কলকাতার হলগুলোয় তখন এসি ছিল না। সিনেমা চলার সময় ফ্যান ঘোরার শব্দের কারণে সাউন্ড-ট্র্যাকের মাধুর্য হারানোর অভিযোগে সত্যজিত রায় কলকাতায় মুক্তি দেননি তার নির্মিত অন্যতম চলচ্চিত্র ‘গণশত্রু’কে। ১৯৮৯ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে মুক্তি দিয়েছিলেন এ চলচ্চিত্র। নিজের শিল্পকর্মের সঙ্গে আপস না করার এ মনোভাবের কারণেই হয়তো শেষ পর্যন্ত সেলুলয়েডে দেখা যায়নি সত্যজিতের সায়েন্স ফিকশন প্রজেক্ট ‘দ্য এলিয়েন’।

বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে সত্যজিৎ রায় মানেই মগ্ন, মানবিক ও চিন্তাশীল নির্মাতা। তার চোখ দিয়ে আমরা দেখেছি বাংলার গরিব মানুষের জীবন, নিঃসঙ্গ নারীর মন, শহরের কোলাহল আর গ্রামীণ নির্জনতার চিত্র। কিন্তু অনেকেই জানেন না—এ মহান পরিচালক এক সময় তৈরি করেছিলেন এক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীভিত্তিক সিনেমার স্ক্রিপ্ট, যার নাম ছিল দ্য এলিয়েন। দুর্ভাগ্যবশত, এ ছবি কখনো তৈরি হয়নি। তবে এর ছায়া দেখা গেছে হলিউডের সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলোর একটিতে।

সত্যজিতের বিজ্ঞানপ্রেম জন্ম নিয়েছিল পারিবারিক পরিবেশ থেকেই। তার ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর ও বাবা সুকুমার রায় ছিলেন লেখক ও চিত্রকর, আবার একই সঙ্গে বিজ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহী। সত্যজিতের নিজের ছবিতেও বিজ্ঞানের প্রতি তার গভীর আকর্ষণের ছাপ স্পষ্ট—‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রের সে বিখ্যাত দৃশ্য, যেখানে গ্রামের ছেলে অপু প্রথমবার শুনছে টেলিগ্রাফ তারের হালকা গুঞ্জন—তারপর ধূসর ধোঁয়া ছড়ানো এক রেলগাড়ির আবির্ভাব, যেন অজানাকে জানতে পারার এক বৈজ্ঞানিক শিহরণ! কিংবা তার শেষ ছবি ‘আগন্তুক’ (১৯৯১)-এ প্রত্নতত্ত্ববিদ চরিত্র একটি প্রশ্ন করে তার ছোট নাতিকে, ‘সূর্য ও চাঁদ আকাশে কেন একই আকারের মনে হয়? কেন পৃথিবী ঠিক এমন মাপের, যা সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ সম্ভব করে?’ আবার উত্তর না পেয়ে তিনি বলেন, ‘আমি বলি, এটা মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটা। রাজা সূর্য, রানি চাঁদ আর পৃথিবীর ছায়া—তিনটেই সমান মাপের। জাদু!’"

বিজ্ঞানের প্রতি অসীম আগ্রহ থেকেই জন্ম নিয়েছিল সত্যজিতের কল্পবিজ্ঞানচিত্র দ্য এলিয়েন। এ ছবির মূল চরিত্র একটি ছোট হিউম্যানয়েড এলিয়েন, যার মহাকাশযান ভেঙে পড়ে বাংলার এক গ্রামের পুকুরে। গ্রামের মানুষ সেটিকে ডুবে যাওয়া মন্দির ভেবে পূজা শুরু করে। কিন্তু বুদ্ধিমান ছেলে ‘হাবা’ আর এক কৌতূহলী সাংবাদিক ‘মোহন’ আসল সত্য কী, তা খুঁজতে ও জানতে চায়।

গল্পকে সাবলীল রাখতে এতে এলিয়েনের চরিত্র ছিল বেশ হালকা। সে নানা দুষ্টুমি করে, হালকা মনে হাসি-ঠাট্টা করে। গ্রামে ঘটায় নানা অদ্ভুত ঘটনা—ভুট্টা পেকে ওঠে এক রাতে, মরা লোক চোখ মেলে তাকায়, আমগাছে ফল ধরে অসময়ে। সত্যজিতের এ গল্প ছিল একাধারে কল্পনাপ্রসূত, আবার মাটির কাছাকাছি।

