মনে হচ্ছিল এই বুঝি ৬০ বছরের আক্ষেপ ঘুচে যাবে। ৬৭ মিনিটে টমাস টুখেল বদলে ফেললেন ছক। পাঁচ ডিফেন্ডারের দেয়াল তুলে দিলেন নিজের দলের সামনে, যেন মেক্সিকো সিটির সেই রাতের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে চাইলেন। যেখানে ১০ জনের ইংল্যান্ড রক্ষণ সামলেছিল অবিশ্বাস্য দৃঢ়তায়। কিন্তু ভুলে গেলেন, তখন প্রতিপক্ষ মেক্সিকো। এবার আর্জেন্টিনা, আর সামনে একজন লিওনেল মেসি। যার পায়ে বল গেলে সময়ের হিসাব বদলে যায়। জায়গা ছেড়ে দেয়ার মূল্য বোঝা গেল মুহূর্তেই।

গর্ডনের গোলের পর থেকে শেষ বাঁশি পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বল দখল ছিল মাত্র ১২ শতাংশ। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এত দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিপক্ষকে বল দিয়ে রেখে শুধু রক্ষণ করে টিকে থাকার স্বপ্ন দেখা ছিল প্রায় আত্মঘাতী। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের নাম যখন আর্জেন্টিনা, আর তাদের ১০ নম্বর জার্সিতে যখন লিওনেল মেসি। ম্যাচের প্রথমার্ধে যে মেসিকে মনে হচ্ছিল ক্লান্ত ছায়া, হঠাৎই হয়ে উঠলেন সবচেয়ে বিপজ্জনক। তার পা থেকেই এল দুটো অ্যাসিস্ট।

গর্ডনকে তুলে নেয়া, তারপর এজরি কনসাকে নামানো প্রতিটি বদল যেন আর্জেন্টিনার হাতে আরেকটু করে ছেড়ে দিল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ। ড্যান বার্নকে মাঠে নামানো হলো, যেন মেসির বিরুদ্ধে উচ্চতাই একমাত্র উত্তর। কিন্তু আর্জেন্টিনা কোনো দ্বিতীয় আমন্ত্রণের অপেক্ষায় থাকে না। কেপ ভার্দে জানে, মিসর জানে, সুইজারল্যান্ড জানে—শেষ মুহূর্তে গোল করার এক আশ্চর্য ক্ষুধা আছে এ দলটার।

রিস জেমসকে তুলে নেয়ার সিদ্ধান্তটি টমাস টুখেলের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুলগুলোর একটি। জেমস শুধু রক্ষণে নয়, কর্নার ও শর্ট কর্নারের সময় লিওনেল মেসির ওপর দ্রুত চাপ তৈরির দায়িত্বও পালন করছিলেন। তাকে তুলে নেয়ার পর সেই দায়িত্ব আর কেউ কার্যকরভাবে পালন করতে পারেননি। ফলে মেসি বারবার বক্সের আশপাশে বল পাওয়ার সুযোগ পান। ঠিক এ জায়গা থেকেই আর্জেন্টিনার আক্রমণের ছন্দ বদলে যায়। এনজো ফার্নান্দেজের সমতাসূচক গোলের আগেও মেসি কয়েকবার একই অঞ্চল থেকে নির্ভারভাবে বল নিয়েছেন, ওয়ান-টু খেলেছেন এবং ইংল্যান্ডের রক্ষণকে অস্থির করে তুলেছেন।

ম্যাচ যখন ইংল্যান্ডের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, তখন বলের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে কোবি মাইনুর মতো পাসিং-নির্ভর মিডফিল্ডারকে নামানোর সুযোগ ছিল। কিন্তু তিনি সেই পথ না বেছে একের পর এক রক্ষণাত্মক পরিবর্তন করেন। এতে মিডফিল্ড আরো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং ইংল্যান্ড কার্যত নিজেদের অর্ধেই আটকে যায়। একই সঙ্গে বুকায়ো সাকার মতো দ্রুতগতির উইঙ্গার পুরো ম্যাচ বেঞ্চে বসে থাকেন, আর মার্কাস রাশফোর্ডকে নামানো হয় ৯৫ মিনিটে, যখন ম্যাচ প্রায় হাতছাড়া। ফলে আর্জেন্টিনা নিশ্চিন্তে আরো বেশি খেলোয়াড় তুলে আক্রমণ চালাতে পারে, কারণ তাদের আর পেছনের ফাঁকা জায়গা নিয়ে ভাবতে হয়নি।

টুখেলকে নিয়োগই করা হয়েছিল গ্যারেথ সাউথগেটের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার জন্য। বড় ম্যাচে সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য। ম্যাচের গতি পাল্টে দেয়ার জন্য। অথচ সবচেয়ে বড় মঞ্চে এসে তিনিই সেই পুরনো ইংল্যান্ড হয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত শুধু রক্ষণ করতে করতেই জয় হাতছাড়া করলেন। ম্যাচ শেষে টমাস টুখেল নিজের কৌশলগত সিদ্ধান্তের দায় এড়াননি। তিনি স্বীকার করেন, দলকে পাঁচ ডিফেন্ডারের ছকে নেয়ার সিদ্ধান্ত তারই ছিল। আর্জেন্টিনা বেশি ঝুঁকি নিয়ে খেলছিল, ছন্দও তাদের দিকে চলে যাচ্ছিল। তাই মাঝমাঠের ফাঁকা জায়গা বন্ধ করতেই এ পরিবর্তন করেছিলেন বলে জানান তিনি।

বিপরীতে লিওনেল স্কালোনি ঠিক উল্টোটা। বদলি নামিয়ে আরো আক্রমণ করলেন, আরো ঝুঁকি নিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, ফুটবলে একটি ভুলের শাস্তি প্রায় নিশ্চিত। লিওনেল মেসিকে সময় আর জায়গা দেয়া। কারণ তিনি আর দৌড়ে ম্যাচ জেতেন না; তিনি ভাবনা দিয়ে জেতেন। আর সেই ভাবনার জন্য যদি আপনি এক মুহূর্তের অবকাশও দেন, ইতিহাসের পাতা লিখতে তার আর দ্বিতীয় সুযোগ লাগে না।