ফ্রান্সের সমুদ্রতীরবর্তী শহর কানে আয়োজিত বিশ্বের তারকা নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের এ মিলনমেলা। এর পর্দা নামছে আজ। বিভিন্ন কারণে এবারো আসর বেশ আলোচিত। তবে এবার শুধু সিনেমার জন্য নয়, রাজনৈতিক বক্তব্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিতর্ক এবং বিশ্ব চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ৭৯তম এ উৎসবে বিভিন্ন দেশের নির্মাতারা যেমন নতুন চলচ্চিত্র নিয়ে হাজির হন, তেমনি শিল্পীরা নিজেদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। লালগালিচার ঝলকানির বাইরে তাই এবারের কান হয়ে ওঠে সমসাময়িক বিশ্ব বাস্তবতারও এক প্রতিচ্ছবি।

আলোচনায় নতুন চলচ্চিত্র এবং স্ট্যান্ডিং ওভেশন

এবারের কানে বেশ কয়েকটি সিনেমা দীর্ঘ স্ট্যান্ডিং ওভেশন পেয়ে আলোচনায় এসেছে। স্ট্যান্ডিং ওভেশন হলো দর্শকরা নিজেদের আসন থেকে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে কোনো শিল্পী, সিনেমা, অভিনয় বা পরিবেশনাকে সম্মান জানানো। এটি সাধারণ করতালির চেয়ে অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ প্রতিক্রিয়া হিসেবে ধরা হয়।

এবারের কান চলচ্চিত্র উৎসবে কয়েকটি সিনেমা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে করতালির সম্মান পেয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে জাপানি নির্মাতা রিউসুকে হামাগুচির চলচ্চিত্র ‘অল অব আ সাডেন’। সিনেমাটি প্রদর্শনের পর প্রায় ৯-১১ মিনিট পর্যন্ত দর্শকরা দাঁড়িয়ে করতালি দেন। এটিকে এবারের উৎসবের সবচেয়ে দীর্ঘ স্ট্যান্ডিং ওভেশন পাওয়া চলচ্চিত্রগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।স্প্যানিশ নির্মাতা রদ্রিগো সোরোগোয়েনের ছবি ‘দ্য বিলাভড’ও ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। অভিনেতা হাভিয়ের বারদেম অভিনীত এ সিনেমা প্রায় ৭ মিনিট দাঁড়িয়ে অভিবাদন পায়।

পরিচালক জেমস গ্রের ‘পেপার টাইগার’ও দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। অ্যাডাম ড্রাইভার ও মাইলস টেলারের অভিনয়ে নির্মিত এ সিনেমা প্রদর্শনের পর ৭ মিনিটের বেশি সময় ধরে করতালি চলে।

পাওয়েল পাওলিকোভস্কির চলচ্চিত্র ‘ফাদারল্যান্ড’ পেয়েছে প্রায় ৬ মিনিটের স্ট্যান্ডিং ওভেশন। অন্যদিকে জেন শোনব্রুন পরিচালিত ‘টিনএজ সেক্স অ্যান্ড ডেথ অ্যাট ক্যাম্প মিয়াসমা’ মিনেমাটিও ৬-৯ মিনিট পর্যন্ত দর্শকদের দাঁড়িয়ে অভিবাদন পেয়েছে।

এছাড়া আলঝেইমার রোগকে কেন্দ্র করে নির্মিত অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র ‘ট্যাংগেলস’ও দর্শকদের আবেগাপ্লুত করেছে। সেথ রোগেনের এই সিনেমা প্রায় ৭ মিনিটের স্ট্যান্ডিং ওভেশন পেয়েছে।

পুরনো ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্রের বিশেষ প্রদর্শনীতেও এবারের কানে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। গিয়ের্মো দেল তোরোর বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘প্যানস ল্যাবিরিন্থ’-এর বিশেষ প্রদর্শনীতে দর্শকদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে প্রথমবার কানে প্রদর্শিত হওয়ার সময় সিনেমাটি ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ, ২২ মিনিটের স্ট্যান্ডিং ওভেশন পেয়েছিল।

