প্রথমার্ধের পেশিশক্তি আর ৫৩ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের সেই আঘাত আর্জেন্টিনাকে ঠেলে দিয়েছিল খাদের কিনারায়। গ্যালারির গর্জন আর বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাসে মনে হচ্ছিল এটাই বুঝি নীল-সাদা জার্সিতে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ জাদুকরের অলিখিত বিদায়ের সুর। কিন্তু ফুটবল বড় অনিশ্চিত, বড় মায়াবী। যখন বিশ্বমঞ্চ থেকে ১০ নম্বর জার্সির পদচিহ্ন মুছে যাওয়ার আশঙ্কায় বুয়েন্স আয়ার্স থেকে রোজারিওর গলি নিস্তব্ধ হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই শুরু হলো সেই অবিশ্বাস্য দ্রোহ।
৮৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের বজ্রসম গোল যেন মৃতদেহে প্রাণ ফিরিয়ে আনল, আর ম্যাচের ভাগ্যবিধাতা হয়ে ৯২ মিনিটে যখন লাউতারো মার্টিনেজ বল জালে জড়ালেন, তখন আটলান্টার মাঠ রূপ নিল এক উন্মাতাল উৎসবে। দুটো গোলেরই উৎস সেই লিওনেল মেসি। তীব্র জেদ নিয়ে আবারো অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে ২-১ গোলে জয়ের নতুন উপাখ্যান লিখল আর্জেন্টিনা। পৌঁছে গেল বিশ্বকাপের ফাইনালে। যেখানে তাদের অপেক্ষায় স্পেন।
আটলান্টার সেমিফাইনালে গোলশূন্য প্রথমার্ধের গল্পটা ছিল সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি শক্তি, সংঘর্ষ আর স্নায়ুযুদ্ধের। বল দখলে শুরু থেকেই এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড, কিন্তু লিওনেল স্কালোনির শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ ভাঙার মতো পরিষ্কার সুযোগ তারা তৈরি করতে পারেনি। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা ধীরে ধীরে ম্যাচে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পেয়ে শেষদিকে লিওনেল মেসির পায়ে আক্রমণের ধার ফিরিয়ে আনে।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের খেলায় ছিল প্রচণ্ড আগ্রাসন। প্রথম ১০ মিনিটেই সাতটি ফাউল হয়। এনজো ফার্নান্দেজের আঘাতে এলিয়ট অ্যান্ডারসন মাঠে লুটিয়ে পড়েন, পরে আবারো অ্যান্ডারসন ও ফার্নান্দেজের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, এটি শুধু ফুটবলের নয়, মানসিক লড়াইয়েরও ম্যাচ। ইংল্যান্ড বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে দুই উইং ব্যবহার করে আক্রমণ গড়ার চেষ্টা করে। ডেজেড স্পেন্স ও রিস জেমস বারবার ওপরে উঠে আসেন। সপ্তম মিনিটে মরগান রজার্সের প্রচেষ্টায় প্রথম কর্নার পায় ইংল্যান্ড। সেই কর্নার থেকে জন স্টোনস সিমিওনের সঙ্গে শারীরিক লড়াইয়ে পেনাল্টির আবেদন জানালেও রেফারি তাতে সাড়া দেননি।
আর্জেন্টিনা শুরুতে তুলনামূলক রক্ষণাত্মক থাকলেও মাঝমাঠে কঠোর ট্যাকল আর চাপ দিয়ে ইংল্যান্ডের ছন্দ নষ্ট করার চেষ্টা করে। প্রথম ১০ মিনিটেই তাদের চারটি ফাউল এ বিশ্বকাপে কোনো দলের যৌথ সর্বোচ্চ হিসেবে নথিভুক্ত হয়। মধ্যভাগে ইংল্যান্ডের আক্রমণ আরো ধারালো হতে থাকে। অ্যান্থনি গর্ডন ডান দিক থেকে ভেতরে এসে কয়েকবার জায়গা তৈরির চেষ্টা করেন, রিস জেমসের নিচু ক্রসও এমিলিয়ানো মার্টিনেজ সহজেই ধরে ফেলেন। তবে হ্যারি কেইন দীর্ঘ সময় আড়ালেই ছিলেন। আধাঘণ্টা পেরিয়ে প্রথমবারের মতো নিচে নেমে বল নিয়ে রিস জেমসকে দারুণ একটি লং পাস দিলেও সেই আক্রমণ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।
