দর্শকের আগ্রহের কথা ভেবেই বছরজুড়ে মুক্তি পায় বাংলা চলচ্চিত্র। চলতি বছর ৫০টির বেশি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকের সিনেমা নির্মাণের পাশাপাশি নির্মাতারা খুব কমই ভেবেছেন খুদে দর্শকের কথা। যদিও চলতি বছর শিশুতোষ সিনেমা মুক্তির সংখ্যা গত বছরের তুলনায় বেশি। এ বছর মুক্তি পেয়েছে চারটি শিশুতোষ সিনেমা। তবুও শিশুদের কথা ভেবে খুব বেশি নির্মাণ করছেন না দেশের নির্মাতারা। বছরে হাতে গোনা সিনেমা নির্মাণ হয় তাদের জন্য। 

এ বছরের শুরুতেই মুক্তি পায় শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘‌অ্যাডভেঞ্চার অফ সুন্দরবন’। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘‌রাতুলের রাত রাতুলের দিন’ উপন্যাস থেকে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি। সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত এ চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন আবু রায়হান জুয়েল। এর পর প্রায় সাত মাস পর আগস্টে মুক্তি পায় দুটি শিশুতোষ সিনেমা। এর মধ্যে একটি ‘মাইক’ অন্যটি ‘‌আম-কাঁঠালের ছুটি’। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে উপজীব্য করে বাংলাদেশ সরকারের অনুদানে নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য শিশুতোষ চলচ্চিত্র মাইক। বাংলাদেশ সরকারের অনুদানে নির্মিত হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য এ চলচ্চিত্র। তরুণ প্রজন্মের কাছে বড় পর্দায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ইতিহাস তুলে ধরতেই এ সিনেমা। এফএম শাহীন ও হাসান জাফরুল বিপুলের যৌথ পরিচালনায় নির্মিত সিনেমাটি প্রশংসা পেয়েছে।

এবার আসা যাক আম-কাঁঠালের ছুটি প্রসঙ্গে, চলতি বছর সব চেয়ে আলোচিত শিশুতোষ সিনেমা এটি। শরীফ উদ্দিন সবুজের ছোটগল্প অবলম্বনে শিশুতোষ ঘরানার এ সিনেমা নির্মাণ করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন মোহাম্মদ নূরুজ্জামান। একাধিক আন্তর্জাতিক উৎসবে গেছে আম কাঁঠালের ছুটি। আর বছরের শেষ শিশুতোষ সিনেমা ছিল ‘‌আজব ছেলে’। জনপ্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের আজব ছেলে ছোটগল্প অবলম্বনে সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন মানিক মানবিক। 

স্বাধীন বাংলাদেশে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রথম প্রয়াস নিয়েছিলেন সুভাষ দত্ত। ১৯৭৮ সালে সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘ডুমুরের ফুল’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। সেই থেকে শুরু। এরপর ১৯৮০ সালে দুটি কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় শিশু-কিশোরদের কথা ভেবে। ১৯৮০ সালে বাদল রহমানের পরিচালনায় ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ চলচ্চিত্র ও আজিজুর রহমান নির্মাণ করেন ‘ছুটির ঘণ্টা’। এরপর একে একে মুক্তি পেয়েছে ‘‌রামের সুমতি’, ‘‌দীপু নাম্বার টু’, ‘‌দূরত্ব’, ‘‌আমার বন্ধু রাশেদ’-এর মতো চলচ্চিত্র। বর্তমানে সিনেমা মুক্তি পেলেও ক্ষুদে দর্শকের কথা ভেবে খুব কম সিনেমা নির্মাণ করা হয়। বছরে হাতেগোনা কয়েকটি সিনেমা মুক্তি পায়। আর শিশুতোষ চলচ্চিত্রগুলো বেশির ভাগই নির্মিত হয় ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা বই থেকে। ক্ষুদে দর্শকের জন্য সিনেমা নির্মাণের এ কমতি নিয়ে কথা হয় জাফর ইকবালের সঙ্গে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‌সিনেমা নির্মাণের পর দর্শক সিনেমাটা দেখার পর নির্মাতার অর্থ উঠে আসে। এরপর তিনি আর একটা সিনেমা নির্মাণের কথা ভাবেন। আমাদের দেশে শিশুদের জন্য সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্মাতা ধরেই নেন এটা কেউ দেখবে না। সত্যি বলতে আসলেও শিশুদের সিনেমার প্রতি আমাদের দেশের মানুষের আগ্রহ অনেক কম। যদি শিশুদের সিনেমা দেখার সুযোগ করে দেয়া হয় তবেই তারা দেখতে পারে, নয়তো না। এ জন্যই এদেশে শিশুতোষ সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকারের অনুদান লাগে। প্রতি বছর বাচ্চাদের সিনেমা নির্মাণের অনুদান দেয়া হয়, কিন্তু সেটা যথেষ্ট না বলে আমি মনে করি। একটা সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে ভালো গল্প, ভালো নির্মাতা, দক্ষ ক্যামেরাম্যান লাগে। সব মিলিয়েই একটা সুন্দর ছবি হয়। এটা অনেক কোয়ালিটির বিষয়। শিশুরা যদি নিজের দেশের সুন্দর পৃথিবীর সুন্দর ছবি দেখতে পারে, তাহলে খুব ভালো হয়। কিন্তু সে সুযোগ আমাদের এখনো হয়নি।’ শিশুদের সিনেমা দেখানোর প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘‌শিশুরা পড়া মুখস্থ করবে, গাইড পড়বে এসব বিষয়ে আমাদের অভিভাবকরা চিন্তিত। কিন্তু শিশুদের এর বাইরেও একটা জীবন আছে, এটা অনেকেই মানতে নারাজ। এটা শহরের শিশুদের কথা বললাম,    যারা সিনেমা দেখার সুবিধা থাকলেও সুযোগ পায় না। আর গ্রামে অসংখ্য শিশু আছে, যারা শিশুতোষ সিনেমা দেখার কোনো সুযোগ পায় না। এ শিশুদের তাদের উপযোগী সিনেমা দেখানোর জন্য উদ্যোগ নেয়া দরকার।’

