কিছুদিন পর বিদায় নিতে যাচ্ছে ২০২৩। চলতি বছরে দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে অনেক কিছুর প্রথম সূচনা হয়েছে, আবার অনেক তারকাই তাদের কাজ নিয়ে ছিলেন আলোচনায়। চলচ্চিত্রাঙ্গনের অনেক শোবিজ তারকা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে কাজ করেও প্রশংসা পেয়েছেন। ২০২৩ সালের আলোচিত কয়েকজন তারকার তালিকায় আছেন জয়া আহসান, আজমেরি হক বাঁধন, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, আরেফিন শুভ, চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিম, আফরান নিশো, হৃদি হক, সঞ্জয় সমাদ্দারসহ আরো অনেকে।

জয়া আহসান

ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় মুখ জয়া আহসান। কয়েক বছর ধরে তিনি কলকাতার সিনেমায় নাম লিখিয়েছেন। সেখানেও প্রশংসিত এ অভিনেত্রী। চলতি বছর বলিউডে যাত্রা করে অভিনয় জীবনের নতুন সূচনা করেছেন জয়া। ভারতের জনপ্রিয় ওটিটি প্লাটফর্ম জি ফাইভে মুক্তি পেতে যাচ্ছে জয়া আহসানের প্রথম বলিউডের ওয়েব ফিল্ম ‘কড়ক সিং’। ‘পিঙ্ক’খ্যাত নির্মাতা অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী পরিচালিত এ সিনেমায় কড়ক সিংয়ের চরিত্রে অভিনয় করছেন পঙ্কজ ত্রিপাঠী, তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন জয়া।

কড়ক সিং সিনেমায় জয়ার চরিত্রের নাম নয়না। বলিউড অভিষেকের অভিজ্ঞতা নিয়ে জয়া আহসান বলেন, ‘কড়ক সিং আমার প্রথম বলিউড প্রজেক্ট। আমার সৌভাগ্য সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী আর সহ-অভিনেতা পঙ্কজ ত্রিপাঠী। অনেকদিন ধরেই তাদের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা ছিল আমার। যেহেতু আমি হিন্দিভাষী অভিনেতা নই, তাই অবশ্যই এ সিনেমা আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। এ চ্যালেঞ্জের কারণেই আমি সিনেমাটা না বলতে পারিনি।’ অন্যদিকে বলিউডের প্রথম সিনেমা ওটিটি পাল্টফর্মের কনটেন্টের বিবেচনায় সেরাদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন জয়া। ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ওয়েব কনটেন্টগুলো বিবেচনা করে সেরা পারফরম্যান্সের একটি তালিকা করেছে ভারতের সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস। সেখানেই নাম এসেছে জয়া আহসানের।

আজমেরি হক বাঁধন

আজমেরি হক বাঁধন বাংলাদেশের বিনোদন দুনিয়ার পরিচিত মুখ। দেশের সিনেমার বাইরেও দাপটের সঙ্গে কাজ করছেন এ অভিনেত্রী। চলতি বছর বলিউডে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে বাঁধন অভিনীত প্রথম হিন্দি ওয়েব ফিল্ম ‘খুফিয়া’। ফিল্মটিতে বলিউড অভিনেত্রী টাবুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন তিনি। সম্প্রতি বছরের শেষে খুফিয়ার জন্য নতুন প্রাপ্তি এসেছে বাঁধনের ঝুলিতে। ভারতীয় গণমাধ্যম ফিল্ম কম্পানিয়ন প্রকাশ করেছে ২০২৩-এর নারীকেন্দ্রিক সিনেমার পাঁচ অভিনেত্রীর নাম। ‘কুলেস্ট হিরোইনস অব দ্য ইয়ার’ শিরোনামের সে তালিকার দ্বিতীয় স্থানেই রয়েছেন বাংলাদেশের আজমেরি হক বাঁধন।