৩২ মিনিটে জুড বেলিংহাম সিমিওনেকে কাটিয়ে এগিয়ে গিয়ে এনজো ফার্নান্দেজের ফাউল আদায় করেন। বিপজ্জনক জায়গা থেকে পাওয়া ফ্রি-কিকও কাজে লাগাতে পারেনি ইংল্যান্ড। এরপর রাইসের আরেকটি নিখুঁত ক্রসে স্টোনস হেড করলেও চাপে থাকায় বল সাইড নেটে লাগে। এ সময়টায় ইংল্যান্ডের চাপই বেশি ছিল। ৩৬ মিনিটে বেলিংহাম আরেকটি বিপজ্জনক ফ্রি-কিক আদায় করলে মনে হচ্ছিল গোল আসতে পারে। কিন্তু আর্জেন্টিনা সেই আক্রমণ সামলে পাল্টা দ্রুত কাউন্টার গড়ে।
ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত আসে ৩৭ মিনিটে। নিজেদের বক্স থেকে বল পরিষ্কার করে দ্রুত আক্রমণে ওঠেন মেসি। মাঝমাঠে একের পর এক তিন ইংলিশ খেলোয়াড়কে ড্রিবল করে পেরিয়ে যাওয়ার পর অ্যান্ডারসন তাকে শক্ত ট্যাকলে থামান। সঙ্গে সঙ্গে পুরো আর্জেন্টিনা দল রেফারিকে ঘিরে ধরে কার্ডের দাবি জানায়। শেষ পর্যন্ত অ্যান্ডারসনকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। এ ঘটনার পর থেকেই আর্জেন্টিনার খেলায় আত্মবিশ্বাস স্পষ্টভাবে বেড়ে যায়। ৩৯ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ প্রায় এগিয়েই দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনাকে। বক্সের বাইরে থেকে তার জোরালো শট জর্ডান পিকফোর্ডকে লাফিয়ে উঠতে বাধ্য করে, তবে বল অল্পের জন্য ক্রসবারের ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়। এটিই ছিল প্রথমার্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক গোলের সুযোগ।
এরপর মেসি ক্রমেই ম্যাচে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। মাঝমাঠে নেমে বল সংগ্রহ, ছোট ছোট পাসে আক্রমণ গড়া এবং সতীর্থদের খেলায় যুক্ত করার মাধ্যমে ইংল্যান্ডকে সতর্ক থাকতে বাধ্য করেন তিনি। ৪২ মিনিটে ইংল্যান্ডের পাল্টা আক্রমণ থামাতে গিয়ে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ হলুদ কার্ড দেখেন। প্রথমার্ধের শেষ দিকে খেলা আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে ৩ মিনিট যোগ হলেও কোনো দল গোলের দেখা পায়নি। বিরতির বাঁশি বাজার পরও উত্তেজনা থামেনি। হ্যারি কেইন ও লিওনেল মেসি—দুই অধিনায়কই রেফারিকে ঘিরে সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানান। শেষ পর্যন্ত মেসিই সবচেয়ে পরে রেফারির কাছ থেকে সরে যান।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচের গতি পাল্টে যায়। বিরতি থেকে ফিরেই প্রথম আঘাত হানে আর্জেন্টিনা। ৪৭ মিনিটে দীর্ঘ পাস ধরে শারীরিক শক্তিতে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারকে সরিয়ে বক্সে ঢুকে পড়েন হুলিয়ান আলভারেজ। কাছের পোস্ট লক্ষ্য করে নেয়া তার জোরালো শট দারুণ দক্ষতায় এক হাতে ফিরিয়ে দেন জর্ডান পিকফোর্ড।