‘‌দীপু নম্বর টু’, ‘আমার বন্ধু রাশেদ’, ‘দূরত্ব’খ্যাত নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম শিশুদের নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে ভূমিকা রেখে চলেছেন। শিশুদের উপযোগী সিনেমা নির্মাণ কমে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শিশুদের সিনেমা নিয়ে মানুষের খুব বেশি আগ্রহ থাকে না। কারণ আমরা তাদের ছবিগুলোকে খুব বেশি গুরুত্ব দিই না। শিশুদের কাজকে ছোট মনে করা হয়, যেটা সিনেমা নির্মাণ কম হওয়ার একটা কারণ। আর দর্শক ছোটদের সিনেমা দেখতে যায় না, এটা একটা সমস্যা। শিশুরা তো একা সিনেমা দেখতে যেতে পারে না, তাদের অভিবাকদের নিয়ে যেতে হয়। যেহেতু অভিভাবকরা শিশুতোষ সিনেমা দেখতে নিয়ে যাচ্ছে না তাদের, তাই সিনেমাও নির্মাণ হয় না। এ অবস্থায় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। প্রতি বছর শিশুদের সিনেমা নির্মাণের জন্য অনুদান দেয়া হয়, এ সংখ্যা আরো বাড়ানো দরকার বলে আমি মনে করি।’

শিশুদের নিয়ে সিনেমা নির্মাণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আম কাঁঠালের ছুটির নির্মাতা মোহাম্মদ নূরুজ্জামান বলেন, ‘‌আমাদের দেশে শিশুদের সিনেমা খুব কম নির্মাণ হয়। আমার মনে হয়, আমাদের দেশের শিশুরা খুব বঞ্চিত সিনেমার ক্ষেত্রে। তারা তাদের উপযোগী ভালো সিনেমা দেখতে পারছে না, এটা ভবিষ্যতে ভালো প্রভাব ফেলবে বলে আমার মনে হয় না। শিশুদের কথা ভেবে আরো সিনেমা নির্মাণ হওয়া দরকার বলে আমি মনে করি। ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা, অনেক নির্মাতাই মনে করেন তাদের জন্য সিনেমা নির্মাণ করলে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হওয়া যাবে না। তবে ঠিকঠাকভাবে সিনেমা নির্মাণ করে শিশুদের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলে সেটা আর অলাভজনক থাকে না বলে আমি মনে করি।’

কেবল চলচ্চিত্র নির্মাণ নয়। শিশুদের চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য প্রেক্ষাগৃহও পাওয়া যায় না বলে জানান অনেক নির্মাতা। হাতেগোনা কয়েকটি হলে দেখানো হয় সিনেমাগুলো। শিশুতোষ সিনেমা নির্মাণ বাড়াতে সরকারের সহযোগিতা ও অভিভাবকদের সচেতনতা দরকার বলে মনে করেন সিনেমাসংশ্লিষ্টরা।