প্রতীক্ষার অবসান হলো অবশেষে। দ্বাবিংশতিতম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দা উঠল শনিবার। এবারের উৎসবটি ছিল তার ব্যতিক্রম। অনুষ্ঠান শুরুর আগেই মিলনায়তন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। কারণ উৎসবের উদ্বোধক ও প্রধান আকর্ষণ বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর। অবশ্য তাকে একনজর দেখার ও তার কথামালা শোনার আশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকলেও এর আগে সমবেত দর্শককে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত একটি নিতান্তই সাদামাটা, মানহীন নৃত্যানুষ্ঠান হজম করতে হয়েছিল। 

অতঃপর শর্মিলা ঠাকুর তার সুন্দর ও পরিশীলিত সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের পর উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করলে শুরু হয় ইরানি চলচ্চিত্রকার মোরতেজা অতশ জমজম পরিচালিত ও বাংলাদেশের প্রখ্যাত অভিনেত্রী জয়া আহসান অভিনীত উদ্বোধনী ছবি ‘‌ফেরেশতে’। তবে আমরা ইরানি চলচ্চিত্র বলতে সচরাচর যে রকম কাব্যিক, অনাড়ম্বর, রুচিস্নিগ্ধ, সূক্ষ্ম শিল্পরসে সমৃদ্ধ সিনেমার কথা বুঝি, এ চলচ্চিত্র সবদিক থেকেই এর ব্যতিক্রম ছিল। এর গল্প, নির্মিতি ও শিল্পমান কোনো কিছুই ঠিক প্রখ্যাত ও প্রতিষ্ঠিত পরিচালকদের সমতুল্য নয়। তার পরও ঠিক কোন বিবেচনায়, বিশেষ করে এ ছবিকেই, উৎসবের উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে নির্ধারণ করা হলো সেটি আমাদের বোধগম্য হয়নি।

সে যাক, উদ্বোধনী ছবির পর উৎসবের অন্য প্রেক্ষাগৃহ সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ফিলিপিনসের নারী নির্মাতা মান এল আসুনসিয়ন দানালিয়ান পরিচালিত ‘‌ব্লু রুম’ দেখতে যাই। দেখা গেল ছবি শুরু হয়ে গেছে, কিন্তু হল প্রায় খালি। ভালো করে তাকিয়ে দেখি একটা ছোট্ট প্রজেক্টর থেকে ছবিটি দেখানো হচ্ছে বিধায় ছবির ফ্রেম বেশ ছোট এবং শব্দও কমজোরি। কে জানে, হয়তো সেটিই এ ছবির এমন দর্শকহীনতার কারণ। অবশ্য ছবিটিও তেমন আহামরি কিছু ছিল না। এর গল্প আবর্তিত হয় এ সময়ের ফিলিপিনসের শহুরে ও বিত্তশালী পরিবারের তরুণ প্রজন্মের নৈতিক অবক্ষয় ও সংকটকে ঘিরে, যার উপস্থাপনায় তেমন কোনো স্বাতন্ত্র্য কিংবা চালচ্চিত্রিক মুনশিয়ানার ছাপ চোখে পড়েনি।

দ্বিতীয় দিনটা মূলত কাটল ঢাকা ক্লাবের স্যামসন হলে আয়োজিত উইমেন ইন সিনেমা শীর্ষক কনফারেন্সে বসেই। এতে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন কলকাতার প্রখ্যাত চলচ্চিত্র গবেষক ও শিক্ষক ড. ইপ্সিতা সেন বরাট। সেমিনারের বিষয় ছিল Navigating Dual Identities: An Exploration of Intersectionality in Motherhood and Filmmaking. এতে সভাপতিত্ব করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্বাচিত উপাচার্য ড. সাদেকা হালিম চৌধুরী এবং আমার অন্যতম সহ-আলোচক ছিলেন দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক ও জাঁদরেল চলচ্চিত্র সমালোচক, গবেষক ড. সোহিনী ঘোষ। সে সেমিনারের দৌলতে অনেক কিছুই শেখার সুযোগ হয় এ গুণীদের মূল্যবান কথামালা থেকে। ফলে এরপর অনুষ্ঠিত অন্য দুটো সেমিনার শোনারও সিদ্ধান্ত নিই, যার সূত্রে দেশী-বিদেশী আরো অনেক চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ও চিন্তকের কথা শোনার ও তাদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ের সুযোগ হয়। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কলকাতার প্রখ্যাত অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখার্জি। 

উইমেন ইন সিনেমা কনফারেন্সের পরে উৎসবের মূল কেন্দ্র জাতীয় জাদুঘরের বঙ্গমাতা মিলনায়তনে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য ও এর পার্শ্ববর্তী বেগম সুফিয়া কামাল হলে গোটা পাঁচেক স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি দেখার সুযোগ হয়। পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিটি ছিল বাংলাদেশের ইফাত জাহান মম পরিচালিত ‘‌মুনতাসীর’। চলচ্চিত্রের ভাষা ও ব্যাকরণের হিসেবে এতে প্রচুর ঘাটতি থাকলেও বাংলাদেশে ছেলে শিশুদের ওপর যৌন হয়রানির প্রাদুর্ভাব ও তার করুণ পরিণাম নিয়ে নির্মিত এ চলচ্চিত্রে মম যে সাহস ও সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন, তা সত্যি প্রশংসনীয়। স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিগুলোর মধ্যেও ছিল বাংলাদেশের দুই নারী নির্মাতা চৈতালী সমাদ্দার ও আফিফা আকতারের উপস্থিতি। কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের স্নাতক চৈতালীর ‘‌একদিন ভাইরাল নমিতা পাল’ ও ‘‌মুক্তি’ এ দুই ছবিই কিছুটা প্রচারধর্মী হলেও তাতে তার সমাজসচেতনতা, শিল্পবোধ ও চলচ্চিত্র ভাষায় যথেষ্ট মুনশিয়ানার পরিচয় পাওয়া গেছে, এ কথা বলতেই হয়।

