৯০ মিনিটের লড়াই শেষে ঠিক হয়ে যাবে কারা সরাসরি শেষ ৩২-এ উঠবে, কারা সেরা তৃতীয় দলের আশা নিয়ে অপেক্ষা করবে, আর কার বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হবে গ্রুপ পর্বেই। আগামীকাল সকাল ৬টায় গুয়াদালাহারায় মুখোমুখি হবে স্পেন ও উরুগুয়ে, হিউস্টনে কেপ ভার্দের প্রতিপক্ষ সৌদি আরব। অন্যদিকে সকাল ৯টায় ভ্যাঙ্কুভারে বেলজিয়ামের সামনে নিউজিল্যান্ডের চ্যালেঞ্জ, আর সিয়াটলে লড়বে মিসর ও ইরান। চার ম্যাচের সমীকরণও আলাদা। স্পেন ও মিসরের সামনে গ্রুপসেরা হয়ে নকআউটে ওঠার সুযোগ। উরুগুয়ে ও বেলজিয়ামের জন্য জয়ই সবচেয়ে নিরাপদ পথ। কেপ ভার্দে জিতলে ইতিহাস গড়ে শেষ ৩২ নিশ্চিত করতে পারে, আর সৌদি আরব ও নিউজিল্যান্ডের সামনে কার্যত বাঁচা-মরার লড়াই। ইরানের জন্যও সমীকরণ কঠিন। জিতলে পথ অনেকটাই পরিষ্কার, অন্য যেকোনো ফল তাদের ঠেলে দিতে পারে তৃতীয় স্থানের জটিল হিসাবের দিকে। এ চার ম্যাচে শুধু জয়-পরাজয় নয়, গোল ব্যবধান, গোল সংখ্যা, এমনকি অন্য মাঠের একটি গোলও বদলে দিতে পারে শেষ ৩২-এর পুরো চিত্র।

সবচেয়ে বড় আকর্ষণ গ্রুপ ‘এইচ’। দুই ম্যাচ শেষে ৪ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে থাকা স্পেন মুখোমুখি হচ্ছে লাতিন দল উরুগুয়ের। কেপ ভার্দের বিপক্ষে হতাশাজনক গোলশূন্য ড্রর পর সৌদি আরবকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল নিজেদের ছন্দে ফিরেছে। স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের বল দখল নয়; বরং বল হারানোর পর মুহূর্তের মধ্যেই তা পুনরুদ্ধার করার ক্ষমতা। মাঝমাঠে রদ্রি ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করেন, আর দুই প্রান্তে দ্রুত উইঙ্গারদের ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে প্রশস্ত করতে চায় স্পেন। প্রতিপক্ষ যদি নিচু ব্লকে রক্ষণ সাজায়, তখন ফুলব্যাকদের ওভারল্যাপ এবং মিডফিল্ডারদের ভেতরে ঢুকে খেলার প্রবণতাই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কিন্তু উরুগুয়ের বিপক্ষে সেই পরিকল্পনা সহজ হবে না। মার্সেলো বিয়েলসার দল এখনো টুর্নামেন্টে নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারেনি। দুই ড্রয়ে মাত্র ২ পয়েন্ট নিয়ে তারা চাপের মুখে। তবে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি উচ্চ প্রেসিং। প্রতিপক্ষের বিল্ড-আপ ভেঙে দ্রুত আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করে তারা। মাঝমাঠে ম্যান টু ম্যান প্রেস এবং সামনের সারির আগ্রাসী চাপ দিয়ে স্পেনকে ভুল করাতে পারলে ম্যাচের চিত্র বদলে যেতে পারে। তবে এ প্রেসিং ভাঙতে পারলে স্পেনের জন্যও বড় বড় জায়গা তৈরি হবে। তাই ম্যাচটি অনেকটাই নির্ভর করবে প্রথম প্রেস ভাঙতে স্পেন কতটা সফল হয় এবং উরুগুয়ে কতক্ষণ সেই তীব্রতা ধরে রাখতে পারে তার ওপর।

