জেনজি প্রজন্মকে অনেক সময় বলা হয় তারা আগের প্রজন্মের তুলনায় কম পরিশ্রমী। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

আমার মনে হয়, আমরা প্রজন্মের দিকে একটু বেশি ফোকাস করি। মানুষ একই থাকে, শুধু সময়ের সঙ্গে আশপাশের পরিবেশ ও চাওয়া-পাওয়াগুলো বদলে যায়। আগের সময়ে ডিজিটালাইজেশন কম ছিল, এখন সবকিছু ডিজিটাল। এর সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে জেনজি কিছু ক্ষেত্রে বেশি ডিজিটালনির্ভর হয়েছে। এর যেমন ইতিবাচক দিক আছে, তেমনি নেতিবাচক দিকও আছে। আমি ইতিবাচক দিকগুলো নিয়েই এগিয়ে যেতে চাই।

এখন প্লাটফর্ম অনেক বেড়েছে। এতে কাজের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি স্ট্রাগলও কি বেড়েছে?

অবশ্যই। লাক্সে আসার পর অনেকে ভাবতে পারেন, আমি সহজেই অনেক কিছু পেয়েছি। কিন্তু তার আগে আমারও বড় একটা স্ট্রাগল ছিল। ছোটবেলা থেকেই কাজের চেষ্টা করেছি। তখন সবকিছু ফিজিক্যালি করতে হতো। মাইলের পর মাইল হেঁটে অ্যাড ফার্মে গিয়ে ছবি জমা দিয়েছি, ফটোশুট করেছি, এখন সবকিছু হাতের মুঠোয়।

আমাদের এখানে ট্যালেন্টের চেয়ে ফেস ভ্যালুকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়?

কিছু ক্ষেত্রে হয়। এটা অবশ্যই একটা নেতিবাচক দিক। তবে সব জায়গায় এমন নয়। অনেকেই আবার নিজের যোগ্যতায় সুযোগ পান। আমার যতটুকু এফোর্ট ছিল, সেটা কাজে দিচ্ছিল না। তাই ফেস ভ্যালু ক্রিয়েট করার জন্য লাক্সে এসেছিলাম। চেয়েছিলাম একটা নাম শুনে যেন মানুষ বলে, লাক্স সুপারস্টার, ওকে কাজে নিই।

ফেস ভ্যালু কতটুকু তৈরি হয়েছে?

লাক্স সুপারস্টার একটা বিশাল ব্র্যান্ডিং হিসেবে কাজ করে। আমার আগে যারা ছিলেন—মেহজাবীন চৌধুরী, জাকিয়া বারী মম, বিদ্যা সিনহা মিম—তাদের নামের আগে লাক্স সুপারস্টার আছে। এখন লাক্স সুপারস্টারদের তালিকায় আমার ছবিও থাকে। এটা অবশ্যই কাজ করছে। মানুষ আমাকে এ পরিচয়ের মাধ্যমে কাজ দিচ্ছে। যাদের কাছে আগে অডিশন দিয়েও কাজ পাইনি, তারাই এখন মেসেজ দিয়ে বলছেন, কবে আমাদের সঙ্গে কাজ হবে।

আপনি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছেন। এখন মানুষ আপনাকে চিনছে। আপনার জীবনে টাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

যারা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসে, তাদের টাকার প্রতি একটা আকর্ষণ থাকে। আমার টাকার প্রতি খুব একটা লোভ কাজ করে না। আমি কখনো বিলাসী জীবনযাপন করিনি। তাই আমার কাছে অনেক টাকার মালিক হওয়া বা টাকার জন্য কাজ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। নিজেকে চালানোর জন্য যতটুকু দরকার এবং মায়ের কিছু স্বপ্ন পূরণ করার মতো সামর্থ্য থাকলেই হবে।

শুধু টাকার জন্য কি কাজের মানের সঙ্গে আপস করবেন?

চার-পাঁচ মাসে অনেক কাজের অফার পেয়েছি, কিন্তু সব কাজ করছি না। আমি বেছে বেছে কাজ করতে চাই। কোয়ান্টিটির চেয়ে আমার কাছে কোয়ালিটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যারা আমাকে এতদূর এনেছেন, যারা আমাকে ভালোবেসেছেন, তাদের সঙ্গে বেইমানি করতে চাই না।

শুধু অভিনয় করে একজন শিল্পীর পক্ষে এখন আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে সারভাইভ করা সম্ভব বলে মনে করেন?

আগে যারা কাজ করতেন, তাদেরও অন্য কোনো কাজ বা আয়ের উৎস থাকত। এখনো সেই বাস্তবতা আছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, অনেক দেশের বিনোদন ইন্ডাস্ট্রিই এখনো পিছিয়ে। হলিউডে একজন শিল্পী একটি সিনেমা করে যে পারিশ্রমিক পান, তাতে আর কিছু করার প্রয়োজন হয় না। বাংলাদেশে সেই প্রাধান্য দেয়া হয় না। এখানে জেন্ডারও গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী শিল্পীকে তুলনামূলক কম পারিশ্রমিক দেয়া হয়। অন্যদিকে আবার পুরুষ শিল্পীদেরও আলাদা অনেক ক্ষেত্রে স্ট্রাগল আছে।

সেক্ষেত্রে অন্য কোনো ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবছেন? আপনার ফিজিকসে আগ্রহ আছে বলে জানি।

অবশ্যই আছে। পড়াশোনা আমার খুব পছন্দের জায়গা। ফিজিকসও ভালো লাগে। ভবিষ্যতে অ্যাস্ট্রোফিজিকস নিয়ে পড়তে চাই। গবেষণা বা কোনো চাকরিতে যাওয়ার কথাও ভাবি। এটাকে ব্যাকআপ হিসেবে রাখতে চাই। তবে আমার মূল লক্ষ্য অভিনয়ে ভালো কিছু করা এবং বাংলাদেশকে সামনে নিয়ে যাওয়া।

একজন শিল্পী যদি বিকল্প ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবেন, তাহলে অভিনয়ে মনোযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে না?

