দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, কিংবদন্তি অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান। ইচ্ছা ছিল লেখক হওয়ার। কিন্তু লেখালেখির পথে হাঁটতে গিয়েই ঘটনাক্রমে অভিনয়ে জড়িয়ে পড়েন। সেখান থেকেই শুরু। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময়ে অভিনয়ের জগৎ তাকে দিয়েছে খ্যাতি, জনপ্রিয়তা আর ভালোবাসার অফুরন্ত ভাণ্ডার।
১৯৪১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর দৌলতপুরে নানাবাড়িতে জন্ম নেন আবু তাহের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান। বেঁচে থাকলে আজ ৮৪ বছরে পদার্পণ করতেন তিনি।
প্রায় ছয় দশকের ক্যারিয়ারে তিনি দর্শকদের কখনো হাসিয়েছেন, কখনো কাঁদিয়েছেন, আবার কখনো ভিলেন হয়ে ভয় ধরিয়েছেন। ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন অসামান্য দক্ষতা।
শুরুটা লেখালেখি দিয়ে
এ টি এম শামসুজ্জামানের শুরুটা হয়েছিল চিত্রনাট্যকার হিসেবে। ১৯৬১ সালে উদয়ন চৌধুরীর বিষকন্যা সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। প্রথম চিত্রনাট্যকার হিসেবে অভিষেক ঘটে জলছবি চলচ্চিত্রে। এরপর একে একে শতাধিক চিত্রনাট্য ও কাহিনী লিখেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— জলছবি, জীবন তৃষ্ণা, স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা, যে আগুনে পুড়ি, মাটির ঘর, মাটির কসম, চিৎকার ও লাল কাজল।
ভিলেন থেকে নায়কোচিত জনপ্রিয়তা
লেখালেখির পাশাপাশি অভিনয়েও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। ১৯৭৬ সালে আমজাদ হোসেনের নয়নমণি সিনেমায় খলনায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। এরপর সিনেমার পাশাপাশি একে একে অসংখ্য খণ্ড নাটক ও ধারাবাহিকেও অভিনয় করেছেন।
বহুমুখী প্রতিভা
এ টি এম শামসুজ্জামান ছিলেন একজন বহুমাত্রিক শিল্পী। কৌতুকাভিনেতা, খলনায়ক কিংবা সহ-অভিনেতা— সব ভূমিকাতেই তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। তার অনন্য কণ্ঠস্বর ও সংলাপ বলার ভঙ্গি দর্শকদের মুগ্ধ করেছে প্রতিবার।
শুধু অভিনয় নয়, উপস্থাপক হিসেবেও তাকে দেখা গেছে। বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় তার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দর্শককে টেনেছে টিভির পর্দায়। পরিচালনার ক্ষেত্রেও নিজের ছাপ রেখেছেন তিনি। একমাত্র পরিচালিত চলচ্চিত্র এবাদত তার সৃজনশীলতার দৃষ্টান্ত। শিল্পের সব শাখায় পদচারণা তাকে পরিণত করেছে পূর্ণাঙ্গ শিল্পীতে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
অভিনয় জীবনে পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন এ টি এম শামসুজ্জামান। কাজী হায়াতের 'দায়ী কে' সিনেমার জন্য দুটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পান তিনি। এছাড়া চুড়িওয়ালা, মন বসে না পড়ার টেবিলে এবং চোরাবালি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ২০১৫ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক-এ ভূষিত হন তিনি।
শেষ প্রস্থান
বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সূত্রাপুরের দেবেন্দ্রনাথ দাস লেনে নিজ বাসায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এ টি এম শামসুজ্জামান। বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। জুরাইন কবরস্থানে বড় ছেলে কামরুজ্জামান কবীরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন এ কিংবদন্তি।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন, ছিলেন একজন স্রষ্টা, লেখক, কৌতুকাভিনেতা, খলনায়ক এবং সর্বোপরি একজন শিল্পী, যিনি জীবন দিয়ে গড়ে গেছেন এক অমলিন ঐতিহ্য।










