ভাইকিং যোদ্ধাদের দেশের এ ফুটবলার লিখছেন নরওয়ের রূপকথা। রোববার রাতে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে নরওয়ে। হালান্ড জোড়া গোল করে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দিয়েছেন পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নকে। ব্রাজিলের কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে গোল করলেও হালান্ড ছিলেন যেন নির্লিপ্ত এক মানুষ। কোনো বুনো উল্লাস ছিল না গোল উদযাপনে, মুখে কেবল স্মিত হাসি। যেন বলছেন, এটা করার জন্যই তো তার জন্ম।

শেষ ষোলোর ম্যাচে দীর্ঘ সময় ব্রাজিলের রক্ষণভাগে আটকে ছিলেন ২৫ বছর বয়সী হালান্ড। পুরো ম্যাচে প্রতিপক্ষের বক্সে মাত্র চারবার বল স্পর্শ করেছেন তিনি। অথচ ম্যাচ শেষে তিনিই নায়ক, সবটুকু আলো টেনে নিলেন নিজের দিকেই। আন্দ্রেয়াস শেল্ডেরাপের ক্রসে শক্তিশালী হেডারে ৭৯ মিনিটে ব্রাজিলের জালে বল পাঠান প্রথমবার। ব্রাজিলের গোলকিপার ছিলেন রীতিমতো অসহায়। ৯০ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে যে নিচু শটে তিনি দ্বিতীয় গোল করেন, সেটিকে ‘মিসাইল’ বললে ভুল হবে না মোটেও। এ গোলেও অ্যাসিস্ট করেন শেল্ডেরাপ। খেলল দুই দল, আর জিতলেন শুধু হালান্ড। তার বীরত্বে ভাইকিং যোদ্ধাদের দেশ নরওয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ আটে জায়গা করে নিল।

স্মিত হাসির ভয়ংকর এক স্ট্রাইকার হালান্ড। তিনি হাসতে হাসতে যেন প্রতিপক্ষ দলকে ‘খুন’ করতে পারেন। রোববার রাতের ম্যাচ শেষে হালান্ডের ভূয়সী প্রশংসা করে সাবেক ইংল্যান্ড স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট বলেন, ‘অনেকে প্রায়ই বলে থাকেন, হালান্ড কত কম বল স্পর্শ করে। কিন্তু তার অনেক বেশি স্পর্শের প্রয়োজনই হয় না।’

সাবেক স্কটল্যান্ড উইঙ্গার প্যাট নেভিনের মতে, হালান্ডের জয়সূচক গোলটি ছিল অসাধারণ। তার ভাষায়, ‘আমরা আর কোনো খেলোয়াড়কে তার মতো করতে দেখিনি। ওই মুহূর্তে কোনো সুযোগই ছিল না। অর্ধেক সুযোগও নয়, একেবারেই কিছু ছিল না। অথচ হালান্ড সেখান থেকেই গোল বের করে আনল।’

১৯৯৮ সালের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলছে নরওয়ে। অথচ স্টালে সোলবাক্কেনের দল এখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড, যারা শেষ ষোলোয় মেক্সিকোকে ৩-২ গোলে হারিয়েছে। সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক ওয়েন রুনি বলেন, ‘হালান্ড পুরো নরওয়েকেই বিশ্বাস এনে দিয়েছে যে তারা অনেক দূর যেতে পারে।’

বিশ্বকাপে চার ম্যাচে সাত গোল করে অনেক কীর্তি গড়েছেন হালান্ড। গ্রুপ পর্বে ইরাক ও সেনেগালের বিপক্ষে দুটি করে গোল করেছিলেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে বিশ্রামে ছিলেন, নইলে গোলসংখ্যা আরো বাড়ত নিশ্চিতভাবেই। নকআউট পর্বের শুরুতে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করার পর এবার ব্রাজিলের বিপক্ষেও জোড়া গোল করলেন তিনি।

নরওয়ের হয়ে সিনিয়র আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৫৪ ম্যাচে তার গোল এখন ৬২টি। গড়ে প্রতি ৭১ মিনিটে করেছেন একটি গোল। ৬২ গোলের মধ্যে মাত্র ছয়টি এসেছে পেনাল্টি থেকে। এছাড়া নরওয়ের হয়ে টানা ১৪টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচেই গোল করেছেন তিনি। এসব ম্যাচে করেছেন ২৭ গোল। সর্বশেষ ২০২৪ সালের অক্টোবরে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে নেশন্স লিগের ম্যাচে গোল করতে পারেননি।