এটা ব্যক্তি অনুযায়ী ভিন্ন হয়। আমি অপি করিম ম্যাম বা বিপাশা হায়াত ম্যামের উদাহরণ দিতে পারি। তারা পড়াশোনার পাশাপাশি শিল্পচর্চা করেছেন। কারো ইচ্ছা থাকলে শুধু শিল্পে নিজেকে নিবেদিত করে কাজ করতে পারেন, এটা তার ব্যক্তিগত পছন্দ। আবার কেউ যদি মনে করেন সবকিছু একসঙ্গে মেইনটেইন করে চলতে পারবেন, সেটাও সম্ভব।

রায়হান রাফী ও শিহাব শাহীনের সঙ্গে কাজ কতদূর এগিয়েছে?

শিহাব স্যারের ওয়েব ফিল্ম ক্যাফে আমব্রেলার কাজ প্রায় শেষ, একদিন শুটিং বাকি। আশা করছি আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে মুক্তি পাবে। লাক্সের পর আমার তেমন কিছু মুক্তি পায়নি, তাই এটা নিয়ে আমি ও আমার পরিবার-বন্ধুরা সবাই খুব এক্সাইটেড। গল্পটাও সুন্দর। রাফী স্যারের সঙ্গে একটি সিনেমা নিয়েও চ্যানেল আই ও ইউনিলিভারের সঙ্গে কথাবার্তা চলছে। আশা করছি ভালো কিছু হবে।

যদি লাক্সে আপনি না জিততেন, তাহলে কী হতো?

কষ্ট অবশ্যই পেতাম, তবে মনে হয় পরের দিনই ঠিক হয়ে যেতাম। আমার সঙ্গে খারাপ কিছু হলে কিছুক্ষণ মন খারাপ থাকে, পরে ভাবি, আল্লাহ নিশ্চয়ই কোনো কারণে এটা করেছেন।

ছোটবেলা থেকেই আপনি অভিনয়ের পরিবেশে বড় হয়েছেন। এসব অভিজ্ঞতা কি লাক্সে কাজে লেগেছে?

অভিজ্ঞতা অবশ্যই কাজে লেগেছে। আমি ক্যামেরা শাই ছিলাম না এবং ছোটবেলা থেকে অনেক কিছু শিখেছি। তবে এবারের লাক্স ছিল একেবারেই ভিন্নধর্মী। কনটেন্ট মেকিং, ইনফ্লুয়েন্সিংয়ের মতো বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আমি খুব একটা অভ্যস্ত ছিলাম না। নিজের সৌন্দর্য বা স্টাইল নিয়েও খুব বেশি সচেতন ছিলাম না। এবার মেধা ও প্রতিভাকেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আমি অনেক কিছু শেখার চেষ্টা করেছি, সেটা কাজে দিয়েছে।

মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়ার সময় আর্থিক সংগ্রাম অনেককে ভেঙে দেয়। আপনার ক্ষেত্রে বিষয়টি কীভাবে কাজ করেছে?

ছোটবেলা থেকে আমার মাকে অনেক কষ্ট করতে দেখেছি। উনিই আমার জীবনের সবকিছু ছিলেন। তাকে এত বেশি স্ট্রাগল করতে দেখে ছোটবেলা থেকেই ভাবতাম, মা যখন ভেঙে পড়ছেন, আমি যদি ভেঙে পড়ি তাহলে তাকে সামলাবে কে? তাই কখনো নিজেকে ভাঙতে দিইনি। চেষ্টা করেছি মাকে সাপোর্ট দিতে এবং যেভাবেই হোক স্ট্রং থাকতে। এখনো কোনো খারাপ পরিস্থিতি এলে আমি ভেঙে পড়ি না। নিজেকে বলি, ইটস ওকে।

শিহাব শাহীনের ওয়েব ফিল্মে নতুন শিল্পী হিসেবে সেটে কী ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে?

শিহাব স্যার কাজ শুরুর আগে ২০ দিন টানা রিহার্সাল করিয়েছেন এবং প্রতিটি বিষয় বিস্তারিত শিখিয়েছেন। তাই সেটে খুব একটা স্ট্রাগল করতে হয়নি। স্যার ও সহশিল্পীরাও খুব সাপোর্টিভ ছিলেন। তবে মেকআপ, কস্টিউমসহ কিছু বিষয় সামলানো শিখেছি। এর আগে ব্যাকগ্রাউন্ড আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেছি, এবার প্রথমবার মূল চরিত্রে কাজ করছি। তাই নিজের মতো করে কাজ করতে পারাটা ভালো লেগেছে।