ম্যানচেস্টার সিটিতে ব্রাজিলের উইঙ্গার সাভিও ছিলেন স্কোয়াডের একজন সাধারণ সদস্য। অথচ সেই খেলোয়াড় টটেনহ্যামে যোগ দিয়েছেন ৮৫ মিলিয়ন পাউন্ডের চুক্তিতে। চেলসিতে চোট জর্জরিত একটি বছর কাটানোর পরও লিয়াম ডেলাপকে ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডে কিনেছে নটিংহ্যাম ফরেস্ট। আবার ওয়েস্টহ্যাম ও সাউদাম্পটনের হয়ে পরপর দুই মৌসুমে অবনমনের স্বাদ পাওয়া পর্তুগিজ মিডফিল্ডার মাতেউস ফার্নান্দেসকে ৮৫ মিলিয়ন পাউন্ডে দলে ভিড়িয়েছে লন্ডন জায়ান্ট টটেনহ্যাম হটস্পার্স।

তালিকাটা এখানেই শেষ নয়। গোলরক্ষক জেমস ট্রাফোর্ড, মিডফিল্ডার এলিয়ট অ্যান্ডারসন ও প্লেমেকার মরগান রজার্সের মতো নামগুলোও এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে। এ রকমই বেপরোয়া ছিল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের গ্রীষ্মকালীন দলবদল। ইংল্যান্ডের ট্রান্সফার মার্কেট যেন তার সমস্ত ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে, যা অনেক সময়ই রূপ নেয় বিপজ্জনক মাত্রায়।

গত ১ সেপ্টেম্বর শেষ হয় ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালীন ট্রান্সফার উইন্ডো। এবার প্রিমিয়ার লিগের ২০টি দল মিলে রেকর্ড ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি খরচ করেছে, যা গত বছরের ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন পাউন্ডের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। এবারই চারজন খেলোয়াড়—ম্যানসিটিতে এঞ্জো ফার্নান্দেজ ও এলিয়ট অ্যান্ডারসন, লিভারপুলে ব্র্যাডলি বারকোলা ও চেলসিতে মরগান রজার্স—প্রত্যেকে ১০০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি ফিতে নতুন ক্লাবে যোগ দিয়েছেন।

এ চোখধাঁধানো খরচের নেপথ্যে আসল চিত্রটা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। ডেলয়েটের ‘অ্যানুয়াল রিভিউ অব ফুটবল ফাইন্যান্স’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর কর-পূর্ব মোট ক্ষতি আগের বছরের ১৩৫ মিলিয়ন থেকে ৬০০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৪৮ মিলিয়ন পাউন্ডে।

পরবর্তী দুটি গ্রীষ্মকালীন উইন্ডোতে ৩ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি খরচ বাদ দিয়েই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এ ফুটবল লিগ প্রায় ১ বিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতির বোঝা বইছে।

চেলসি ২০২৪-২৫ মৌসুমে কর-পূর্ব ২৬২ মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতির মুখে পড়েছে, যা প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসেই রেকর্ড। টটেনহ্যামের কর-পূর্ব ক্ষতি ১২০ দশমিক ৬ মিলিয়ন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ৩৯ দশমিক ৭ মিলিয়ন ও ম্যানচেস্টার সিটির ক্ষতি ৯০ লাখ পাউন্ড। বড় ছয় দলের মধ্যে কেবল লিভারপুলই নিজেদের সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনে ১৫ দশমিক ২ মিলিয়ন পাউন্ড লাভ দেখাতে পেরেছে।

এমন আর্থিক ঘাটতির মধ্যেও বড় ক্লাবগুলো দেদার খরচ করছে। ম্যানসিটি, চেলসি ও টটেনহ্যাম—তিনটি ক্লাবই এ গ্রীষ্মে ৩০০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি খরচ করেছে। এর মধ্যে ম্যানসিটি একাই খরচ করেছে রেকর্ড ৪৫৮ মিলিয়ন পাউন্ড। পেপ গার্দিওলার বিদায়ের পর নতুন কোচ এঞ্জো মারেস্কার অধীনে হারানো মুকুট ফিরে পেতে মরিয়া সিটিজেনরা। তবে খেলোয়াড় বিক্রি করে চেলসি ও ম্যানসিটি উভয়ই ৩০০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি আয় করেছে। বিস্ময়কর হলো, বিপুল ক্ষতি সত্ত্বেও প্রিমিয়ার লিগে ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি ট্রান্সফার ফি একটি সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, কেন ইংলিশ ক্লাবগুলো এত বেশি খরচ করছে?

