রিয়াল মাদ্রিদে ১৪ বছরের পাঠ চুকিয়ে সৌদি আরবের ক্লাব আল ইত্তিহাদে নাম লিখিয়েছেন ফরাসি স্ট্রাইকার করিম বেনজেমা। তিনি ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ও এক দশক ধরে ছিলেন রিয়ালের নিয়মিত মুখ। এ খ্যাতিই তাকে এনে দিচ্ছে কোটি কোটি ইউরো। নতুন ক্লাবে বছরে প্রায় ১০ কোটি ইউরো জমা হবে তার ব্যাংক হিসাবে, যা তাকে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত ফুটবলারের সম্মান এনে দিচ্ছে। 

রিয়াল মাদ্রিদে বছরে ২৮ মিলিয়ন ইউরো পেতেন বেনজেমা। কর দেয়ার পর ঘরে তুলতেন ১৪ মিলিয়ন ইউরো। সেটা এখন পৌঁছে যাচ্ছে ১০০ মিলিয়ন ইউরোয়। সৌদি আরবে যেহেতু কোনো আয়কর দিতে হয় না, কাজেই তিনি বেতনের পুরো অর্থই পেয়ে যাবেন। তার মানে, রিয়ালে বছরে যা পেতেন এখন তার চেয়ে ৮৬ মিলিয়ন ইউরো বেশি আয় করবেন ৩৫ বছর বয়সী এ ফুটবলার। 

চুক্তিটা আপাতত দুই বছরের, যা আরো এক বছর বাড়িয়ে নেয়ার সুযোগ রয়েছে। দুই বছরে তিনি পাবেন ২০ কোটি ইউরো। এছাড়া ২০৩০ বিশ্বকাপ আয়োজক প্রার্থী হিসেবে সৌদির বিশেষ দূত হিসেবে কাজ করায় তিনি পাবেন আরো ২০ মিলিয়ন ইউরো। সব মিলিয়ে দুই বছর শেষে তিনি পাবেন ২২০ মিলিয়ন ইউরো (বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশী মুদ্রায় যা প্রায় ২ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা)। 

আর্জেন্টাইন সুপারস্টার লিওনেল মেসিকে বছরে ৪০ কোটি ইউরোয় চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিল সৌদির আরেক ক্লাব আল হিলাল। যদিও মেসি বেছে নিয়েছেন আমেরিকান মেজর লিগ সকারের দল ইন্টার মায়ামিকে। ফলে পারিশ্রমিকে দুইয়েই থাকছেন বেনজেমা। তার আগে রয়েছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। 

বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাতে মাদ্রিদে চুক্তি স্বাক্ষরের সময় উপস্থিত ছিলেন আল ইত্তিহাদ প্রেসিডেন্ট আনমার আল হাইলি ও ভাইস প্রেসিডেন্ট আহমাদ আল খাকি। চুক্তির পর আল ইত্তিহাদ টুইট করে জানায় ‘‍‌বেনজেমা এখানে; নতুন বাঘ গর্জন করবে; ইত্তিহাদে স্বাগত!’ 

দুদিন পরই তিনি পৌঁছে যান সৌদি আরবে। বৃহস্পতিবার জেদ্দার কিং আব্দুল্লাহ স্পোর্ট সিটি স্টেডিয়ামে ৬০ হাজার সমর্থকের সামনে বেনজেমার পরিচিতি পর্বও সম্পন্ন করেছে আল ইত্তিহাদ।

রোনালদোর পর দ্বিতীয় হাইপ্রোফাইল খেলোয়াড় হিসেবে সৌদি লিগে নাম লেখালেন বেনজেমা। 

বৃহস্পতিবার আল ইত্তিহাদ সমর্থকদের সামনে হাজির হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমে বেনজেমা বলেন, ‘‌যেহেতু আমি মুসলিম এবং এটি একটি মুসলিম দেশ। কাজেই আমি সব সময়ই এমন একটি দেশে বসবাস করতে চেয়েছি। আমি সৌদি আরবে আগেও এসেছি এবং এখন দারুণ অনুভূতি আমার। যেমনটি চেয়েছি এটি তেমনই এক দেশ। আমি আমার নতুন ক্লাবের জন্য শিরোপা জিততে চাইব। এটা আমার ক্যারিয়ারের নতুন এক অধ্যায়। আমি চাইব এ ক্লাবটিকে আরো এগিয়ে দিতে। এ ক্লাবটির রয়েছে ফুটবলের প্রতি প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসা।’ 

