এখনো মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনে চলমান, বিশ্বজুড়ে বাড়ছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। চলচ্চিত্রে যুদ্ধ প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে আসে বারবার। চলচ্চিত্রের গল্পে থাকে যুদ্ধ। সেসব সিনেমা বাজারে ভালো আয় করে বা পায় কাল্ট ক্ল্যাসিকের তকমা। কিন্তু যুদ্ধ ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে ক্ষতিগ্রস্তও হয় সিনেমা। এ সময় চলচ্চিত্র উৎসবগুলো যুদ্ধ ও তার রাজনৈতিক সংকট নিয়ে বিব্রত সময় পার করছে।

ফেব্রুয়ারিতে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি সভাপতি ভিম ভেন্ডার্স সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে প্রশ্নের মুখে বলেছিলেন, চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ‘রাজনীতির বাইরে থাকা’ উচিত। তার এ মন্তব্যের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। লেখক অরুন্ধতী রায় ক্ষোভে উৎসব থেকে সরে দাঁড়ান। পরিস্থিতি সামাল দিতে বার্লিনের শিল্পনির্দেশক ত্রিশিয়া টাটলকে শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিতে হয়।

কানে পরিস্থিতিও ছিল উত্তপ্ত। চলচ্চিত্রজগতের হাজারো পেশাজীবী একটি পিটিশনে স্বাক্ষর করেন। এতে পে-টিভি প্রতিষ্ঠান ক্যানাল প্লাস ও ফ্রান্সের চলচ্চিত্রে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি স্টুডিও ক্যানালের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিক ডানপন্থী ধনকুবের ভিনসেন্ট বলোরের ক্রমবর্ধমান আদর্শিক প্রভাবের সমালোচনা করা হয়। পিটিশনে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন অভিনেতা জাভিয়ের বারদেম, মার্ক রাফালো ও নির্মাতা কেন লোচ। এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে নির্মিত সিনেমার ক্রেডিটে প্রতিষ্ঠানের নাম উঠলে দর্শক প্রতিবাদ করেছিলেন। তারও আগে ২০২৪ সালে কানের রেড কার্পেটে পোশাকের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের পতাকা তুলে ধরেছিলেন কেট ব্ল্যানচেট।

এ মুহূর্তে প্রশ্ন উঠছে বার্লিন ও কান যখন রাজনীতি নিয়ে উত্তাল, তখন ভেনিসে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে?

রাশিয়া ও ইসরায়েলকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হওয়ার আগেই লিডোতে পৌঁছে গেছে। এপ্রিলে ভেনিস বিয়েনালে শিল্প প্রদর্শনীতে রাশিয়া ও ইসরায়েলকে নিজ নিজ প্যাভিলিয়নে প্রদর্শনী আয়োজনের সুযোগ দেয়ায় সমালোচনার মুখে পড়ে।

Untitled-2

ইসরায়েলি পরিচালক আমোস জিগাইয়ের ‘রোড টু জেরিকো’ প্রদর্শিত হবে ভেনিসে

চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমা রাখার ক্ষেত্রে রাজনীতির তুলনায় সিনেমার মানকেই গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের শিল্পনির্দেশক আলবের্তো বারবেরাও বলেন, ‘রাশিয়া থেকে যদি আমরা একটি ভালো ছবি পেতাম, তাহলে আমাদের একমাত্র বিবেচনার বিষয় হতো ছবিটির মান।’

২৩ জুলাই উৎসবের লাইনআপ ঘোষণা করার সময় বারবেরা বলেন, ‘এ বছরের নির্বাচন সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে প্রতিফলিত করে—অবশ্যই যুদ্ধ, ফিলিস্তিন, অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান সামাজিক উত্তেজনা এবং বিভিন্ন শাসকের বিরোধীদের জন্য স্বাধীনতার পরিসর সংকুচিত হয়ে আসা।’

ভেনিস উৎসব উদ্বোধন হবে ড্যানি বয়েলের ‘ইঙ্ক’ ছবিটি দেখিয়েছে কীভাবে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ‘দ্য সান’ রুপার্ট মারডকের ডানপন্থী মিডিয়া সাম্রাজ্য গড়ে ওঠার পথ সুগম করেছিল। উৎসবে অ্যালেক্স গিবনির তথ্যচিত্র ‘মাস্ক’ও প্রদর্শিত হবে। ইলোন মাস্কের প্রকাশ্য পরিচয়ের আড়ালে থাকা নানা দিক নিয়ে গভীর অনুসন্ধান চালানো এ ছবি এমন একগুচ্ছ চলচ্চিত্রের অন্যতম, যেগুলো লিডোতে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিতর্ক উসকে দিতে পারে।

এছাড়া রয়েছে ইরানি নির্মাতা আলি আসগারির ‘আ বিট অব লাইট’। তেহরানে গ্রেফতার হওয়া এক ভিন্নমতাবলম্বী চিকিৎসককে কেন্দ্র করে নির্মাণ হয়েছে ছবিটি। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি নির্মাতা আহমেদ হাসুনার ‘সিটিজেন ওসমান’ একজন আলোকচিত্রীকে নিয়ে। চরিত্রটি গাজার যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরার পাশাপাশি বাবা ও সাংবাদিক দুই ভূমিকাই সামলানোর চেষ্টা করেন।

ভেনিসের বেশ কয়েকটি ছবিতে উঠে আসবে রাশিয়ার গভীর সংকট। এর মধ্যে জুলিয়া লোকতেভের ‘মাই আনডিজায়রেবল ফ্রেন্ডস: পার্ট টু—এক্সাইল’ স্বাধীন রুশ সাংবাদিকদের অনুসরণ করেছে, যারা প্রায় ১৩টি দেশে নির্বাসিত জীবন কাটানোর বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়কার যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংকট উঠে এসেছে লরা পোইট্রাসের স্বল্পদৈর্ঘ্য তথ্যচিত্র ‘দেয়ার হিয়ার’-এ।

চলচ্চিত্র উৎসবের পরিসরে ইসরায়েলও বিতর্কিত একটি বিষয় হয়ে রয়েছে। ইসরায়েলি নির্মাতা আমোস গিতাই দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের দুই দিক নিয়ে কাজ করে আসছেন। তিনি ভেনিসে অন্তর্ভুক্ত হতে পেরে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

অবশ্য অধিকাংশ উৎসবের মতো ভেনিসেও প্রদর্শিত হতে যাওয়া অধিকাংশ চলচ্চিত্র সরাসরি রাজনীতি নিয়ে নয়। তবু সেসব ছবির ক্ষেত্রেও আশঙ্কা রয়েছে যে রাজনীতি ছবিকে ছাপিয়ে যেতে পারে। কেট ব্ল্যানচেটের পোশাকে ‘পতাকা তুলে ধরা’র পর চলচ্চিত্র উৎসবের রেড কার্পেটে পোশাকের বিষয়ে নতুন নিয়ম নিয়ে আসে একাধিক চলচ্চিত্র উৎসব। তার পরও রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া কমেনি। বৃহত্তর বা মানুষের স্বার্থেই প্রতিবাদ ও বিবৃতি দেয়া হলেও চলচ্চিত্র উৎসবে চলচ্চিত্রের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে যুদ্ধ ও রাজনীতি।