ক্যারিয়ারে নতুন সংযোজন ও প্রাপ্তি প্রসঙ্গে বাঁধন বলেন, ‘যেকোনো স্বীকৃতিই আনন্দের। কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়। বছর শেষে ক্যারিয়ারের সাফল্যে নতুন পালক যুক্ত হওয়ায় ভালোই লাগছে।’

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

গুণী নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। এ বছর মুক্তি পেয়েছে তার পরিচালিত ওয়েব ফিল্ম ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’। তবে এ সিনেমার মধ্য দিয়ে প্রথমবার ক্যামেরার সামনে হাজির হয়েছেন ফারুকী। নুশরাত ইমরোজ তিশার বিপরীতে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন এ নির্মাতা। বছরের শেষ দিকে পর্দায় রিয়েল লাইফ জুটির দেখা পেয়েছে দর্শক। অভিনয় প্রসঙ্গে ফারুকী বলেন, ‘অনেক দিন তো কাজ করছি। কখনো ভাবি নাই, অভিনয় করব। সেটাও করা হয়ে গেল। নিজেদের জীবন ছেঁকে গল্প বের করার মধ্যে একটা ভালনারেবিলিটি আছে। কিন্তু হৃদয় খুঁড়ে বেদনা বের করে আনাই তো শিল্পীর কাজ।’

সঞ্জয় সমাদ্দার

বাংলাদেশের নির্মাতা সঞ্জয় সমাদ্দার। নাটক ও টেলিছবি পরিচালনায় এক দশক পার করেছেন তিনি। এ বছর নির্মাতা হিসেবে বড় পর্দায় তার অভিষেক হয়েছে টালিউডে ‘মানুষ’ সিনেমার মাধ্যমে। কলকাতার দুই শতাধিক প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে সঞ্জয় সমাদ্দার পরিচালিত প্রথম সিনেমা। তার এ সিনেমার পথচলার সঙ্গী হয়েছেন কলকাতার জনপ্রিয় নায়ক জিৎ। সিনেমার বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিদ্যা সিনহা মিম। সিনেমাটি মুক্তির পরই প্রশংসা পাচ্ছেন নির্মাতা।

আরিফিন শুভ

চলতি বছরের প্রথম সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল ‘ব্ল্যাক ওয়ার’। অ্যাকশন অবতারে এ সিনেমায় দেখা মেলে আরিফিন শুভর। সিনেমাটিতে অভিনয়ের জন্য প্রশংসাও পেয়েছিলেন তিনি। তবে শুভ এ বছর আলোচিত হয়েছেন ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’ সিনেমায় অভিনয়ের কারণে। ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা শ্যাম বেনেগাল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও রাজনৈতিক ঘটনাবলি চিত্রিত করে সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন। এ সিনেমায় জাতির পিতার চরিত্রে অভিনয় করে দারুণ সাড়া ফেলেন আরিফিন শুভ।

মাহফুজ আহমেদ

দেশের বিনোদন দুনিয়ার পরিচিত মুখ মাহফুজ আহমেদ। তিন দশকের বেশি সময় ধরে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত আছেন তিনি। বড় পর্দায়ও নজর কেড়েছেন তিনি। তবে অভিনয় থকে দূরে ছিলেন দীর্ঘদিন। চলতি বছর দীর্ঘ বিরতি পর বড় পর্দায় হাজির হয়ে চমক দেন তিনি। চয়নিকা চৌধুরী পরিচালিত ‘প্রহেলিকা’ দিয়ে মাহফুজ আহমেদ নতুন করে দর্শকের মন জয় করেছেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়ায়ও সিনেমাটি বেশ সুনাম অর্জন করেছে। প্রহেলিকায় মাহফুজ আহমেদের চরিত্রের নাম ছিল মনা। রহস্যঘেরা এ চরিত্র নিয়ে মাহফুজ আহমেদ বলেন, ‘মানুষের জীবনটাই রহস্যে ঘেরা। একজন অভিনেতা সবসময় বৈচিত্র্য খোঁজেন। মনা চরিত্রটা আমার কাছে এমনই বৈচিত্র্যময় লেগেছে। মনার রহস্য আমাকে টেনেছে প্রহেলিকায় অভিনয় করার জন্য।’