একই সময়ে হিউস্টনে মুখোমুখি হবে কেপ ভার্দে ও সৌদি আরব। টুর্নামেন্টের অন্যতম চমক কেপ ভার্দে। শক্তিশালী দুই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ড্র করে তারা প্রমাণ করেছে, শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ ও দ্রুত পাল্টা আক্রমণের সমন্বয়ে বড় দলগুলোকেও আটকে রাখা সম্ভব। বলের দখল প্রতিপক্ষকে ছেড়ে দিয়েও মাঝমাঠের ব্লক অটুট রাখা এবং সুযোগ পেলেই দুই প্রান্ত ব্যবহার করে দ্রুত উঠে আসাই তাদের মূল পরিকল্পনা। সৌদি আরবের বিপক্ষেও সম্ভবত একই কৌশল দেখা যাবে।

অন্যদিকে সৌদি আরবের সামনে সমীকরণ একটাই—জয়। কিন্তু জয় পেলেই সব শেষ নয়। অন্য ম্যাচের ফল এবং গোল ব্যবধানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে ম্যাচের শেষ দিকে প্রয়োজন হলে সৌদি কোচকে ঝুঁকি নিতেই হবে। অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে গিয়ে রক্ষণে জায়গা ছেড়ে দিলে সেটিই আবার কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

গ্রুপ ‘জি’-তেও নাটকীয়তার কমতি নেই। ৪ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে আছে মিসর। ইরানের বিপক্ষে ড্র করলেও নকআউটে ওঠার সম্ভাবনা জোরালো থাকবে, আর জিতলে গ্রুপসেরা হওয়ার পথ অনেকটাই নিশ্চিত। দুই পয়েন্ট করে নিয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে ইরান ও বেলজিয়াম। ফলে তাদের জন্য জয়ই সবচেয়ে নিরাপদ সমীকরণ। ড্র করলে নকআউটের আশা টিকে থাকতে পারে, তবে তখন তাকিয়ে থাকতে হবে অন্য ম্যাচের ফল এবং সেরা তৃতীয় দলের হিসাবের দিকে। ১ পয়েন্ট নিয়ে তলানিতে থাকা নিউজিল্যান্ডের সামনে কার্যত জিততেই হবে সমীকরণ। ড্র বা হার তাদের বিদায়ের খুব কাছাকাছি নিয়ে যাবে।

আগামীকাল সকাল ৯টায় ইরানের বিরুদ্ধে নামবে মিসর। বেলজিয়ামের সঙ্গে ড্রর পর নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসে উজ্জীবিত আফ্রিকার দলটি। পুরো আক্রমণভাগের কেন্দ্রবিন্দু অবশ্যই মোহাম্মদ সালাহ। ইরানের শক্তি আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংগঠিত রক্ষণ, কমপ্যাক্ট ব্লক ও নির্ভুল ট্রানজিশন। প্রতিপক্ষকে বলের দখল দিয়ে অপেক্ষা করার প্রবণতা তাদের বহুদিনের। ফলে মিসর যদি অতিরিক্ত ওপরে উঠে যায়, তাহলে কাউন্টার অ্যাটাকেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে ইরান। বিশেষ করে দুই উইং দিয়ে দ্রুত আক্রমণ এবং সেট-পিসে তাদের দক্ষতা মিসরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

একই সময় ভ্যাঙ্কুভারে বেলজিয়াম ও নিউজিল্যান্ডের ম্যাচটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের শক্তিশালী দল হয়েও দুই ম্যাচে মাত্র ২ পয়েন্ট পেয়েছে বেলজিয়াম। সবচেয়ে বড় সমস্যা গোল করতে না পারা। সুযোগ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে ফিনিশিং ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে এবার আরো সরাসরি ফুটবল খেলতে দেখা যেতে পারে তাদের। দুই প্রান্ত দিয়ে ক্রস, বক্সে বেশি খেলোয়াড় পাঠানো এবং দ্রুত শট নেয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। নিউজিল্যান্ডের জন্যও এটি কার্যত ফাইনাল। ড্র কোনো কাজেই আসবে না। ফলে ম্যাচ যত গড়াবে, দুই দলই ঝুঁকি নিতে বাধ্য হবে। এতে ম্যাচটি চারটির মধ্যে সবচেয়ে খোলা ও আক্রমণাত্মক লড়াই হয়ে উঠতে পারে।