এ ধাক্কা সামলে দ্রুতই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় ইংল্যান্ড। ৫১ মিনিটে মরগান রজার্স ডান প্রান্তে জায়গা বের করার চেষ্টা করলেও লিসান্দ্রো মার্টিনেজ তার ক্রস আটকে দেন। পরের মিনিটেই জুড বেলিংহামের দৌড় থামাতে জার্সি টেনে ফেলে দেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। আরেকটি কঠোর ট্যাকলের জন্য হলুদ কার্ড দেখতে হয় আর্জেন্টাইন সেন্টারব্যাককে।
এর ১ মিনিট পরই আসে ম্যাচের প্রথম গোল। ৫৩ মিনিটে হ্যারি কেইনের দূরপাল্লার নিখুঁত পাস আর্জেন্টিনার রক্ষণে অস্থিরতা তৈরি করে। বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ পুরোপুরি সফল হতে পারেননি। সুযোগ বুঝে ডেকলান রাইস বল বাড়িয়ে দেন ডানদিকে থাকা মরগান রজার্সের কাছে। সময় নিয়ে মাপা ক্রস পাঠান রজার্স। সেই বলের সামনে দিয়ে নাহুয়েল মোলিনাকে ফাঁকি দিয়ে দৌড়ে এসে প্রথম ছোঁয়াতেই জালে জড়িয়ে দেন অ্যান্থনি গর্ডন। এমিলিয়ানো মার্টিনেজের কোনো সুযোগ ছিল না। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড।
গোল হজমের পরই আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। ৫৭ মিনিটে সমতা ফেরানোর সুবর্ণ সুযোগও তৈরি হয়। জিওভানি সিমিওনে ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ ভেদ করে একেবারে ফাঁকা জায়গায় ছুটে যাচ্ছিলেন। মনে হচ্ছিল গোল নিশ্চিত। ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন ছুটে এসে অসাধারণ স্লাইড ট্যাকলে বল কর্নারের বিনিময়ে বাইরে পাঠান ডেজেড স্পেন্স। তবে গোল করার পর ইংল্যান্ডের খেলায় কিছুটা অস্থিরতা দেখা দেয়। ৬০ মিনিটে লিওনেল মেসি কয়েকজনকে কাটিয়ে বক্সের দিকে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করলেও মার্ক গেহি তাকে থামিয়ে দেন।
৬২ মিনিটে বক্সের সামনে একেবারে ফাঁকা জায়গায় বল পান এনজো ফার্নান্দেজ। কিন্তু কোনো চাপ না থাকলেও তার ডান পায়ের শট ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়। সমতায় ফেরার সেই সুযোগও হাতছাড়া হয় স্কালোনির দলের। এরপর একের পর এক আক্রমণ চালিয়েও গোলের দেখা পাচ্ছিল না আর্জেন্টিনা। ৮৫ মিনিটে ম্যাচে ফেরে আলবেসিলেস্তেরা। শর্ট কর্নার থেকে বল পান লিওনেল মেসি। তিনি দ্রুত বক্সের বাইরে অপেক্ষায় থাকা এনজো ফার্নান্দেজকে বল বাড়িয়ে দেন। একবার বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দূরপাল্লার বাঁকানো শটে জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন এনজো। তার দারুণ ফিনিশে ১-১-এ সমতায় ফেরে আর্জেন্টিনা।
এরপর ম্যাচের ৯২ মিনিটে ডান প্রান্তে জেড স্পেন্সকে সামনে রেখে বল ধরে রাখেন মেসি। এরপর কৌশলে তাকে কাটিয়ে জায়গা তৈরি করে ডান পায়ে পিকফোর্ডের মাথার ওপর দিয়ে দূরের পোস্টে নিখুঁত ক্রস পাঠান আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। সেখানে অরক্ষিত থাকা লাউতারো মার্টিনেজ ফাঁকা জালে হেড করে আর্জেন্টিনাকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত জয় নিয়েই বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে মেসির দল।