ইতিহাদে জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মার বিকল্প হিসেবে মাত্র এক মৌসুম কাটানোর পর গোলরক্ষক জেমস ট্রাফোর্ডকে ৪০ মিলিয়ন পাউন্ডে লিডস ইউনাইটেডের কাছে বিক্রি করে ১৩ মিলিয়ন পাউন্ড লাভ করেছে ম্যানচেস্টার সিটি। অন্যদিকে, গত মৌসুমে ইপসউইচ থেকে ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডে চেলসিতে আসা লিয়াম ডেলাপ ৪৯ ম্যাচে মাত্র ৩টি গোল করা সত্ত্বেও তার দলবদলে চেলসি ২০ মিলিয়ন পাউন্ড লাভ করেছে।

সাবেক ওই স্পোর্টিং ডিরেক্টর বলেন, ‘এটি মূলত জোগান ও চাহিদার খেলা। কিছু ক্লাব চড়া মাশুল গুনে বুঝতে পেরেছে যে প্রিমিয়ার লিগের বাইরে থেকে খেলোয়াড় সই করানো এমন এক ঝুঁকি, যা নেয়ার কোনো মানে হয় না। ইতালির সিরি-আ থেকে খেলোয়াড় সই করিয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। তাই প্রিমিয়ার লিগ নিজেদের লিগের ভেতরেই খেলোয়াড় লেনদেন করতে বেশি আগ্রহী।’

অবশ্য ব্রেন্টফোর্ড ও ব্রাইটনের মতো কিছু ক্লাব প্রিমিয়ার লিগের বাইরের উদীয়মান প্রতিভা খুঁজে বের করার ওপর ভিত্তি করে সফল রিক্রুটমেন্ট মডেল তৈরি করেছে। ফরাসি ক্লাব লেন্স থেকে ৩৯ মিলিয়ন পাউন্ডে আসা মামাদু সানগারে এ মৌসুমে ব্রেন্টফোর্ডের হয়ে শুরুতেই দারুণ পারফর্ম করছেন। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে সুইডেনের আইএফকে গোথেনবার্গ থেকে মাত্র ৬ মিলিয়ন পাউন্ডে কেনা মালিক ইয়ালকুয়ে ভবিষ্যতে ময়েজেস কাইসেদো ও কার্লোস বালেবার মতো বড় তারকা হয়ে উঠবেন বলে বিশ্বাস ব্রাইটনের।

তবে খুব কম ক্লাবই ব্রেন্টফোর্ড ও ব্রাইটনের মতো সুসংগঠিতভাবে পরিচালিত হয়। তাই অধিকাংশ ক্লাবকেই প্রিমিয়ার লিগের খেলোয়াড়দের জন্য অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করা এবং প্রিমিয়ার লিগের বাইরে থেকে ঝুঁকি নেয়ার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়।

প্রিমিয়ার লিগের সাবেক এক চিফ স্কাউট ইএসপিএনকে বলেন, ‘ট্রান্সফার উইন্ডোর শুরুতেই রজার্স ও অ্যান্ডারসনের চুক্তিগুলো সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল, যা পুরো দলবদলের বাজারের জন্য একটি নতুন মাপকাঠি তৈরি করে দেয়। এ কারণেই এমন কিছু খেলোয়াড়ের জন্য অবিশ্বাস্য অংকের ট্রান্সফার ফি দেখা গেছে, যাদের বাজারমূল্যের সঙ্গে এ অর্থের কোনো সামঞ্জস্য নেই।’

এছাড়া সৌদি প্রো লিগের ক্লাবগুলোর বড় অংকের খরচও এ বাজারকে প্রভাবিত করেছে। ম্যানচেস্টার সিটিতে তুলনামূলক হতাশাজনক একটি মৌসুম কাটানোর পরও টিজানি রেইন্ডার্সকে আল কাদসিয়াহর কাছে ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি দামে বিক্রি করে সিটি লাভ করতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই অন্য ক্লাবগুলোও তাদের খেলোয়াড়দের মূল্যায়ন বাড়িয়ে দেয়। প্রিমিয়ার লিগের নিচের সারির ক্লাবগুলোর মূল সমস্যা হলো এ বিপুল অর্থের খুব সামান্য অংশই ইএফএলের ক্লাবগুলোর কাছে পৌঁছায়। ওই স্কাউট বলেন, ‘সমুদয় অর্থ কেবল শীর্ষ ক্লাবগুলোর মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। আর এ অর্থ ফুটবলের নিম্নস্তরে প্রবাহিত না হয়ে এজেন্ট ফি হিসেবে লিগের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে।’