মোশাররফ করিম

টেলিভিশন, সিনেমা ও ওয়েব মাধ্যম সব ধারায়ই দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেন মোশাররফ করিম। চলতি বছর ‘মহানগর টু’ দিয়ে বরাবরের মতোই সবার মন জয় করেছেন। এছাড়া কলকাতার নির্মাতা ব্রাত্য বসু পরিচালিত গ্যাংস্টার মুভি ‘হুব্বা’ নিয়েও এ বছর আলোচনায় আছেন মোশাররফ করিম। সম্প্রতি সিনেমাটির ট্রেলার প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে হুব্বার বেশে দেখা মিলেছে এ অভিনেতার। আগামী বছর কলকাতায় মুক্তি পাবে সিনেমাটি।

চঞ্চল চৌধুরী

বছরজুড়েই অভিনয়ের চমক দিয়ে আলোচনায় থাকেন চঞ্চল চৌধুরী। ভারতীয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন। আর তাকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করেছেন পশ্চিম বাংলার নির্মাতা সৃজিত মুখার্জি। নাম ‘পদাতিক’। এ সিনেমায় মৃণাল সেনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী। পদাতিকে লুক প্রকাশের পর থেকেই আলোচনায় আছেন এ অভিনেতা। এরই মধ্যে সিনেমাটি লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসব ও কেরালার একটি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে, যেখানে প্রশংসা পেয়েছেন চঞ্চল চৌধুরী। এছাড়া বছরের শেষে রেদওয়ান রনি পরিচালিত সিনেমা ‘দম’-এ চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন এ অভিনেতা। দুই বাংলার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান চরকি, আলফা আই ও এসভিএফ ফিল্মস একত্রে সিনেমাটি নির্মাণ করতে যাচ্ছে।

আফরান নিশো

এ বছরে বড় পর্দায় অভিষেক হয়েছে ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতার আফরান নিশোর। ঈদুল আজহায় মুক্তি পেয়েছিল আফরান নিশো ও তমা মির্জা অভিনীত ‘সুড়ঙ্গ’। প্রথম সিনেমা দিয়েই বাজিমাত করেছেন তিনি। রায়হান রাফী পরিচালিত এ সিনেমা দুই মাসের বেশি সময় প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টেনেছে। বাংলাদেশে ব্লকবাস্টার হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের ১০৮ হলে মুক্তি পায় সুড়ঙ্গ।

হৃদি হক

একসময় টেলিভিশনের পর্দায় নিয়মিত দেখা যেত হৃদি হককে। তবে এ বছর বড় পর্দায় নির্মাতা হিসেবে যাত্রা করেন এ অভিনেত্রী। সিনেমার নাম ‘১৯৭১: সেই সব দিন’। এর মূল ভাবনা প্রয়াত নাট্যব্যক্তিত্ব ড. ইনামুল হকের। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হৃদি হক নির্মাণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রটি। পরিচালনার জন্য ঢাকাই সিনেমার দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছেন হৃদি। সিনেমা পরিচালনা প্রসঙ্গে হৃদি হক বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরেই নির্মাণের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু মাধ্যম আলাদা হওয়ায় এর প্রকাশভঙ্গি আলাদা। আমি অনেকদিন ধরে এ ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িত, কিন্তু ফিল্মের বিষয়টা অনেক বিশাল। তাই এ জায়গায় এসে আমাকে নতুন করে আরো জানতে হয়েছে।’

চলতি বছরের দিকে ফিরে তাকালে তারকা ও নির্মাতার অনেক নতুন সূচনা চোখে পড়ে। এ বছর দেশের দর্শক অনেক নতুন ধারার নির্মাণ দেখার সুযোগ পেয়েছে। নির্মাতা ও অভিনেতারা জানান, আগামী বছর তারা নির্মাণের বৈচিত্র্যের ধারা বজায় রাখবেন।