লিওনেল মেসি আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এখন আর ইউরোপের মাঠ মাতাচ্ছেন না। তবু ইউরোপিয়ান ফুটবলের মহাযজ্ঞে এখনো অসম্ভব সুন্দর দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। গোল, বিতর্ক, গ্যালারির গর্জন অনুসরণ করে ইউরোপের সব পথ সব চোখ এখন গিয়ে মিশেছে মিউনিখে। আলিয়াঞ্জ অ্যারেনায় ৩১ মে অনুষ্ঠিত হবে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালের মহারণ। ৩৬ দল শেষে সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে এসে ঠেকেছে দুটি নামে—পিএসজি ও ইন্টার মিলান। তার আগে ফুটবল বিশ্ব দেখেছে স্বপ্নের সমাধি, নতুন দিগন্তের অবিশ্বাস্য উত্থান-পতন, তারুণ্যের ঝলকানি, অভিজ্ঞতার জয়গান, জায়ান্টদের ধরাশায়ী হওয়া আর নতুন তারার আগমন।

২০২৪-২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে টের পাওয়া যাবে হয়তো পিটার ড্রিউরির কণ্ঠের সেই চিরপরিচিত উত্তেজনা—প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি পাস, প্রতিটি ট্যাকল যেন চোখের সামনে একটু একটু করে তৈরি করে জাদুবাস্তবতা! নতুন ফরম্যাটে ৩২ দলের বদলে ৩৬ দলের অংশগ্রহণে লিগ পর্ব থেকেই শুরু হয়েছিল অপ্রত্যাশিত নাটকীয়তা। পিএসজি ও ইন্টার মিলানের ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার আগে এমন অনেক ম্যাচই খুঁজে পাওয়া যাবে যেখানে স্টেডিয়াম যেন যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে রক্ত, ঘাম, লড়াইয়ে ছিল শেষ মুহূর্তেও হাল না ছাড়ার শপথ।

গ্রুপ পর্বে লিভারপুলের অপ্রত্যাশিত দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। নতুন ম্যানেজার আর্নে স্লটের অধীনে অল রেডরা ইয়ুর্গেন ক্লপের অনুপস্থিতি টেরই পাচ্ছে না। বার্সেলোনা ঘরোয়া লিগের সঙ্গে ইউরোপের কুলীন মঞ্চেও নিজেদের ফিরে পাওয়ার লড়াই করে যাচ্ছিল নতুন ম্যানেজার হান্সি ফ্লিকের কৌশলে। আর্সেনাল ও ইন্টার মিলানও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে সহজেই শেষ আটে জায়গা করে নেয়। চ্যাম্পিয়নস লিগে ফিরে আসা উনাই এমেরির অ্যাস্টন ভিলা সমীহ আদায় করে নিয়েছিল তাদের টোটাল ফুটবলের ইংলিশ সংস্করণ দিয়ে। বুন্দেসলিগা চ্যাম্পিয়ন বায়ার লেভারকুসেনও তাদের উড়ন্ত ফর্ম ধরে রেখেছিল ইউরোপের আঙিনায়। লিল ও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদও নিজেদের লড়াকু মানসিকতা দেখিয়ে শেষ আটের টিকিট নিশ্চিত করে।

কিন্তু আসল রোমাঞ্চ শুরু হয় নকআউট পর্বে। প্লে-অফের ম্যাচগুলো ছিল স্নায়ুক্ষয়ী। রিয়াল মাদ্রিদ ও ম্যানচেস্টার সিটির দ্বৈরথ ছিল দেখার মতো, দুই জায়ান্টের লড়াইয়ে এবার হালে পানি পায়নি ধুঁকতে থাকা পেপ গার্দিওলার ম্যান সিটি। কিলিয়ান এমবাপ্পের হ্যাটট্রিকে রিয়াল শেষ পর্যন্ত সিটিজেনদের স্বপ্ন ভেঙে দেয়। হ্যারি কেইনের দুরন্ত ফর্মে ভর করে বায়ার্ন মিউনিখ সেল্টিককে পরাজিত করে। ব্রেস্টের বিরুদ্ধে তাদের আক্রমণাত্মক ফুটবলের ঝলক দেখায় পিএসজি। স্পোর্টিং লিসবনকে হারিয়ে পরের রাউন্ডে ওঠে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড। পিএসভি আইন্দহভেন অতিরিক্ত সময়ে জুভেন্টাসের প্রতিরোধ ভেঙে দেয়। বেনফিকা ও মোনাকোর লড়াই ছিল সমানে সমানে, যেখানে শেষ হাসি হাসে বেনফিকা। ক্লাব ব্রুগ অঘটনের জন্ম দিয়ে হারিয়ে দেয় আটালান্টাকে। আর এসি মিলানকে পরাস্ত করে ফেইনুর্দ জায়গা করে নেয় শেষ ষোলোয়।

শেষ ষোলোর লড়াই ছিল আরো তীব্র। পিএসভিকে সহজেই পরাজিত করে আত্মবিশ্বাসের জানান দেয় আর্সেনাল। রিয়াল মাদ্রিদ ও অ্যাটলেটিকোর ‘মাদ্রিদ ডার্বি’ ফের উত্তাপ ছড়ায়, আর টাইব্রেকারে জয় পায় লস ব্লাঙ্কোসরা। পিএসজি লিগ পর্বের শীর্ষে থাকা লিভারপুলকে টাইব্রেকারে হারিয়ে দেয় বড় চমক। অ্যাস্টন ভিলার রূপকথার যাত্রা অব্যাহত থাকে ক্লাব ব্রুগকে হারিয়ে। বেনফিকাকে পরাজিত করে বার্সেলোনা তাদের ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্ক্ষা ধরে রাখে। বরুশিয়া ডর্টমুন্ড ও লিলের লড়াই ছিল হাড্ডাহাড্ডি, যেখানে শেষ হাসি হাসে ডর্টমুন্ড। বায়ার্ন মিউনিখ লেভারকুসেনের বিরুদ্ধে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখে। ইন্টার মিলান ফেইনুর্দকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটে।

কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচগুলো ছিল যেন একেকটি মহাকাব্য। ডেকলান রাইসের অবিশ্বাস্য জোড়া ফ্রিকিকে চ্যাম্পিয়নস লিগের রাজা রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে বহু বছর পর সেমিফাইনালে ওঠে মিকেল আর্তেতার আর্সেনাল। এ পর্বে ধ্রুপদি দুই লেগের পর অ্যাস্টন ভিলার স্বপ্নযাত্রা থামিয়ে দেয় পিএসজি। ডর্টমুন্ডের বিরুদ্ধে শেষ লেগে হারলেও প্রথম লেগের বড় জয় হান্সি ফ্লিকের বার্সেলোনার ইউরোপিয়ান জয়ের ক্ষুধা বজায় রাখে। বায়ার্ন মিউনিখের বিরুদ্ধে এক ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাস দেখিয়ে সেমিফাইনালে নিজেদের জায়গা পাকা করে নেয় সিমোনে ইনজাঘির ইন্টার মিলান।

সেমিফাইনালের লড়াই ছিল যেন আগুনের ফুলকি, যেখানে ঝুঁকিটা ছিল আকাশছোঁয়া। আর্সেনাল ও পিএসজির প্রথম লেগের ম্যাচটি প্যারিসে ১-০ গোলে জেতে পিএসজি। ফিরতি লেগে ঘরের মাঠে ২-০ গোলে জিতে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে ফরাসি চ্যাম্পিয়নরা। অন্যদিকে ইন্টার মিলান ও বার্সেলোনার দ্বৈরথ ছিল পুরনো দিনের সেই ক্ল্যাসিক লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি, বার্সার তারুণ্যের ঝড়ের বিরুদ্ধে কাতেনাচ্চিও কৌশলে ইন্টারের গ্ল্যাডিয়েটরদের যুদ্ধ! ক্যাম্প ন্যুতে প্রথম লেগের ম্যাচটি ৩-৩ গোলে ড্র হয়। মিলানে ফিরতি লেগে অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয়তায় ৪-৩ গোলে জয় পায় ইন্টার মিলান। এই ম্যাচে দুই দলের আক্রমণ, প্রতি আক্রমণ ও খেলোয়াড়দের মরিয়া প্রচেষ্টা ছিল দেখার মতো। রাফিনিয়া-লামিন ইয়ামালদের ঝলকানি থেমে যায় ৩৭ বছর বয়সী ক্যান্সারকে পরাস্ত করা ফ্রান্সেসকো আচেরবির গোলে। গোলরক্ষকদের অবিশ্বাস্য সব সেভ, মাঝমাঠের দখল নেয়ার জন্য দুই দলের খেলোয়াড়দের নিরন্তর প্রচেষ্টা–প্রতিটি মুহূর্ত ছিল উত্তেজনায় ভরপুর। গ্যালারির গর্জন, খেলোয়াড়দের আবেগ এবং রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে এই ম্যাচটি চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, এমন একটা ম্যাচ যা বহু বছর ধরে আলোচিত হবে।

এবারের আসরে দেখা গেছে বহুল অপ্রত্যাশিত ফল। এক সময়ের ইউরোপের স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত ম্যানচেস্টার সিটি, জুভেন্টাস, বায়ার্ন মিউনিখের মতো দলগুলোর বিদায় বুঝিয়ে দিয়েছে যে ফুটবলে কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়, এটাই খেলার সৌন্দর্য, এখানে সবকিছুই সম্ভব। তরুণ তুর্কিদের উত্থান ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের লড়াইয়ের মিশেলে এইবারের চ্যাম্পিয়নস লিগ পেয়েছে এক নতুন মাত্রা। মাঠের ভেতরের লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের বাইরের বিতর্কও ছিল নজর কাড়ার মতো। রেফারির কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলেছে।

ফাইনালের মঞ্চ এখন প্রস্তুত। মুখোমুখি হবে পিএসজি ও ইন্টার মিলান। একদিকে দেম্বেলে-দুয়েদের গতি ও ভিতিনিয়াদের প্লেমেকিং; অন্যদিকে লাউতারো মার্টিনেজ-ডামফ্রাইসদের সৃষ্টিশীলতা, আর গোলবারের নিচে অতন্দ্র ইয়ান সমার। ৩১ মে জার্মানির মিউনিখের অ্যালিয়েঞ্জ অ্যারেনায় অনুষ্ঠিত হতে চলা এই ফাইনালটি শুধু একটি ম্যাচ নয়, এটি দুটি ভিন্ন ফুটবল সংস্কৃতিরও লড়াই, দুটি ভিন্ন দর্শনের পরীক্ষা। কে হাসবে শেষ হাসি? কার হাতে উঠবে ইউরোপ সেরার সেই মহামূল্যবান ট্রফি? পিএসজির প্রথম নাকি ইন্টারের চতুর্থ?

ব্যালন ডি’অর হাতে তোলার জন্য দেম্বেলে মঞ্চ প্রস্তুত করবেন নাকি, আরো একবার উন্মাতাল গ্যালারির সামনে দু হাত প্রসারিত করে আইকনিক কোনো মুহূর্তের জন্ম দেবেন লাউতারো মার্টিনেজ? সে পর্যন্ত ফাইনালের অপেক্ষা, আর এটাই চ্যাম্পিয়ন্স লিগের জাদু!