নয়বারের লিগ ও দুইবারের এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপাসহ মোট ৩৫টি শিরোপা জিতেছে আল ইত্তিহাদ। এবার বেনজেমাকে নিয়ে মহাদেশী ও বৈশ্বিক আসরে সফলতা চায় ক্লাবটি। এজন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও পাবে তারা। পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড থেকে অর্থায়ন পাবে ক্লাবটি। গত জানুয়ারিতে আল নাসর ইতিহাসের সবচেয়ে দামি চুক্তিতে রোনালদোকে উড়িয়ে আনে। এবার আরেক হাইপ্রোফাইল ফুটবলার গেলেন সৌদিতে। আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক মেসিকে সই করানোর ক্ষেত্রে অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছিল আল হিলাল। মাঝে বার্সেলোনায় ফিরে যাওয়ার কথাও ভাবছিলেন মেসি। যদিও তিনি সবাইকে চমকে দিয়ে নাম লেখান ইন্টার মায়ামিতে। 

সৌদির কর্মকর্তারা আশা করছেন, রোনালদো ও বেনজেমার আগমনে ইউরোপের আরো অন্তত ডজনখানেক ফুটবলার সৌদির ক্লাবে আসতে রাজি হতে পারেন। এখানে পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড অর্থ সরবরাহ করবে বলে ক্লাবগুলোকে খুব একটা ভাবতে হবে না। 

বেনজেমাকে সই করানোর পর আল ইত্তিহাদের প্রেসিডেন্ট আনমার বিন আবদুল্লাহ আলহাইলি বলেন, ‘‌বর্তমান ব্যালন ডি’অরজয়ী খেলোয়াড়কে রিয়াল মাদ্রিদ থেকে সই করানোটা এ বিশেষ ক্লাবটির আরেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। করিম বৈশ্বিক ফুটবল আইকন, বর্তমানে খ্যাতির চূড়ায় রয়েছেন এবং ফর্মেরও তুঙ্গে। তিনি এমন একটি দেশের ক্লাব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগে যোগ দিয়েছেন, যে দেশের রয়েছে মাঠে ও মাঠের বাইরে অনেক বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষা। পরের মৌসুমে আমরা লিগ শিরোপা রক্ষা মিশন ছাড়াও এশিয়া কাপ ও বৈশ্বিক পর্যায়ে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে খেলবে। তখন সব আলোই থাকবে করিমের ওপর। তাকে নতুন মৌসুমে ৯ নম্বর জার্সিতে দেখার তর সইছে না আমাদের।’

২০২২ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী বেনজেমা মাদ্রিদের হয়ে মোট ৬৪৮ ম্যাচ খেলে করেছেন ৩৫৪ গোল। ইউরোপের সেরা ও বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্লাবটির হয়ে তিনি মোট ২৫টি শিরোপা জিতেছেন। চারটি লা লিগা, পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, তিনটি কোপা ডেল রে, চারটি স্প্যানিশ সুপারকোপা, চারটি উয়েফা সুপার কাপ ও পাঁচটি ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব রয়েছে তার। 

সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে চোটের সমস্যায় ভুগেছেন বেনজেমা। ফলে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ থেকে তিনি ছিটকে যান। এর পরও তিনি ৪৩ ম্যাচে ৩১ গোল করেন, অ্যাসিস্ট করেন ছয়টি গোলে। ২০২১-২২ মৌসুমে তিনি রিয়ালের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন। এ সময় লা লিগায় ২৭ গোল ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ১৫ গোল করে দলকে উভয় প্রতিযোগিতার শিরোপা জেতান। সেই সাফল্যেই তিনি ব্যালন ডি’অর জেতেন। রোনালদোর পর রিয়ালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। 

রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে চুক্তিটা ৩০ জুন শেষ হয়ে যায়। ফলে একজন ফ্রি-এজেন্ট হিসেবেই তিনি সৌদি ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন। এজন্য তাকে সই করাতে কোনো ফি দিতে হয়নি আল ইত্তিহাদকে, সেটা সচরাচর ট্রান্সফার ফি হিসেবে জানি সবাই। 

নিউইয়র্ক টাইমস, মার্কা, আউটলুক