মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। হাসপাতালের দর্শনার্থীদের সময় শেষ। কিন্তু পেদ্রি, দানি ওলমো, ইনিগো মার্তিনেস আর এরিক গার্সিয়া তখনো শহরে সাইকেল চালিয়ে ফিরছিলেন। অ্যাভিনগুদা ডায়াগোনাল ধরে তারা ছুটে চলেছেন ফিল্মি এক পরিণতির দিকে—লা লিগা জিতে ফিরেছেন কর্নেইয়া থেকে, বার্সেলোনার ‘ডাবল’ নিশ্চিত করে। তাদের গন্তব্য হাসপাতালে সদ্য জরুরি ভিত্তিতে অ্যাপেন্ডিসাইটিস সার্জারি থেকে সেরে ওঠা ফেরান তোরেসের পাশে দাঁড়ানো। তিনি ছিলেন ওয়ার্ডে, টেলিভিশনের সামনে—নিজেকে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেখছিলেন। তারা সেখানে গিয়েছিলেন তোরেসকে বিজয় সংবাদটি সরাসরি শোনাতে, যদিও ফেরান ততক্ষণে সেটা টিভিতেই দেখে ফেলেছেন।
বার্সেলোনার ২-০ গোলের জয়ে এস্পানিওলকে হারিয়ে শিরোপা নিশ্চিত করার মুহূর্তটি ছিল মৌসুমের অন্যতম আবেগঘন এক দৃশ্য। এল ক্ল্যাসিকোর অন্তিম মুহূর্তে ফারমিন লোপেজের গোলের পর পুরো স্কোয়াডের সেই বিখ্যাত উদযাপনের পর গোলটাই বাতিল হয়েছিল। সেই অতৃপ্তি থেকেই কিনা, ফারমিন এবারো ম্যাচের একদম শেষদিকে করে বসলেন আরেকটি দুর্দান্ত গোল। লিগ শিরোপা নিশ্চিত করা সেই গোলের পরও ভেঙে গেছে কাতালানদের উল্লাসের বাঁধ!
রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ম্যাচে জয়ের পর কোচ হান্সি ফ্লিককে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, মৌসুম শেষে কোন বিষয়টি তাকে সবচেয়ে বেশি গর্বিত করে। তার উত্তর ছিল, ‘আমরা একটি পরিবার হয়ে উঠেছি। ড্রেসিংরুমে এই অনুভূতি আমি আগে কখনো অনুভব করিনি। সবাই একে অপরের জন্য লড়েছে।’ আর এ কারণেই যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, এই লিগটা কার—লামিন ইয়ামাল? নাকি তার?—তিনি বলেন, ‘বার্সেলোনার। এটি কারোর একার নয়।’
ইয়ামাল করেছিলেন আরেকটি ম্যাজিক্যাল গোল—ঠিক যেমনটা তিনি করে থাকেন। পেদ্রির খেলার ছন্দে ছিল কাব্য, আর রাফিনহা ৫৯টি গোলে সরাসরি অবদান রেখে প্রমাণ করে দিলেন কেন তিনি গুরুত্বপূর্ণ। তবে আসল ব্যাপার হলো এটা একার গল্প নয়। প্রতিটি খেলোয়াড় আগের চেয়ে ভালো হয়েছে, দল হয়ে তারা ছিল সেরা এবং উপভোগের মন্ত্রও ছিল প্রচণ্ড কার্যকর। ফারমিন লোপেজ যখন এস্পানিওলের বিপক্ষে দ্বিতীয় গোলটি করলেন, তখন বার্সার গোল সংখ্যা দাঁড়াল ৯৭-এ, সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১৬৯। শুধু রিয়ালের বিপক্ষেই ৮টি, আর ৮টি এসেছিল সুপার কাপ ও কোপা দেল রেতে।
