তবে এবার থালাপতি নয়, শপথ নিলেন চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয়। কারণ নিয়ম অনুযায়ী খেতাবি নাম নয়, প্রকৃত নামে নিজ কর্তব্য পালনের শপথ নিতে হয়। বিজয়ও সেটাই করেছেন।
দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকাদের একজন বিজয়। তিনি কোটি ভক্তের কাছে শুধু একজন নায়ক নন, বরং একটি আবেগের নাম। অভিনয় জীবনের সাফল্যের পর এবার তিনি রাজনীতির মঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এবার তার লক্ষ্য জনগণের প্রতিনিধি ও মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সফল হওয়া। এজন্য শপথ গ্রহণকালে তিনি তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার বা ভিশন তুলে ধরেছেন।
বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। ‘তামিলাগা ভেট্রি কায়াগাম (টিভিকে)’ নামে দল গঠনের মাধ্যমে। অর্থ তামিলনাড়ু বিজয় পার্টি। দলের নামের মধ্যেই তার লক্ষ্য স্পষ্ট—তামিলনাড়ুর মানুষের জন্য ‘জয়’ বা সাফল্য অর্জন করা। রাজনৈতিক দল ঘোষণার সময় তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, সিনেমার মতোই বাস্তব জীবনেও তিনি পরিবর্তনের অংশ হতে চান, যেখানে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে তার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়াকালে প্রদত্ত বক্তৃতায় সেই ভিশনের প্রতিফলন দেখা গেছে।
গতকাল চেন্নাইয়ের জওয়াহেরলাল নেহরু ইনডোর স্টেডিয়ামে আয়োজিত শপথ অনুষ্ঠানে বিজয় জানান, তিনি জনগণকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেবেন না এবং ‘প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক ন্যায়ের নতুন যুগ’ গড়ে তুলতে কাজ করবেন। একই সঙ্গে তার সরকারের কাজ মূল্যায়নের জন্য জনগণের কাছে যুক্তিসংগত সময়ও চান তিনি।
বিজয় বলেন, ‘আমাকে ছাড়া আর কোনো ক্ষমতার কেন্দ্র থাকবে না। আমিই একমাত্র ক্ষমতার কেন্দ্র হব।’ তার এ বক্তব্যকে জোটসঙ্গীদের চাপমুক্ত থেকে রাজ্য সরকার পরিচালনার বার্তা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ভাষণে বিজয় জানান, স্বচ্ছতার স্বার্থে তিনি রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের কথা বিবেচনা করছেন। তিনি বলেন, ‘তামিলনাড়ু সরকারের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাজ্যের মোট ঋণ ১০ লাখ কোটি রুপির বেশি হয়ে গেছে। সরকারি কোষাগার প্রায় খালি করে ফেলা হয়েছে এবং অসহনীয় বোঝা রেখে যাওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেই আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। কিছুদিনের মধ্যে প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে। সবকিছু মূল্যায়নের পর আমরা একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করব। আমি স্বচ্ছ সরকার পরিচালনা করতে চাই, জনগণকে প্রকৃত অবস্থা জানাতে চাই এবং সেখান থেকেই এগোতে চাই। সেটাই হবে আমার প্রথম দায়িত্ব।’
প্রথম ভাষণে বিজয় বলেন, ‘আজ আপনারাই সেই কারণ, যার জন্য আমি বলতে পারছি “আমি সি জোসেফ বিজয়”। আমি কোনো ত্রাণকর্তা নই। আমি একজন সাধারণ মানুষ, যিনি সাধারণ জীবনযাপন করেন।’
তিনি বলেন, ‘আমি মানুষকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা করব না। যা সম্ভব, শুধু সেটাই করব। অনেকেই ভাবতে পারেন এখানে কোনো কাজ অসম্ভব মনে হওয়া ঠিক কিনা। কিন্তু কোটি কোটি মানুষ যখন আমার পাশে দাঁড়ায়, তখন আমি বিশ্বাস করি সবকিছুই সম্ভব। সেই আত্মবিশ্বাস আমার আছে।’
নিজের পারিবারিক পটভূমির কথা তুলে ধরে বিজয় জানান, একজন সহকারী পরিচালকের ছেলে হিসেবে তিনি সিনেমায় সফল হতে কঠোর সংগ্রাম করেছেন। তাই দারিদ্র্য আর ক্ষুধার অর্থ খুব ভালোভাবেই তার জানা আছে। তিনি কোনো রাজপরিবার থেকে আসেননি।
তিনি আরো বলেন, ‘আমি আপনাদের পরিবারেরই একজন। আপনারাও আমাকে সেভাবেই দেখেছেন বলেই সিনেমায় এত বড় জায়গা দিয়েছেন। সবকিছু ছেড়ে আমি রাজনীতিতে এসেছি আপনাদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধ করতে। আর আপনারা আমাকে ভালোবাসা দিয়ে গ্রহণ করেছেন।’
তামিলনাড়ুর জনগণকে ‘নতুন শাসন ব্যবস্থা ও নতুন সূচনার’ জন্য এক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিজয় বলেন, ‘আজ থেকে ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক ন্যায়ের নতুন যুগ শুরু হলো।’
এ সময় মঞ্চে উপস্থিত জোটসঙ্গী নেতাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বিজয়। তিনি কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, কে সি ভেনুগোপালসহ অন্য নেতাদের ধন্যবাদ জানান।
এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিজয়কে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কেন্দ্রীয় সরকার তামিলনাড়ুর নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন মোদি।
উল্লেখ্য, ১৯৭৪ সালের ২২ জুন চেন্নাইয়ে বিজয়ের জন্ম। চলচ্চিত্র নির্মাতা এসএ চন্দ্রশেখর এবং প্লেব্যাক শিল্পী শোবা চন্দ্রশেখরের সন্তান হওয়ায় ছোটবেলাতেই চলচ্চিত্র জগতে তার প্রবেশ ঘটে। নব্বইয়ের শেষভাগ ও ২০০০-এর শুরুর দিকে ‘লাভ টুডে’, ‘থুল্লাধা মানামুম থুল্লুম’, ‘কুশি’ ও ‘ঘিল্লি’—সিনেমাগুলো তার ক্যারিয়ারে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। রোম্যান্স, ড্রামা কিংবা অ্যাকশন সব ধরনের চরিত্রে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেন। এ সময় ‘ইলায়া থালাপতি’ (তরুণ নেতা) হিসেবে পরিচিতি পান। ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনই এ দলের প্রথম বড় পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় দারুণ চমক দেখান তিনি।
সূত্র: এনডিটিভি










