বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মহাকাব্যিক জয় আর্জেন্টাইনদের কাছে যে শুধু টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠার প্রক্রিয়া, বিষয়টি এমন না। বরং ঐতিহাসিক কারণে এর গুরুত্ব ছিল আরো অনেক বিস্তৃত। আর কেন তা এতো গুরুত্ব বহন করে তা ফুটবল বিশ্ব দেখেছে ম্যাচ শেষের পর। ২-১ গোলের ব্যবধানে জয় পাওয়ার পর পুরো স্টেডিয়াম যখন উদযাপনে ব্যস্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে আর্জেন্টিনা দলের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় লাস মালভিনাস সন আর্জেন্তিনাস বা মালভিনাস আর্জেন্টিনার লেখা একটি ব্যানার প্রদর্শন করেন।

ব্যানারটি মূলত ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস যুদ্ধের প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। আটলান্টা স্টেডিয়ামে এই ব্যানারটি কীভাবে প্রবেশ করল, তা এখনও জানা যায়নি। এমনকি ম্যাচের ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে ফিফা এবং নিরাপত্তা অভিযানের কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ সম্পর্কিত কোনো প্রতীক বা ব্যানার নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না।

ব্যানারে উল্লেখ করা ‘মালভিনাস’ হচ্ছে দক্ষিণ আটলান্টিকের সেই দ্বীপপুঞ্জ, যাকে ব্রিটেনে ফকল্যান্ডস আইল্যান্ডস এবং আর্জেন্টিনায় ইসলাস মালভিনাস নামে ডাকা হয়। এ দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে মাত্র ৩০০ মাইল দূরে, আর ব্রিটেন থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৮ হাজার মাইল। ঐতিহাসিক সূত্র ধরে আর্জেন্টিনা দাবি করে, এ দ্বীপপুঞ্জ তাদের ভূখণ্ডের অংশ। অন্যদিকে ব্রিটেন ১৮৩৩ সাল থেকে সেখানে স্থায়ীভাবে শাসন করে এসেছে। দ্বীপের বাসিন্দারাও ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত।

এ দ্বীপের সার্বভৌমত্ব নিয়ে ৪৪ বছর আগে ৭৪ দিনের যুদ্ধ হয়েছিল। ওই সংঘাতে ৯০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন, যার মধ্যে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ ছিলেন। যুদ্ধে জয় পায় ব্রিটেন। এর প্রায় ৩০ বছর পর ২০১৩ সালে ফকল্যান্ডে বসবাসকারীদের মধ্যে একটি গণভোট হয়। ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ বাসিন্দা গণভোটে ব্রিটিশ ভূখণ্ড হিসেবে থাকার পক্ষে ভোট দেন।

তবে মাঠে রাজনৈতিক বার্তা সম্বলিত ব্যানার প্রদর্শন আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের জন্য সমস্যা বয়ে আনতে পারে। কারণ এ প্রতিযোগিতা চলাকালীন যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক, আদর্শিক বা ধর্মীয় বার্তা প্রদর্শন নিষিদ্ধ করেছে বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা ফিফা। এ নীতিগুলো লঙ্ঘন করে এমন কোনো প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে খেলোয়াড়, ফেডারেশন বা অ্যাসোসিয়েশনগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান রয়েছে তাদের ডিসিপ্লিনারি কোডে।

WhatsApp Image 2026-07-16 at 4.38.20 AM

এ ধরনের ঘটনায় কোনো সম্ভাব্য শাস্তি নির্ধারণের আগে পরিস্থিতি মূল্যায়নে সাধারণত তদন্ত পরিচালনা করে সংস্থাটি। তাতে নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে, সতর্কবার্তা থেকে শুরু করে আর্থিক জরিমানা কিংবা জড়িত খেলোয়াড়দের ওপর নিষেধাজ্ঞার মতো শাস্তির মুখোমুখি হতে পারে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। তবে এক্ষেত্রে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা (সাসপেনশন) পাওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম বলে মনে হচ্ছে। কারণ সাধারণত অত্যন্ত গুরুতর বা বারবার ঘটা অপরাধের ক্ষেত্রে এ শাস্তি দেয়া হয়ে থাকে।

২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে এ ধরনের নজির দেখা গিয়েছিল। সার্বিয়ার বিপক্ষে সুইজারল্যান্ডের জয়ের ম্যাচে গোল উদযাপনের সময় গ্রানিত জাকা এবং জারদান শাকিরি হাত দিয়ে ‘দ্বি-মুখী ঈগল’ (double-headed eagle) তৈরি করেছিলেন, যা আলবেনিয়ার পতাকায় থাকা একটি প্রতীক এবং সার্বিয়া ও কসোভোর মধ্যকার দ্বন্দ্বে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। সার্বিয়ান ফেডারেশন এটিকে উসকানি উল্লেখ করে ফিফার কাছে অভিযোগও করেছিল। পর্যালোচনার পর ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি জড়িত খেলোয়াড়দের প্রত্যেককে ১০ হাজার সুইস ফ্রাঁ এবং অধিনায়ক স্টিফান লিচস্টাইনারকেও (যিনি এ অঙ্গভঙ্গিতে অংশ নিয়েছিলেন) ৫ হাজার সুইস ফ্রাঁ জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

চলতি বিশ্বকাপেও এমন ঘটনা ঘটেছে। শেষ ষোলোর ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মিশরের জয়ের পর দলটির খামখেয়ালি কোচ হোসাম হাসান ফিলিস্তিনের পতাকা নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন। রাজনৈতিক বিষয়ের কারণে ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও, এখন পর্যন্ত ফিফা এই ঘটনার জন্য কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঘোষণা দেয়নি।

আগামী রোববার মাঠে গড়াবে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার ফাইনাল। হাতে সময় একদমই কম থাকায় এ ম্যাচের আগে ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি কোনো সিদ্ধান্ত দেবে এমন সম্ভাবনা খুবই কম। তবে তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে, টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর সংস্থাটি তাদের সিদ্ধান্ত জানাতে পারে।