৮২ পেরিয়ে ৮৩-তে পা রাখছেন। কেমন লাগছে?

এখন আর জন্মদিন নিয়ে কোনো অনুভূতি হয় না। এটাকে স্বাভাবিক একটা ঘটনাই মনে হয়। বয়স বাড়াটাকে আমি বিশেষ কোনো গুরুত্ব দিতে চাই না।

এবারের জন্মদিন নিয়ে বিশেষ কোনো আয়োজন থাকছে কিনা...

আমার নাতনি তৃষার জন্মদিনও আজ। তাই আমাদের দুজনকে নিয়ে প্রতি বছরই কিছু আয়োজন করা হয়। জানি না আজ কী আয়োজন করেছে, হয়তো আমাকে বলবেও না, শেষ মুহূর্তে জানাবে। তবে কিছু একটা হয়, খাওয়াদাওয়াটাই মূলত বেশি হয়। আমি নাতনিকে একটা গিফট দিই, আমাকে আমার স্ত্রী ও মেয়েরা পাঞ্জাবি দেয়, কখনো টি-শার্ট দেয়।

এ বয়সেও টানা শুটিং করেন, শুটিংয়ের দিন আপনার কেমন কাটে?

শুটিং থাকলে সময়টা খুব ভালোভাবেই কাটে। মনে হয় সবার সঙ্গে দেখা হবে, তাই সকাল থেকেই একটু এক্সাইটেড থাকি এই ভেবে যে অনেকের সঙ্গে দেখা হবে। কারণ এটাই তো আমার জীবনের প্রধান কাজ, যেটা সবসময় পছন্দ করি, ভালোবাসি।

নিজে অভিনয় করছেন, পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের অভিনেতা-নির্মাতাদের কাজ দেখেন—কী মনে হয়, আমাদের মিডিয়াটা কোন দিকে যাচ্ছে?

মিডিয়া তো একটা অদ্ভুত জায়গা। একসময় যেখানে শৈল্পিক দিকটা খুব প্রাধান্য পেত।

এখন ব্যবসায়িক দিকটাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে টেকনিক্যালি আমাদের মিডিয়া অনেক এগিয়ে গেছে।

এখন নাটক আর সিনেমার মধ্যে অনেক ফারাক। আমরা যারা নাটক বানাতাম, তাদের সঙ্গে এখনকার ছেলেমেয়েদের নাটক বানানোর মিল নেই। কারণ আমরা নাটককে নাটকের মতোই বানাতাম। কিন্তু এখন যারা নতুন নাটক বানায়, তারা আসলে নাটক বানায় না, সিনেমাই বানায়। তবে টেকনিক্যালি এগুলোর মান অনেক ভালো, কারণ বাজেট বেশি থাকে, অনেক দিক থেকে কাজ করার সুযোগ থাকে।

ষাটের দশক থেকে আজ পর্যন্ত সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশে অনেক বদল দেখেছেন। তখনকার সময়ের সঙ্গে আজকের সময়ের তুলনা করলে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটা কী মনে হয়?

পার্থক্য তো অনেক। তখন এত ভিড়ভাট্টা ছিল না, এত লোকজনও ছিল না মিডিয়ায়। এত প্রডাকশন ছিল না, এত কাজও ছিল না। নীরবে, মনোযোগ দিয়ে কাজ করা যেত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখন সবকিছুই বেড়েছে। এখন প্রচুর মানুষ মিডিয়ায় যুক্ত। আগে এটাকে ইন্ডাস্ট্রি বলতাম না, বলতাম একটা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র। কিন্তু এখন এটাকে ভিডিও ইন্ডাস্ট্রি বলা যায়। এ ইন্ডাস্ট্রিতে কনটেন্ট রাইটার থেকে শুরু করে এখন পরিচালক, প্রডাকশন ম্যানেজার, ক্যামেরাম্যান, অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যামেরাম্যান, খাওয়াদাওয়া সবকিছু। প্রতিটা কাজই একেকটা পেশা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।

সুতরাং অনেক এগিয়ে গেছি আমরা। খালি একটা জায়গায়ই আমরা হয়তো পিছিয়ে যাচ্ছি, সেটা হচ্ছে আমাদের শিল্পমান। এ জায়গায় আমরা ঠিক এগোতে পারিনি, মনে হয় পিছিয়েই যাচ্ছি।

আপনার কি মনে হয় একেবারেই ভালো কাজ হচ্ছে না?

হচ্ছে, তবে পার্সেন্টেজ হিসেবে ধরলে সংখ্যায় অনেক কম।

মঞ্চের জন্য নতুন নাটক লেখার ইচ্ছা আছে বলেছিলেন। সে লেখা কি শুরু করেছেন, নাকি এখনো ভাবনার পর্যায়ে?

আমি এখন তো মঞ্চে অভিনয় করতে পারব না, কারণ চলাফেরার সে শক্তি আর নেই। তবে একটি মঞ্চনাটক পরিচালনা করার ইচ্ছা আছে। দেখা যাক, এখনো লেখা শুরু করিনি, চিন্তাভাবনা চলছে।

অতীতে আপনার লেখা বা পরিচালিত নাটকগুলো আজকের প্রজন্মের কাছে নতুন করে পৌঁছতে চাইলে, কীভাবে সেটা করতে চাইবেন?

