আগামীকাল ভোর ৪টায় মিয়ামি হার্ড রক স্টেডিয়ামে ম্যাচটি ব্রাজিলের জন্য শুধু গ্রুপ পর্বের আরেকটি লড়াই নয়। মিয়ামির এ ৯০ মিনিটে নির্ধারিত হতে পারে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সেলেসাওদের যাত্রাপথও। এ ম্যাচে বড় ব্যবধানে জয় পেলে গ্রুপ সির শীর্ষস্থান লাভের সম্ভাবনা আরো জোরালো হবে ব্রাজিলের, যা এমন কিছু সুবিধা এনে দেবে, যা দীর্ঘ টুর্নামেন্টে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
কার্লো আনচেলত্তির দলের হিসাবটা সহজ। গ্রুপসেরা হলে নিউ জার্সির নিজেদের বেস ক্যাম্পেই থাকা যাবে, বারবার শহর বদলাতে হবে না, দীর্ঘ ভ্রমণের ধকলও কমবে। একই ট্রেনিং সেন্টার, একই হোটেল ও পরিচিত পরিবেশে থেকে শেষ ষোলো ও কোয়ার্টার ফাইনালের আগে বাড়তি বিশ্রাম এবং কৌশলগত প্রস্তুতির সুযোগ মিলবে। বিপরীতে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করলে মেক্সিকোসহ বিভিন্ন ভেন্যুতে যাতায়াতের চাপ বাড়তে পারে। তাই স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি ব্রাজিলের কাছে শুধু ৩ পয়েন্টের লড়াই নয়; নকআউট পর্বের পথ কতটা মসৃণ হবে, তারও গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। আর সেই মঞ্চেই ফিরতে পারেন নেইমার।
দুই ম্যাচ শেষে ৪ পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে শীর্ষে আছে ব্রাজিল। সমান পয়েন্ট মরক্কোরও, তবে গোল ব্যবধানে পিছিয়ে তারা। স্কটল্যান্ডের সংগ্রহ ৩ পয়েন্ট। ফলে সমীকরণটি সহজ—স্কটল্যান্ড ড্র করলেই নকআউটে যাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে। আর ব্রাজিল চাইবে জয় নিয়ে গ্রুপসেরা হয়ে পরের পর্বে উঠতে। কিন্তু স্কটিশদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তারা কি ড্রয়ের জন্য খেলতে পারবে?
সাবেক স্কটিশ কোচ ক্রেইগ লেভেইনও মনে করেন, ম্যাচ শুরু করার আগেই যদি মাথায় শুধু ১ পয়েন্টের হিসাব থাকে, তাহলে গোল খাওয়ার পর সেই মানসিকতা থেকে বের হওয়া কঠিন। বাস্তবতাও সেটিই বলছে। হাইতির বিপক্ষে জিতলেও স্কটল্যান্ড খুব একটা আক্রমণাত্মক ছিল না। মরক্কোর কাছে হারের ম্যাচে বল দখল ছিল মাত্র ৪০ শতাংশ। পুরো টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত তাদের অন-টার্গেট শট মাত্র দুটি।
আরো উদ্বেগের বিষয়, তারা প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল ফিরিয়ে আনতে গড়ে ২৫ সেকেন্ড সময় নিচ্ছে। ফলে ব্রাজিলের মতো সৃজনশীল দলের বিপক্ষে যদি তারা কেবল নিজেদের অর্ধে গুটিয়ে থাকে, তাহলে চাপ সামলানো কঠিন। বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, নিচু ব্লকে খেললেও আগ্রাসী প্রেসিং দরকার। কারণ ব্রাজিলকে সময় ও জায়গা দিলে তারা শেষ পর্যন্ত শাস্তি দেবে।
অন্যদিকে আনচেলত্তির ব্রাজিল ধীরে ধীরে নিজের ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে। মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ ড্রয়ের পর হাইতির বিরুদ্ধে ৩-০ গোলের জয় তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও ম্যাথেউস কুনহার বোঝাপড়া ছিল সেই ম্যাচের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক। কুনহা দুটি গোল করেছেন, ভিনিসিয়ুস করেছেন একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট। এ জুটির সঙ্গে এবার যুক্ত হতে পারেন নেইমার।
ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, শুরু থেকে তাকে মাঠে নামানোর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না আনচেলত্তি। প্রায় পাঁচ সপ্তাহেরও বেশি সময় মাঠের বাইরে থাকার পর স্কটল্যান্ড ম্যাচে বদলি হিসেবে নামতে পারেন নেইমার। তবে তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে তার নতুন ভূমিকা।
আনচেলত্তি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, উইঙ্গার নয় নেইমারকে নিয়ে তার পরিকল্পনা ফলস নাইন হিসেবে। দ্বিতীয় স্ট্রাইকার কিংবা আক্রমণভাগের কেন্দ্রীয় সৃজনশীল ভূমিকায়। অর্থাৎ ভিনিসিয়ুস ও রাফিনিয়ার মতো টাচলাইনে নয়, বরং প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ও মিডফিল্ডের মাঝখানের জায়গায়। বয়স ও চোটের কারণে আগের মতো বারবার স্প্রিন্ট করার সামর্থ্য নেই নেইমারের। কিন্তু ছোট জায়গায় বল নিয়ন্ত্রণ, পাসের দৃষ্টিভঙ্গি ও ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এখনো বিশ্বমানের। আনচেলত্তি সেই গুণগুলোকেই কাজে লাগাতে চাইছেন।
অবশ্য রাফিনিয়ার চোট ব্রাজিলকে নতুন একটি সমস্যার মুখেও ফেলেছে। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে তিনি বাইরে। তার জায়গায় সবচেয়ে এগিয়ে আছেন লুইজ হেনরিক। তরুণ এ উইঙ্গারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সরাসরি ডিফেন্ডারকে চ্যালেঞ্জ করা এবং বাই-লাইন পর্যন্ত গিয়ে আক্রমণ তৈরি করা। স্কটল্যান্ড যদি রক্ষণাত্মক ব্লকে নেমে আসে, তাহলে হেনরিকের গতি ও ড্রিবলিং ব্রাজিলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হতে পারে।
সম্ভাব্য একাদশে তাই আলিসন, দানিলো, মারকিনিয়োস, গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস, ডগলাস সান্তোস; কাসেমিরো, ব্রুনো গিমারাইশ, লুকাস পাকেতা; ভিনিসিয়ুস, লুইজ হেনরিক ও ম্যাথেউস কুনহাকে দেখা যেতে পারে। তবে মিয়ামির ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়তো শুরুর একাদশে নয়। প্রায় তিন বছর পর ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমারের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
ফুটবলের চিত্রনাট্য অনেক সময় বাস্তবতার চেয়েও বেশি কাব্যিক হয়ে ওঠে। নেইমারের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের গল্পটিও যেন তেমনই এক অদ্ভুত ঘটনার জন্ম দিয়েছে। ২০১০ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতেই মাত্র ১৮ বছর বয়সে ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল তার। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ২-০ গোলের সে জয়ে একটি গোল করে বিশ্ব ফুটবলে নিজের আগমনি বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। এর কয়েক মাস পর, ২০১১ সালের মার্চে লন্ডনের এমিরেটস স্টেডিয়ামে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় ফুটবলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। সে পারফরম্যান্সের পরই তাকে ঘিরে বার্সেলোনা ও চেলসির মতো ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলো কাড়াকাড়ি শুরু করে দিয়েছিল। পনেরো বছর পর, ক্যারিয়ারের গোধূলিবেলায়, দীর্ঘ চোট-সংগ্রাম পেরিয়ে নেইমারের সামনে আবার ফিরে এসেছে সেই স্কটল্যান্ড, সেই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিই।