সে সময়েই সত্যজিৎ যোগাযোগ করেন বিখ্যাত বিজ্ঞানকল্প লেখক আর্থার সি. ক্লার্কের সঙ্গে। বিজ্ঞানমনস্ক লেখক হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি ছিল ক্লার্কের। সত্যজিতের গল্প পড়ে মুগ্ধ হন তিনি। তারপর এ প্রজেক্টে যুক্ত করেন চলচ্চিত্র নির্মাতা মাইক উইলসনকে। মাইক এটিকে হলিউডে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নেন।

সে সময় সত্যজিৎ পরামর্শ দিয়েছিলেন চলচ্চিত্রটিতে যেন ব্রিটিশ অভিনেতা পিটার সেলার্স অভিনয় করেন। সেলার্স ছিলেন স্ট্যানলি কুবরিক পরিচালিত ‘ড. স্ট্রেঞ্জলাভ’ ছবির বিখ্যাত অভিনেতা। সেলার্স কিন্তু রাজিও হন। এমনকি কলাম্বিয়া পিকচারস নামে একটি বড় হলিউড স্টুডিও চলচ্চিত্রটি বানানোর আগ্রহও দেখায়।

তবে সমস্যা বেঁধেছিল তখন যখন দুর্ভাগ্যক্রমে স্ক্রিপ্টটি হলিউডে মাইক উইলসনের নামে ছড়িয়ে পড়ে। তখন ‘রায় দ্য গ্রেট’ বুঝতে পারেন, এ প্রজেক্ট নিয়ে আর এগোনো সম্ভব নয়।

সত্যজিতের স্ক্রিপ্ট ভালোই প্রভাব বিস্তার করেছিল হলিউডে। এর প্রমাণ পাওয়া যে স্ক্রিপ্ট হলিউডে পৌঁছানোর কিছু বছর পরই ১৯৮২ সালে স্টিভেন স্পিলবার্গ নির্মাণ করেন তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘ই.টি. দি এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল’। এর মূল চরিত্র ছিল এক ছোট দয়ালু এলিয়েন, যে এক শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে, অনেকটা রায়ের হাবা ও এলিয়েনের সম্পর্কের মতো। স্পিলবার্গ তখন তরুণ, প্রতিভাবান পরিচালক। আজ তিনি বিশ্বখ্যাত, ‘জুরাসিক পার্ক’, ‘শিন্ডলার্স লিস্ট’, ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’-এর মতো ছবির নির্মাতা।

হতেও পারে সত্যজিতের গল্পের সঙ্গে স্পিলবার্গের গল্প প্রায় মিলে যাওয়ার ঘটনা নিতান্তই কাকতালীয়। তবে সে সময় আর্থার সি. ক্লার্ক নিজে ফোন করে রায়কে বলেছিলেন, ‘এটা নিছক কাকতালীয় নয়, স্পিলবার্গ তোমার স্ক্রিপ্ট দেখেছিল।’ এমনকি কিংবদন্তি পরিচালক মার্টিন স্করসেসি প্রকাশ্যে স্বীকার করেন, স্পিলবার্গের ই.টি. ছিল সত্যজিৎ রায়ের দ্য এলিয়েন থেকে প্রভাবিত।

সত্যজিৎ অবশ্য এ বিষয়ে কখনো কোনো অভিযোগ তোলেননি। বরং ক্লার্কের কথার উত্তরে বলেছিলেন, ‘শিল্পীদের আরো কাজ আছে। এসব নিয়ে সময় নষ্ট করার ইচ্ছা নেই।’

দ্য এলিয়েন কখনো পর্দায় ধরা না পড়লেও এটি তার সৃজনশীলতা, দূরদৃষ্টি ও বৈজ্ঞানিক কল্পনায় মাটির গন্ধ মেশানোর অসাধারণ ক্ষমতার সাক্ষ্য বহন করে। এ গল্প শুধু একটি অনানুষ্ঠানিকভাবে হারিয়ে যাওয়া চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে এক বিস্ময়কর কিংবদন্তি। দ্য এলিয়েনের আড়ালে রয়ে গেছে এক অবিস্মরণীয় সম্ভাবনা, যেখানে বাংলার মাটি, গ্রামীণ বাস্তবতা ও মহাজাগতিক কল্পনা একত্রে মিশে গড়ে তুলতে পারত বিশ্বমানের এক চলচ্চিত্র।

তথ্যসূত্র: দ্য ইউনিক ইউনিভার্স অব সত্যজিত রায়, এন্ড্রু রবিনসন, ফিজিক্স ওয়ার্ল্ড।