উৎসবের ষষ্ঠ দিনের তৎপরতা শুরু হয়েছিল সকালেই। ১০টায় ঢাকা অলিয়ঁস ফ্রঁসেজ মিলনায়তনে ছিল কলকাতার অতনু ঘোষের ‘‌শেষ পাতা’র প্রদর্শনী। ফরাসি ভাষা শেখার সূত্রে ৪৫ বছর আগে আমার ফরাসি চলচ্চিত্র দেখার হাতেখড়ি হয়েছিল অলিয়ঁস ফ্রঁসেজে। তাই বহুদিন পর সেই ছোট্ট, সুন্দর, উষ্ণ ও অন্তরঙ্গ হলটিতে বসে স্মৃতিতাড়িত হওয়ার পাশাপাশি এক অন্য রকম ভালো লাগার অনুভূতির আবেশ বোধ করছিলাম।

সে ভালো লাগা আরো বেড়ে গেল পর্দায় ‘‌শেষ পাতা’র প্রথম দৃশ্যটি ভেসে ওঠার পর। এ সময়ের বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী নির্মাতা অতনু ঘোষের পাকা হাতে বানানো এ ছবির গাঁথুনি ও বুনন, সংলাপ ও দৃশ্যায়ন, গল্পের অন্তর্নিহিত বার্তা ও বোধ, সর্বোপরি কুশীলবদের, বিশেষত প্রসেনজিতের অভিনয়ের শক্তি ও সৌন্দর্যে স্নাত। বিশ্বায়ন, পুঁজিবাদ, পণ্যসভ্যতার আগ্রাসনে পিষ্ট ও পীড়িত কলকাতার এক প্রবীণ লেখকের ব্যক্তিগত সংকটের পটভূমিতে সেখানকার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনসংগ্রাম, বিষাদ ও বিচ্ছিন্নতা, আশা ও ভালোবাসা, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের এক মর্মস্পর্শী শিল্পিত প্রতিবেদন অতনুর ‘‌শেষ পাতা’ এ উৎসবে আমার দেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি, বলতে দ্বিধা নেই।

আরো ছিল বাংলাদেশ ও গ্রিসের যৌথ নির্মাণে Angelos Rallis পরিচালিত Mighty Afrin: in the Time of Floods নামক একটি দুঃসাহসিক চলচ্চিত্র। একজন বিদেশীর রোমান্টিক দৃষ্টিতে দেখা বাংলাদেশের বন্যা, দারিদ্র্য, পথশিশু তথা নিম্নবর্গের মানুষের দুর্বিষহ জীবনসংগ্রামের ওপর প্রতিবেদন হলেও পরিচালক ও কুশীলবদের পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টার কোনো ঘাটতি ছিল না তাতে। 

এরপর দেখা হলো দিনের শেষ ছবি। বাংলা চলচ্চিত্রের কালাপাহাড়ি কিংবদন্তি ঋত্বিক ঘটকের জীবনের তুলনামূলক কম জানা, কম আলোচিত কিছু বিষয় ও ঘটনা নিয়ে নির্মিত শুভঙ্কর ভৌমিকের ‘‌অলক্ষ্যে ঋত্বিক’। নির্মিতির দিক থেকে তেমন আহামরি কিছু না হলেও ঋত্বিক ও সে সময়কার বাংলা চলচ্চিত্রের দিকপাল, যেমন বিমল রায়, সত্যজিৎ রায়, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, সলিল চৌধুরী, হৃষিকেশ মুখার্জি, বাসু ভট্টাচার্যদের জীবনের গল্প হওয়ায় এবং বিশেষত ঋত্বিক চলচ্চিত্রে রূপদানকারী শিলাজিৎ মজুমদারের শক্তিশালী অভিনয়ের গুণে মোটামুটি উপভোগ্যই ছিল। 

সপ্তম দিনের চলচ্চিত্র দর্শনের সূত্রপাত ‘‌চালচিত্র এখন’ দেখার মধ্য দিয়ে। চালচিত্র মৃণাল সেনের ১৯৮১ সালে নির্মিত চলচ্চিত্র, যার মধ্য দিয়ে আজকের সুখ্যাত সংগীতশিল্পী, অভিনেতা ও পরিচালক অঞ্জন দত্তের চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। ৪২ বছর বাদে আজ সে ছবিরই একপ্রকার পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে অঞ্জন তার চলচ্চিত্র-শিক্ষক ও বান্ধব মৃণাল সেনের প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও মুগ্ধতার প্রকাশ ঘটান। মৃণাল সেনের চরিত্র তিনিই রূপদান করেন এবং নাম নেন কুনাল সেন, যা কিনা আবার খোদ মৃণাল-তনয়েরই নাম, যে তার বাবাকে সম্বোধন করত বন্ধু বলে। এর মাধ্যমে অঞ্জন দত্ত সুকৌশলে এটাই বুঝি আমাদের জানিয়ে দিতে চান যে মৃণালের সঙ্গে তার সম্পর্কটাও একাধারে পিতা-পুত্র ও প্রিয় বন্ধুর মতো।

এর পরের ছবিটিও ছিল আমার কাছে সমান আকাঙ্ক্ষিত। ছবিটির নাম ‘‌নোনা পানি’। খুলনার মেয়ে নিগার ১০ বছরের সাধনায় নির্মিত ছবির প্রধান উপজীব্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন খুলনারই উপকূলবর্তী প্রান্তিক মানুষজন ও তাদের জীবনের গল্পকে, যার অনেকটুকু জুড়ে থাকে সাগরের লবণাক্ত পানির প্রকোপে সৃষ্ট বিবিধ সামাজিক, অর্থনৈতিক সংকটের অভিঘাত ও অশ্রুর আখ্যান।

আইলা নামক বিধ্বংসী ঝড়, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ ভৌগোলিক প্রভাব, চিংড়ি ঘেরের আগ্রাসনে কৃষিজমির বিনাশ ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত হয় স্থানীয় যাত্রাদলের অস্তিত্বের সংকট, ধর্মের অনুপ্রবেশ ও অনাচার, ভাগ্যান্বেষণে শ্রমজীবী নারীদের মুম্বাই গমন, স্থানীয় এক তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যের মনো-দৈহিক যন্ত্রণার অভিক্ষেপ। নিগার বানুর নিটোল চিত্রনাট্য ও সুদক্ষ নির্দেশনা, কুশলী দৃশ্যায়ন, বুদ্ধিদীপ্ত সম্পাদনা, সুপ্রযুক্ত সংগীত ও নিয়ন্ত্রিত অভিনয়ের জোরে ‘‌নোনা পানি’ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রের মানচিত্রে আরেকটি শক্তিমান মাইলফলক। 

লেখক: সমালোচক