পুরুষদের ফুটবলে একটি রূপান্তর আসন্ন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, নেইমাররা ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে। রোনালদো নাম লিখিয়েছেন সৌদি আরবের ক্লাবে, মেসি সম্প্রতি মেজর লিগ সকারের দল ইন্টার মায়ামিতে খেলতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি) ক্লাবে ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমারের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। এ বাস্তবতায় ফুটবলে কি একটা হাহাকার তৈরি হতে পারে? তবে আশার কথা, তিন সুপারস্টারের ঘাটতি কিছুটা হলেও পূরণ করে দিতে তৈরি আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ড ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রসহ আরো কয়েকজন।
ফুটবলের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র রোনালদো ও মেসি গত ১৫ বছরের মধ্যে ১২ বারই ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। মেসি সাতবার ও রোনালদো পাঁচবার জিতেছেন মর্যাদাপূর্ণ এ ট্রফি। তারা বিশ্ব ফুটবলে এতটাই দাপট দেখিয়েছেন যে দুজনের অবসরের পর বিরাট একটা শূন্যতা তৈরি হবে নিশ্চিতভাবেই। এরই মধ্যে ইউরোপের ফুটবলে তাদের অনুপস্থিতির প্রভাব স্পষ্ট। ২০ বছরের মধ্যে এই প্রথম মেসি কিংবা রোনালদোকে ছাড়া ইউরোপের ফুটবল মৌসুম শুরু হবে।
সর্বশেষ ২০২২ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী করিম বেনজেমা। তিনি রোনালদোর পদাঙ্ক অনুসরণ করে নাম লিখিয়েছেন সৌদি আরবে। গত ১৫ বছরে রোনালদো ও মেসির বাইরে আরেকজন খেলোয়াড় ব্যালন ডি’র অর জিতেছেন, তিনি হলেন লুকা মডরিচ। ক্রোয়াট মিডফিল্ডারকেও সৌদি আরব থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। যদিও তিনি আরো এক মৌসুম রিয়াল মাদ্রিদে খেলবেন এবং সম্প্রতি এক বছরের জন্য চুক্তি নবায়নের কাগজে সই করেছেন ৩৭ বছর বয়সী স্টার।
২০২৩ সালে ব্যালন ডি’অর জয়ে ফেভারিট মেসি। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোয় তিনি এবার বিশ্বের সেরা ফুটবলারের এ পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে ফেভারিট। হয়তো মেসির এটিই হবে শেষ মুকুট। এরপর কে আসবেন মসনদে? ২০২৪ সালে কে জিতবেন ব্যালন ডি’অর? কিংবা ভবিষ্যতে কে নেবেন মেসি ও রোনালদোর জায়গা?
আর্লিং হালান্ড: মেসি ও রোনালদোর যোগ্য উত্তরসূরি হতে পারেন নরওয়েজিয়ান ফরোয়ার্ড আর্লিং হালান্ড। তিনি প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে একই মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ প্লেয়ার ও ইয়াং প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার পুরস্কার জিতেছেন।
প্রিমিয়ার লিগে অভিষেক মৌসুমেই রেকর্ড তছনছ করে দিয়েছেন। অ্যালান শিয়েরার ও অ্যান্ডি কোলের তিন দশকের পুরনো ৩৪ গোলের রেকর্ড ভেঙে তিনি করেছেন ৩৬ গোল। সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২০২২-২৩ মৌসুমে ৫৩ ম্যাচ খেলে করেছেন ৫২ গোল। ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগে মাত্র দ্বিতীয় ও ৯৫ বছরের মধ্যে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এক মৌসুমে ৫০-এর বেশি গোল করেছেন তিনি।
২২ বছর বয়সেই ক্লাব ও দেশের জার্সিতে ২২৯ গোল করেছেন হালান্ড। এমন ফর্মে থাকলে রোনালদোর ৮৩৭ গোলের রেকর্ডটা তিনি অনায়াসে ভেঙে দিতে পারেন।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র: এ বছর মার্চে লিভারপুলের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে শেষ ষোলোর ম্যাচ শেষে রিয়াল মাদ্রিদের হেড কোচ কার্লো অ্যানচেলত্তি বলছিলেন, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ‘বিশ্বের যেকোনো জায়গায় ম্যাচের সেরা ফল নির্ণায়ক খেলোয়াড়, যে কিনা ধারাবাহিকভাবেই ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণ করে দিচ্ছে।’
ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়টি ২০২১-২২ মৌসুমে সেমিফাইনালে ম্যানসিটির ডিফেন্সকে ভেঙে চুরমার করে দেয়ার পর ফাইনালে লিভারপুলের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করেন। ২০২২-২৩ মৌসুমে ২৩ গোল করেছেন, অ্যাসিস্ট ২১টি, যা ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে তৃতীয় সেরা। এক ও দুই নম্বরে হালান্ড ও এমবাপ্পে।
কিলিয়ান এমবাপ্পে: ২০১৭ সালে মোনাকো থেকে পিএসজিতে নাম লেখানোর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্যারিস জায়ান্টদের হয়ে ২৬০ ম্যাচ খেলে ২১২ গোল করেছেন এমবাপ্পে, অ্যাসিস্ট করেছেন ৯৮টি। কাতারি মালিকের ক্লাবটিকে মোট ১৩টি ঘরোয়া শিরোপা জিততে সাহায্য করেছেন তিনি। ২০১৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম রূপকার এমবাপ্পে ২০২২ সালেও পৌঁছে গিয়েছিলেন অনেক কাছে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপের পর ফাইনালে প্রথমবার হ্যাটট্রিক করে লড়াইটা জমিয়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত পেরে ওঠেননি। ফাইনালে মেসির আর্জেন্টিনার কাছে হেরে যায় এমবাপ্পের ফ্রান্স। জাতীয় দলের জার্সিতে ৮৮ ম্যাচে ৩৮ গোল করেছেন এমবাপ্পে। দেশের হয়ে গোলের চার্টে তিনি পাঁচ নম্বরে। তার চেয়ে ১৫ গোল বেশি করে শীর্ষে অলিভিয়ার জিরু।
জুড বেলিংহাম: কাতার বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা পারফরমার। সম্প্রতি ১০৩ মিলিয়ন ইউরোয় তিনি বরুশিয়া ডর্টমুন্ড থেকে রিয়াল মাদ্রিদে নাম লেখান। ফুটবল ইতিহাসে তিনি তৃতীয় ব্যয়বহুল টিনএজ ও দ্বিতীয় ব্যয়বহুল ইংলিশ ফুটবলার। বায়ার্ন মিউনিখের ১১ বছরের কর্তৃত্বের অবসান ঘটিয়ে ডর্টমুন্ডকে বুন্দেসলিগার শিরোপা এনে দিতে পারেননি। এর পরও তার পারফরম্যান্স মুগ্ধ করেছে সবাইকে। গত বছর অক্টোবরে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ডর্টমুন্ডের নেতৃত্ব পেয়ে ইতিহাস গড়েন জুড বেলিংহাম।
২০২০ সালে ২৫ মিলিয়ন পাউন্ডে বার্মিংহাম সিটি থেকে বেলিংহামকে কিনে নেয় ডর্টমুন্ড। জার্মান ক্লাবটির হয়ে গত মৌসুমে ৪২ ম্যাচ খেলে ১৪ গোল করেছেন, অ্যাসিস্ট করেন সাত গোলে। এবার ১৪ বারের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে নতুন যাত্রা হবে তার।