আজকের প্রজন্মের জন্য যদি আমি আমার পুরনো নাটক আবার রিমেক করি, তাহলে নিশ্চয়ই আগের মতো করব না। কিন্তু যে মূল্যবোধ নিয়ে নাটকটা বানিয়েছিলাম, সেটা পুরোপুরি থাকবে। খালি টেকনিক্যালি আরো উন্নত করব। তখন যে প্রযুক্তি হাতে ছিল, এখন তার চেয়ে ভালো প্রযুক্তি হাতে আছে—সে প্রযুক্তির ব্যবহারটুকুই করব।

আপনি তরুণদের সঙ্গে কাজ করছেন, তাদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?

তরুণদের সঙ্গে কাজ করে আমি খুব আনন্দ পাই। কারণ ইদানিং আমি তরুণদের নাটকে অভিনয় করি, তাদের নির্দেশনায় কাজ করি। ওদের আমার ভালো লাগে।

ভালো লাগে এ কারণে—সত্যি কথা বলতে, আমি পুরনোপন্থী। কিন্তু তা হয়েও আমি আপডেটেড। সবসময় চেষ্টা করি দেখতে, শুনতে বা পড়তে। ওদের কাছ থেকে মনে হয় নতুন কিছু শিখতে পারব। ওরা যে নতুন জ্ঞান নিয়ে আসছে, সেটা আমি মিস করতে চাই না।

কাজ না থাকলে কীভাবে সময় কাটে?

একা থাকলে আমি আর আমার স্ত্রী একসঙ্গে বসে থাকি, এই যেমন কিছুক্ষণ আগে আমরা বসে বসে টেলিভিশন দেখছিলাম। সকালে আমি খবরের কাগজ পড়ছিলাম, ও টেলিভিশন দেখছিল। বিপাশার সঙ্গে কথা হয়। যতক্ষণ আমার কোনো কাজ নেই, একসঙ্গেই থাকি। আমি একা কোথাও যাই না, একা কিছু করি না। একেবারেই অফিশিয়াল কোনো কাজ হলে তখন একা যাই।

সবাই জানে আপনার জীবনে আপনার স্ত্রীর অবদান কতটা, কিন্তু আপনি নিজে তাকে কী দিয়েছেন বলে মনে করেন, যা তার জীবনকেও সমৃদ্ধ করেছে?

আমি বলি, আমার জীবনের ৯০ শতাংশই তার অবদান। আমি তাকে সব ব্যাপারে ১০০ শতাংশ সহযোগিতা দিয়েছি। সংসার চালাতে তার যা যা প্রয়োজন, সবই তাকে দিয়েছি। সবচেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে, তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আমি সব ব্যাপারে শতভাগ দিয়ে রেখেছি।

২০২১ সালে যে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই শুরু হয়েছিল, তারপর জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি?

আসলে এ রোগ থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে পেরেছি কিনা জানি না, কারণ এটা এমন এক রোগ, যার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। তবে এখন এটুকু বলতে পারি, ভালো আছি—আল্লাহর রহমতে, আল্লাহর কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা। কাজ করতে পারছি, চলাফেরা করতে পারছি।

আর প্রতিটা মুহূর্ত এ রোগের কথা ভুলে থাকার চেষ্টা করি। আমি নিজের জীবনটাকে ইতিবাচকভাবেই দেখতে চাই। আই অ্যাম আ ফাইটার—এটাই মনে হয়, রোগটার সঙ্গে লড়ে যাচ্ছি।

এ লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় সহায় আমার স্ত্রী। সে আমাকে মনে করতেই দেবে না যে এ রোগ আমার হয়েছিল বা আছে। সব ব্যাপারে সাহায্য করবে, কিন্তু রোগের কথা মনে করলেই সে রাগ করবে। বলবে, জাস্ট ফরগেট ইট। আমার ডাক্তারও তাই বলেছেন, জাস্ট ফরগেট ইট।

সামনে হাতে কী কাজ আছে, নতুন কোনো পরিকল্পনা?

সামনে তেমন কোনো বড় কাজ নেই, তবে করে যাচ্ছি। যখনই কাজ আসছে, করছি। বিজ্ঞাপন করি, নাটক করি, বসে বসে লেখালেখি করি। যেমন গত বইমেলায় আমার একটা বই বেরিয়েছিল, আরেকটা আগামীতে বেরোবে।

সামনের জীবনে আপনার আর কী চাওয়া?

একটাই চাওয়া, আমি ভুলে যেতে চাই অতীতে কী হয়েছিল। চেষ্টা করব, আল্লাহ আমাকে যে বাড়তি সময়টুকু দিচ্ছেন, সেটা যেন ভালো কাজে লাগাতে পারি।

তরুণদের উদ্দেশে কিছু বলতে চান কী?

বার্তা এটাই, নিজেকে কখনো সবজান্তা মনে করবে না। আমরা কেউই সবজান্তা নই। আমাদের জ্ঞানের তারতম্য হতে পারে, পরিমাণের তারতম্য হতে পারে, কিন্তু আমরা কেউই সবজান্তা নই।