এই মৌসুমটা শেষ হওয়ার কথা ছিল না সেই দৃশ্য দিয়ে, যেখানে ভয়চেক শেজনি কর্নেইয়ার ড্রেসিংরুমে বসে মোটা সিগার ধরিয়ে উদযাপন করছেন। কারণ মৌসুমের শুরুতে তো তিনি আদৌ কোনো ফুটবলারই ছিলেন না! শেষ হওয়ার কথা ছিল না সেইভাবে, যেখানে মার্ক কাসাদোকে সমর্থকেরা কাঁধে তুলে নিয়ে যাচ্ছে কানালেতেসে—যেখানে বরাবরই বার্সা ভক্তরা উল্লাসে মেতে ওঠে। মাত্র ১০ মাস আগেও যদি কাসাদো চলে যেত, কেউ টেরও পেত না।
কারণ বার্সার জন্য এ মৌসুম শুরুই হয়েছিল অনিশ্চয়তায়। রিয়াল মাদ্রিদ দলে নিয়েছিল এমবাপ্পেকে, অ্যাটলেটিকো করেছিল সর্বোচ্চ ব্যয়। অন্যদিকে বার্সা দানি ওলমোকে সই করালেও নিবন্ধন করতে পারছিল না। কোচ জাভি হার্নান্দেজ সেপ্টেম্বরে চুক্তি নবায়ন করলেন, জানুয়ারিতে পদত্যাগ করলেন, এপ্রিলে ফের ফিরলেন এবং মেতে ছাঁটাই হলেন।
শেষ পর্যন্ত এলেন হান্সি ফ্লিক—সঙ্গে করে আনলেন পরিকল্পনা আর ব্যক্তিত্ব। তিনি বদলে দিলেন সংস্কৃতি, অনুশীলন পদ্ধতি, আচরণগত শৃঙ্খলা এবং দলের শরীরী প্রস্তুতি। জুলস কুন্ডে ও ইনিয়াকি পেনিয়া সময়মতো না পৌঁছানোয় বাদ পড়লেন, আর করলেন না সেই ভুল। হান্সি মিডিয়া বিতর্কে না গিয়ে নিজের পথে স্থির থেকে খেলোয়াড়দের শিখিয়েছেন—প্রেসিং বাড়াও, প্রতিপক্ষকে জায়গা দিয়ো না। পরিকল্পনা স্পষ্ট, বাস্তবায়ন নিখুঁত—আর ম্যাচের পর ম্যাচ পিছিয়ে পড়েও বারবার ফিরে আসার রোমাঞ্চও তাই ছিল অতুলনীয়।
এ মৌসুমে সবকিছু বদলে দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ফ্লিক। খেলার ধরনে সাহসিকতা ছিল তার আরেক চিহ্ন—এত হাই ব্যাকলাইন লাইন, এত বেশি অফসাইড ট্র্যাপ—এমন কিছু ইউরোপিয়ান ফুটবলে খুব কমই দেখা গেছে। বার্সেলোনা প্রতিপক্ষকে অফসাইডে ফেলেছে ২৮৯ বার, তাদের ৩৮টি গোল বাতিল হয়েছে অফসাইডের কারণে। ট্যাকটিক্যাল সাহস বলতে যা বোঝায়, সেটা বার্সা এ মৌসুমে দেখিয়েছে।
মৌসুমের শুরুতে একাদশে তিনজন ১৭ বছর বয়সী খেলোয়াড় ছিলেন এবং শেষ ম্যাচে একাদশে ছিল লা মাসিয়া থেকে উঠে আসা নয়জন। বার্সেলোনা যতটুকু ঝুঁকি নিয়েছে তরুণদের ওপর আস্থা রেখে তার সুফলটাও পেয়েছে।
তবে শুধু তরুণরাই নয়, অন্য প্রান্তে ছিলেন রবার্ট লেভানডোভস্কি। জাভি তাকে ধরে রাখার ব্যাপারে খুব আগ্রহী ছিলেন না। তবে ফ্লিক তাকে আবার আক্রমণভাগে ফিরিয়ে আনেন। পোলিশ তারকা এখন ৪০ গোল নিয়ে মৌসুম শেষ করার কথা ভাবছেন। আবার মার্ক-আন্দ্রে টার স্টেগেন হাঁটুর ইনজুরিতে পুরো মৌসুমটাই মাঠের বাইরে থাকার পরিস্থিতিতে চলে গেলেন। লেভা তখন অবসরে চলে যাওয়া সাবেক জুভেন্টাস গোলরক্ষক ভইচেক শেজনিকে ফোন করে অবসর থেকে ফিরে আসার জন্য রাজি করান। চেইন স্মোকার শেজনিও এখন ডাবল বিজয়ী। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কখনই সুইপার গোলরক্ষকের দায়িত্ব পালন না করা শেজনিও এখন বার্সার ‘বল প্লেয়িং’ গোলকিপার!
