ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু চরিত্র আছে, যাদের উপস্থিতি পর্দায় খুব অল্প সময়ের হলেও তাদের প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকে। `শোলে’ সিনেমার সাম্ভা তেমনই এক চরিত্র। পাথুরে পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে গব্বর সিংয়ের প্রশ্নের জবাবে তার সংক্ষিপ্ত সংলাপ আজও ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ। সেই সাম্ভাকেই জীবন্ত করেছিলেন অভিনেতা ম্যাক মোহন। অথচ দর্শকদের কাছে সাম্ভা হয়ে ওঠা এই মানুষটির ব্যক্তিগত জীবন, সংগ্রাম, অনুভূতি কিংবা শিল্পীসত্তা সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানেন। সেই অজানা মানুষটিকেই এবার নতুনভাবে আবিষ্কার করতে চলেছেন তারই মেয়ে, নির্মাতা মঞ্জরী মাকিজানি।
এ বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র ‘ডিসকভারিং সাম্ভা’র কথা। কথা। সিনেমাটি পরিচালনা করবেন মঞ্জরী মাকিজানি এবং প্রযোজনায় থাকছেন তার বোন বিনতি মাকিজানি। ভারত-অস্ট্রেলিয়া যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হতে যাওয়া এই চলচ্চিত্রের কাজ শুরু হবে চলতি বছরের শেষ দিকে, আর মুক্তির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২০২৭ সাল।
ম্যাক মোহনের অভিনয়জীবন ছিল বিস্ময়করভাবে দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। পাঁচ দশকের বেশি সময়ে তিনি অভিনয় করেছেন ২৮০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে। ডন, শান, কর্জ, জঞ্জির, সাত্তে পে সাত্তা, ত্রিশুল ও খুন পাসিনা এর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু এতসব সিনেমার ভিড়েও তাঁকে সবচেয়ে বেশি মনে রেখেছে মানুষ শোলের সাম্ভা হিসেবেই। ভারতীয় সিনেমায় নায়কদের মতোই কিছু পার্শ্বচরিত্রও যে সাংস্কৃতিক আইকনে পরিণত হতে পারে, ম্যাক মোহন তার অন্যতম উদাহরণ।
তবে ডিসকভারিং সাম্ভা কেবল একজন অভিনেতার ক্যারিয়ারকে ফিরে দেখার চলচ্চিত্র নয়। এটি মূলত একজন কন্যার নিজের বাবাকে নতুনভাবে আবিষ্কারের গল্প। মঞ্জরী মাকিজানি বলেছেন, পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের কাছে তার বাবা ছিলেন সাম্ভা, কিন্তু একজন বাবা হিসেবে তিনি কে ছিলেন, সেই মানুষটিকে এখনও তিনি খুঁজে চলেছেন। পরিবারের স্মৃতি, পুরনো আর্কাইভ ফুটেজ, সহকর্মীদের অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির মধ্য দিয়ে তিনি ধরতে চান সেই মানুষটিকে, যিনি পর্দার ভিলেনসুলভ চেহারার আড়ালে ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল, উষ্ণ এবং হাস্যরসিক একজন মানুষ।

শোলের দৃশ্যে ম্যাক মোহন। ছবি: আইএমডিবি
মঞ্জরীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এই চলচ্চিত্র তার কাছে নিছক পেশাগত কাজ নয়; বরং এক ধরনের আবেগময় আত্মঅন্বেষণ। তিনি বলেছেন, এটি হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে ‘ক্যাথার্টিক’ চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে। বাবাকে হারানোর পর স্মৃতি, অনুপস্থিতি এবং অসম্পূর্ণ কথোপকথনের ভেতর দিয়ে তিনি নিজের শৈশব ও পারিবারিক সম্পর্ককে নতুন করে দেখতে চাইছেন। ফলে তথ্যচিত্রটি একদিকে যেমন ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠতে পারে, অন্যদিকে এটি হয়ে উঠতে পারে বাবা-মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে গভীর মানবিক দলিল।
সিনেমাটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন শিবেন্দ্র সিং দুঙ্গারপুর। তিনি ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্র সংরক্ষণ আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ। সম্প্রতি তার তত্ত্বাবধানেই পুনরুদ্ধার করা হয়েছে শোলে। তিনি মনে করেন, ম্যাক মোহনের জনপ্রিয়তা তাঁর সময়ের বড় বড় নায়কদের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। ছোট বা বড়—যে ভূমিকাতেই তিনি অভিনয় করেছেন, দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন।