পুরো ম্যাচে হালান্ড বল স্পর্শ করেছেন মাত্র ৩০ বার এবং সফল পাস দিয়েছেন ১৩টি। তার প্রত্যাশিত গোলের মান (এক্সজি) ছিল মাত্র দশমিক ৩৯। পরিসংখ্যান বলছে খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি, কিন্তু ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন তিনিই। আর্সেনালের সাবেক ডিফেন্ডার ম্যাট আপসন বলেন, ‘সে কি কখনই খুব বেশি বল স্পর্শ করেছে? মনে হয় না। সে এভাবেই খেলে এবং সময়ের অপেক্ষা করে। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সে জ্বলে ওঠে।’

বলের স্পর্শ আর গোলের বিষয়টি নিয়ে লিভারপুলের সাবেক ডিফেন্ডার স্টিফেন ওয়ারনক বলেন, ‘আমি মনে করি, সে প্রতি ১৪ স্পর্শে একটি গোল করে, যা আপনাকে তার ব্যাপারে সবকিছু বলে দেবে। সে ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখে আর মিডফিল্ডকে উন্মুক্ত করতে সাহায্য করে।’

হালান্ড মনে করছেন, তিনি ক্যারিয়ারের নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছেন। ম্যাচ শেষে বলেন, ‘এ টুর্নামেন্টে কয়েকবারই মনে হয়েছে আমি নতুন এক শিখরে উঠেছি। আমি যদি এক-দুটি সুযোগ পাই, বেশির ভাগ সময়ই গোল করি। এটাই আমার কাজ।’

ম্যাচ শেষে সতীর্থদের নিয়ে সমর্থকদের সামনে বিখ্যাত ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনে নেতৃত্ব দেন হালান্ড। হাজারো সমর্থক ভাইকিং হেলমেট পরে, লাল পতাকা উড়িয়ে সেই উদযাপনে যোগ দেন। নরওয়ের কোচ স্টালে সোলবাক্কেন বলেন, ‘আজ পুরো দেশ একসঙ্গে বৈঠা চালাচ্ছে। এ উদযাপন আসলে আমাদের ঐক্যের প্রতীক।’ হালান্ডের কণ্ঠেও ছিল একই আবেগ, ‘এটি নরওয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য দিনগুলোর একটি।’

ব্রাজিল-নরওয়ে ম্যাচের আগে গোলের লড়াইটা ছিল মেসি ও এমবাপ্পের মধ্যে। তবে ব্রাজিলের জালে দুবার বল পাঠিয়ে মেসি ও এমবাপ্পেকে ধরে ফেলেন নরওয়েজিয়ান বিস্ময় কিড হালান্ড। এর মধ্য দিয়ে জন্ম হলো অসংখ্য রেকর্ডের। প্রথম তিনজন ভিন্ন খেলোয়াড় একই আসরে সাত কিংবা তার বেশি গোল করলেন। বিশ্বকাপের সবে শেষ ষোলো রাউন্ড চলছে।

নিজের অভিষেক আসরে সাত গোল করে আরেকটি রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন হালান্ড। ১৯৭৪ সালে পোল্যান্ডের গ্রেগর লাতো অভিষেক বিশ্বকাপে সাত গোল করেছিলেন। তার পাশে বসলেন ২৫ বছর বয়সী ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার হালান্ড। অভিষেক আসরে মেসি (১), এমবাপ্পে (৪) ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (১) মিলে করেছেন ৬ গোল, আর হালান্ড একাই করলেন ৭ গোল!

চলতি বিশ্বকাপে তৃতীয়বারের মতো ম্যাচে একাধিক গোল করেছেন হালান্ড। ফ্রান্সের জঁ ফতেঁ (চারবার, ১৯৫৮) ও হাঙ্গেরির সান্দর ককসিচের (চারবার, ১৯৫৪) আছে এক বিশ্বকাপে চারবার একাধিক গোল করার কীর্তি।

২০১৪ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে হারিয়েছিল জার্মানি। ওই ম্যাচে জোড়া গোল করেছিলেন জার্মানির টনি ক্রুস আর আন্দ্রে শুরলে। তারপর প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করলেন হালান্ড।

চলতি বিশ্বকাপে চারবার ম্যাচজয়ী গোল করেছেন হালান্ড। বিশ্বকাপের ইতিহাসে চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে এ কীর্তি গড়েছেন তিনি। তার আগে পোল্যান্ডের গ্রিগর লাতো, ইতালির সালভাতোর শিলাচি ও গার্ড মুলার চারবার ম্যাচজয়ী গোল করেছেন।