এআই নিয়ে সেথ রোগেনের কড়া অবস্থান

এবারের কানের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল সেথ রোগেনের বক্তব্য। হলিউডের জনপ্রিয় এ অভিনেতা, নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘এআই দিয়ে চিত্রনাট্য লিখলে আপনি লেখক নন।’ ব্রুটকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, যারা সৃজনশীলতার জায়গায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করেন, তারা প্রকৃত শিল্পচর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।

রোগেনের ভাষায়, লেখালেখির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দীর্ঘ সময় ধরে চিন্তা, অনুভব ও সৃজনশীল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া। প্রযুক্তি যদি সেই জায়গাটিকে প্রতিস্থাপন করে, তাহলে শিল্পের মৌলিকত্ব নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। অবশ্য লেখক ও অভিনয়শিল্পীদের সংগঠনগুলোও এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

এবার কানে রোগেন এসেছেন তার নতুন অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র ট্যাংগেলসের প্রচারণায়। আলঝেইমার আক্রান্ত এক মাকে ঘিরে নির্মিত আবেগঘন এ সিনেমা সম্পূর্ণ হাতে আঁকা অ্যানিমেশন দিয়ে তৈরি। রোগেন বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, সিনেমাটির প্রতিটি ফ্রেমে মানুষের শ্রম ও অনুভূতির ছাপ রয়েছে।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে সরব হান্নাহ আইনবাইন্ডার

এবারের কান উৎসবে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় এসেছেন তরুণ অভিনেত্রী হান্নাহ আইনবাইন্ডার। জনপ্রিয় সিরিজ হ্যাকসের এ অভিনেত্রী কানে আয়োজিত ‘কেরিং উইমেন ইন মোশন টকস’ পর্বে অংশ নিয়ে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘চুপ থাকার মূল্য আরো বেশি।’ ক্যারিয়ারের ঝুঁকি থাকলেও মানবাধিকারের প্রশ্নে কথা বলে যাবেন বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনপন্থী শিল্পীদের প্রতিও সমর্থন জানান। এছাড়া উৎসবের বিভিন্ন প্রদর্শনী ও সংবাদ সম্মেলনেও গাজা যুদ্ধ এবং বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কয়েকজন নির্মাতা তাদের চলচ্চিত্র উৎসর্গ করেছেন যুদ্ধাহত শিশু ও শরণার্থীদের প্রতি। ফলে এবারের কান শুধু বিনোদনের উৎসব নয়, বরং মানবিক অবস্থানেরও এক শক্তিশালী প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

‘শর্ট ফিল্ম কর্নার’-এ বাংলাদেশের ‘নুড়ি’

8

কান চলচ্চিত্র উৎসব’-এ জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘নুড়ি’। মিথুন জামানের রচনা ও পরিচালনায় নির্মিত ১৬ মিনিটের চলচ্চিত্রটি উৎসবের ‘শর্ট ফিল্ম কর্নার সিনেমা দ্য দোমাঁ’ বিভাগের মার্কেট ক্যাটালগে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ‘নুড়ি’র পটভূমি বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। চলচ্চিত্রটিতে তুলে ধরা হয়েছে ১১ বছর বয়সী এক কিশোরীর গল্প, যে একটি সদ্যোজাত ঘোড়ার বাচ্চার সঙ্গে অপ্রত্যাশিত বন্ধনের মধ্য দিয়ে খুঁজে পায় সাহস ও বেঁচে থাকার নতুন আশা।

এবারের কান উৎসব আবারো প্রমাণ করেছে—এটি শুধু চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মঞ্চ নয়; বরং বিশ্ব সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও মানবিক প্রশ্নেরও এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্লাটফর্ম।