অন্য অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রাও ছিলেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে পাউ কুবারসির পাশে ইনিগো মার্তিনেস। একইভাবে আসবে কুন্ডের নামও। শেষ মাসগুলোতে ফ্র্যাঙ্কি ডি ইয়ং হয়ে উঠলেন আয়াক্সের সেই ফ্র্যাঙ্কি, যাকে সবাই চাইত। ফুটবলই ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবা রাফিনিয়া উপহার দিলেন জীবনের সেরা মৌসুম। ব্যালন ডি’অরের সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও থাকছেন এ ব্রাজিলিয়ান। মাঝমাঠে মিডফিল্ড জেনারেল হয়ে উঠলেন পেদ্রি। স্পষ্ট হয়েছে তার শারীরিক প্রস্তুতিও। ফ্লিক স্পোর্টিং ডিরেক্টর ডেকোকে নতুন চিকিৎসা ও ফিটনেস স্টাফ আনার জন্য প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানান। পেদ্রি মাঠে আরো নিচে থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছেন। মাত্র ২২ বছর বয়সী এই স্পেনিয়ার্ড গত তিন বছরে ৭৫টি ম্যাচ মিস করেছিলেন। এবার এস্পানিওলে মৌসুমে তার ৩৩তম লিগ ম্যাচ খেলেছেন। লিগে আর কেউ এত বেশি কিলোমিটার জায়গা কাভার করেনি, এত বেশি বলও কেউ প্রতিপক্ষের পা থেকে কেড়ে নেয়নি।
আতশবাজি ফোটেনি, ট্রফি তোলার অনুষ্ঠান হয়নি। তার পরও শেষ রাতে চারটি সাইকেল ছুটছিল বার্সেলোনার রাস্তায়, আর সেটাই ছিল এই মৌসুমের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য—চার বন্ধু, সতীর্থ, খেলোয়াড়, চ্যাম্পিয়ন। ফিরছেন সেই খেলোয়াড়ের কাছে, যিনি মাঠে না থেকেও জয়ের অংশ হয়ে আছেন।
এ পরিবর্তন সবার জন্যই ছিল দারুণ ইতিবাচক। ফ্লিক তার খেলোয়াড়দের বলেছিলেন, শুরুটাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—পয়েন্ট তুলে নিতে হবে তখনই যখন রিয়াল মাদ্রিদ এমবাপ্পেকে মানিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়ায় থাকবে। প্রথম ক্ল্যাসিকো পর্যন্ত তারা সব ম্যাচেই জিতেছিল এবং সেদিন রাতে মাদ্রিদকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেয় বার্সা। সেই ম্যাচে মাদ্রিদকে ১২ বার অফসাইডে ফেলে যেন দিয়েছিল স্পষ্ট ঘোষণা—এই মৌসুমের লক্ষ্য কী হবে। সেই ম্যাচেই বার্সার মৌসুম দাঁড়িয়ে গেল।
তবে ফ্লিকের ভাষায় এক ‘জঘন্য নভেম্বরে’ বার্সেলোনা এরপর হারাল তাদের অধিনায়ক ও গোলরক্ষক টার স্টেগানকে। ডিসেম্বর পর্যন্ত চলল এই অবনমন। সম্ভাব্য ২৪ পয়েন্টের মধ্যে মাত্র ৬ পয়েন্ট পেয়ে হারিয়ে ফেলে এগিয়ে থাকার সুবিধাটাও। রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে ৭ পয়েন্ট পেছনে পড়ে যায়। বার্সা তখন পয়েন্ট টেবিলে অ্যাটলেটিকোর চেয়েও নিচে। ২০২৪ সালের শেষ ম্যাচে তারা দিয়েগো সিমেওনের দলের বিরুদ্ধে পুরোপুরি আধিপত্য দেখালেও ২-১ গোলে হেরে বসে। এটি ছিল ঘরের মাঠে তাদের টানা তৃতীয় হার। এর আগে তলানিতে থাকা লেগানেস ও লাস পালমাসের বিরুদ্ধেও হার জুটেছিল বার্সার কপালে।
এই দৃশ্যপট স্পেনে এরপর আর ঘটেনি। সান সিরোতে হারার পর মাদ্রিদের বিপক্ষে দুই গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়েও হয়নি তার পুনরাবৃত্তি। শিরোপা লড়াই আবার জেগে উঠল। বার্সা ভেঙে পড়তেই পারত, সাধারণ কোনো দল হলে সেটাই করত। কিন্তু তার পরিবর্তে তারা দিল দশমবারের মতো ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয়া পারফরম্যান্স এবং ৩০ মিনিটেরও কম সময়ে চার গোল দিয়ে মাদ্রিদকে এমনভাবে বিধ্বস্ত করল, যেন মনে হচ্ছিল প্রথম দুই গোল তারা ইচ্ছা করেই খেয়েছে, আর সেটাও নিছক খেলায় উত্তেজনা আনার জন্য! ওই ২৪ মিনিটে মাদ্রিদ তাদের অর্ধ থেকে বেরোতেই পারেনি। তারপর বৃহস্পতিবার রাতে শেজনি ও ইয়ামাল বার্সাকে আরেকবার জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিল।
মৌসুমের মাঝামাঝি আট সপ্তাহের মধ্যে বার্সেলোনা মাত্র একটিই ম্যাচ জিতেছিল। সেখান থেকে ফিরে এসে দলটির পাশে মৌসুমের খতিয়ানে লেখা রইল— ২৯ জয়, এক ড্র, এক হার, একটি সুপার কাপ, একটি কোপা দেল রে এবং একটি লা লিগা শিরোপা।
‘যখন আমি মানুষকে দেখি তারা খুশি, তারা হাসছে—আমার কাছে সেটাই সবচেয়ে বড় জিনিস। এখন উদযাপনের সময়’—বৃহস্পতিবার রাতে বলেছিলেন ফ্লিক। আর তার মানে ছিল, সময়টা সবার জন্যই, উদযাপনের।
আতশবাজি ফোটেনি, ট্রফি তোলার অনুষ্ঠান হয়নি। তারপরও শেষ রাতে চারটি সাইকেল ছুটছিল বার্সেলোনার রাস্তায়, আর সেটাই ছিল এই মৌসুমের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য—চার বন্ধু, সতীর্থ, খেলোয়াড়, চ্যাম্পিয়ন। ফিরছেন সেই খেলোয়াড়ের কাছে, যিনি মাঠে না থেকেও জয়ের অংশ হয়ে আছেন।