উৎসবের তৃতীয় দিনে ছবি দেখা হলো মোট আড়াইখানা, এর মধ্যে প্রথমটাই ছিল সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত। তার কারণ খোদ এর নির্মাতা ও যাকে নিয়ে এ নির্মাণ, দুজনই। প্রথমজন ঠাকুরবাড়ির সন্তান, অক্সফোর্ড-পাস প্রখ্যাত শিল্পসমালোচক ও ঐতিহাসিক সুন্দরম ঠাকুর, যার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল একসময় নিউইয়র্কে, তারই প্রতিষ্ঠিত এক আর্ট গ্যালারিতে। আর দ্বিতীয়জন আমাদের অদ্বিতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি, বিশ্ববিশ্রুত স্থপতি লুই কান। বস্তুত লুই কানের জীবন ও কর্ম এবং সে সূত্রে তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ঢাকার শেরেবাংলা নগরে নির্মিত আমাদের অপরূপ সংসদ ভবনের ইতিহাস ও শৈল্পিক সৌন্দর্যের উপস্থাপনাই ছিল এ Louis Kahn’s Tiger City ছবির প্রধান উপজীব্য। আর সে কাজ সুন্দরম ঠাকুর করেছেন গভীর নিষ্ঠা, অভিনিবেশ, দরদ ও ভালোবাসা মিশিয়ে। লুই কানের জন্মভূমি এস্তোনিয়া থেকে তার দ্বিতীয় স্বদেশ যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ তার স্মৃতিজড়িত মোট চৌদ্দটি দেশের বিস্তৃত পরিসরে চিত্রায়িত এবং দেশী ও বিদেশী অসংখ্য কীর্তিমান স্থপতি, ঐতিহাসিক, গবেষক, চিন্তকের সারগর্ভ সাক্ষাৎকারে সমৃদ্ধ এ অনবদ্য প্রামাণ্যচিত্রটিতে আমাদের পরম গর্বের ধন এ বিশ্বখ্যাত ভবন নির্মাণের পূর্বাপর গল্প, এর অবিসংবাদিত সৌন্দর্য ও তাৎপর্য যেভাবে ফুটে উঠেছে তা এক কথায় তুলনারহিত। 

অন্যটি ছিল একটি চীনা চলচ্চিত্র। উৎসবে এবার প্রথমবারের মতো শুরু হওয়া সাম্প্রতিক চীনা চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ব্যাপক আয়োজন ‘‌ওয়াইড অ্যাঙ্গেল’ বিভাগের উদ্বোধনী ছবি Lhapal Gyal পরিচালিত Great Distance Delivers Crane নামক একটি অসম্ভব হৃদয়স্পর্শী মন ভালো করা ছবি। একটু উষ্ণতার সন্ধানে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসা একটি আহত পরিযায়ী পাখিকে গ্রামের দুই দরিদ্র কিশোর ভাইবোন কর্তৃক পরম মমতা ও শুশ্রূষায় সারিয়ে তোলা এবং বহুদূর দক্ষিণের উষ্ণাঞ্চল উনান প্রদেশে পৌঁছে দেয়ার গল্পের এ ছবি এর গভীর প্রাণবিকতায় দর্শকের হৃদয়কে দ্রবীভূত ও ভালোবাসার উত্তাপে উষ্ণ করে তোলে।

তৃতীয় ও আধখানা দেখা ছবিটির নাম ‘‌ইতি চিত্রা’। এটি রাইসুল ইসলাম অনীক নামক এক বাংলাদেশী তরুণের বানানো বলে বেশ আগ্রহ নিয়েই দেখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু অগভীর ও অবাস্তব একটি গল্প এবং তার ততোধিক দুর্বল চিত্রায়ণ দেখে বেশিক্ষণ তিষ্ঠাতে পারিনি, যদিও এ রকম এফডিসি ঘরানার একটি ফর্মুলা ছবি দেখেই মুহুর্মুহু উল্লাসে ফেটে পড়তে দেখলাম হলভরা তরুণ-তরুণীদের। অথচ কিমাশ্চর্যম, এর আগের দুটো ছবিতে, বিশেষ করে লুই কান ও সংসদ ভবন নিয়ে নির্মিত অনন্যসাধারণ প্রামাণ্যচিত্রটিতে তেমন কোনো দর্শকই ছিল না বলতে গেলে। এ বড় পরিতাপের বিষয় বইকি। আশা করি, উৎসব কর্তৃপক্ষ দর্শক-খরার এ বিষয়ের প্রতি আরেকটু নজর দেবেন।

লেখক: সমালোচক