডিফেন্ডার তার দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে অন্য পাশে কিংবা মাঝমাঠে তৈরি হয় বাড়তি জায়গা। সেই ফাঁক কাজে লাগিয়ে এগিয়ে আসেন মিকেল ওইয়ারসাবাল, নিকো উইলিয়ামস, পেদ্রি কিংবা দানি ওলমোরা। স্পেনের আক্রমণ এখন আর একজনের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং ইয়ামাল প্রতিপক্ষকে ব্যস্ত রাখেন, আর তার সতীর্থরা আঘাত হানেন। এ বিশ্বকাপে স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তিও সম্ভবত এটিই। কোনো ম্যাচে ইয়ামাল গোল না করলেও দল থেমে থাকছে না। মিকেল ওইয়ারসাবাল এরই মধ্যে তিন গোল করেছেন। ফুলব্যাক মার্ক কুকুরেয়াও আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

এ কারণেই বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে গোল না করেও ম্যাচসেরা নির্বাচিত হয়েছেন ইয়ামাল। পুরো ম্যাচে ডান প্রান্তে তার গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি বেলজিয়ান ডিফেন্ডাররা। বারবার ওয়ান অন ওয়ান পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, রক্ষণকে ভেঙেছেন, বিপজ্জনক এলাকায় বল পৌঁছে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত গোল না এলেও ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণে তার অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি।

ম্যাচ শেষে নিজের গোলখরার প্রসঙ্গ উঠতেই ইয়ামালের উত্তর ছিল পরিণত এক তারকার মতো। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমি গোল করতে চাই। কিন্তু মাঠে নামি দলকে সাহায্য করার জন্য। আমরা যদি বিশ্বকাপ জিতি, কেউ মনে রাখবে না আমি কত গোল করেছি। গুরুত্বপূর্ণ হলো দল জিতছে কিনা। আমি জানি, গোল না করেও আমি অবদান রাখতে পারি।’ ১৮ বছর বয়সে এমন উপলব্ধি খুব কম ফুটবলারের মধ্যেই দেখা যায়। আধুনিক ফুটবলে ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের চেয়ে দলীয় কাঠামোর গুরুত্ব যে কতটা, ইয়ামাল যেন সেটিই মাঠে প্রমাণ করছেন।

শতবর্ষের ইতিহাসে কত শত কিশোরের উত্থান-পতন দেখেছে বিশ্বকাপের মঞ্চ। কিন্তু ইয়ামাল এ বয়সেই ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে বসেছেন। সৌদি আরবের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে তিনি স্পেনের হয়ে প্রথম গোলটি করেন। ১৮ বছর ১১ মাস ৮ দিন বয়সে করা সেই গোল তাকে স্পেনের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ গোলদাতার আসনে বসায়। একই সঙ্গে ১৯৫৮ সালের পর বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচের উদ্বোধনী গোল করা সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলারদের তালিকাতেও উঠে আসে তার নাম।

তবে গোলের চেয়েও বড় কীর্তি গড়েছেন ম্যাচ খেলে। বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে মাঠে নেমে বিশ্বকাপে ছয় ম্যাচ খেলা প্রথম ১৮ বছর বা তার কম বয়সী ফুটবলার হয়েছেন ইয়ামাল। এ বয়সে এতগুলো বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলতে পারেননি পেলে, গাভি কিংবা মেক্সিকোর নতুন প্রতিভা গিলবের্তো মোরাও। বয়সভিত্তিক প্রায় সব রেকর্ডই যেন একে একে নিজের করে নিচ্ছেন স্প্যানিশ বিস্ময়বালক। তার ক্লাব ক্যারিয়ারও সেই ধারাবাহিকতারই প্রতিচ্ছবি। বার্সেলোনার হয়ে চার মৌসুমে ১৫১ ম্যাচে ৪৯ গোল ও ৪৫ অ্যাসিস্ট করেছেন। ১৫ বছর বয়সে অভিষেক হওয়া এ ফুটবলার এখনো ১৯-এও পা দেননি। অথচ ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে এরই মধ্যে অর্ধশতাধিক গোল ও সমানসংখ্যক অ্যাসিস্টে অবদান রেখে ফেলেছেন।উনিশ বছর বয়সের আগে মেসি ক্লাব ফুটবলে খেলেছিলেন প্রায় পঞ্চাশটি ম্যাচ, গোল করেছিলেন নয়টি, বিশ্বকাপে অভিষেক হয়েছিল তার ২০০৬ সালে। রোনালদো তখনো স্পোর্টিং সিপিতে নিজের জায়গা খুঁজছিলেন, বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখতে তারও লেগেছিল ২০০৬ সাল পর্যন্ত। যে বয়সে অন্যরা কেবল নিজের পথ খুঁজছিল, সেই বয়সেই এ কিশোর যেন ফুটবলের সময়রেখাকে নতুন করে লিখে ফেলছেন।

সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ ফ্রান্স। এক পাশে কিলিয়ান এমবাপ্পে, অন্য পাশে ইয়ামাল। একদিকে গোলে উজ্জ্বল এক সুপারস্টার, অন্যদিকে গোলের চেয়ে খেলায় বেশি প্রভাব ফেলা এক তরুণ প্রতিভা। বয়সে ছোট হলেও চাপ সামলানোর মানসিকতায় ইয়ামাল এরই মধ্যে প্রমাণ করেছেন, তিনি কেবল ভবিষ্যতের নন, বর্তমানেরও তারকা। হয়তো ফ্রান্সের বিপক্ষেই আসবে বহু প্রতীক্ষিত দ্বিতীয় গোল। আবার নাও আসতে পারে। কিন্তু স্পেন যদি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতে যায়, তখন সত্যিই কেউ হয়তো হিসাব করবে না ইয়ামালের গোল ছিল একটি, না দুটি। মনে রাখা হবে, ১৮ বছর বয়সী এক কিশোর পুরো একটি দলের খেলার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিলেন।