ঢাকাই সিনেমার গ্ল্যামারকন্যা পরীমনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। সময়ের সঙ্গে বদলেছে তার কাজের ধরন। সম্প্রতি গিয়াস উদ্দিন সেলিমের ওয়েবফিল্ম ‘সেপারেশন’-এ কাজ করছেন। ব্যক্তিজীবন, মাতৃত্ব, সন্তান ও ভবিষ্যতের নানা ভাবনা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন পরীমনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান।

‘সেপারেশন’-এর চরিত্রটি আপনার আগের চরিত্রগুলো থেকে কতটা আলাদা?

একদমই আলাদা। আমার ওস্তাদ, গিয়াস উদ্দিন সেলিমের সঙ্গে কাজ করলে এমনিতেই সবাই ভেবে নেয় যে চরিত্রটা আমার পুরো ক্যারিয়ারের চরিত্রগুলো থেকে আলাদা হবে। একজন অভিনেত্রী হিসেবে আমিও আসলে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে কাজ করতে চাই। ওনার সঙ্গে এর আগে আমার তিনটা কাজ হয়েছে। ‘স্বপ্নজাল’, ‘প্রীতি’ ও ‘গুণিন’। আর এখন ‘সেপারেশন’।

‘গুণিন’-এর পর আবার তার পরিচালনায় কাজ করলেন। এবারের অভিজ্ঞতায় নতুন কী পেলেন?

এবারের অভিজ্ঞতায় আমি একজন ভিন্ন পরিচালককে পেয়েছি। তার মধ্যে আমি ‘স্বপ্নজাল’-এর কোনো আঁচই দেখতে পাইনি। তার প্রতি আমার অনেক বিশ্বাস ছিল। সে কী বলে, কী নির্দেশনা দেয়, কী করতে চায়, কী বলতে চায়—সেই বিষয়গুলো আমি খুব সহজেই বুঝতে পারছিলাম।

কারণ তার সঙ্গে কাজের আমার অনেক বছরের অভিজ্ঞতা। যদিও অনেক বিরতি নিয়ে কাজ হয়েছে, কিন্তু কাজের অভিজ্ঞতা অনেক বছর। সেটা আমার জন্য অনেক হেল্পফুল হয়েছে।

গিয়াস উদ্দিন সেলিমকে ওস্তাদ বলেন। এর পেছনে কারণটা কী?

আমি তাকে ওস্তাদ বলব না কাকে বলব? কারণ তার পরিচালিত ‘স্বপ্নজাল’ সিনেমাটি খুব প্রশংসিত হয়েছে। এ সিনেমার মাধ্যমেই সবাই আমাকে অভিনেত্রী হিসেবে চিনেছে। সেখান থেকেই তাকে আমি ওস্তাদ বলি। তিনি আমার প্রথম স্কুল।

‘শাস্তি’, ‘ডোডোর গল্প’ ও ‘প্রীতিলতা’—সিনেমাগুলোর কাজ কতদূর?

‘শাস্তি’ এখনো নির্মাণাধীন। কাজটি পুরো টিমের ওপর নির্ভর করছে, তাই এ বিষয়ে এখন বিস্তারিত বলতে পারছি না। ‘ডোডোর গল্প’ মুক্তির অপেক্ষায় আছে। কবে মুক্তি পাবে, সেটা প্রডাকশনের পক্ষ থেকে বলতে পারবে।

‘প্রীতিলতা’র ক্ষেত্রে আমার একটা লম্বা গ্যাপ গেছে। জেলে যাওয়া, সন্তান জন্ম দেয়া, তাকে লালন-পালন করা ও শারীরিক পরিবর্তন—সব মিলিয়ে অনেকটা সময় চলে গেছে। এতদিন পর আবার কাজে ফেরাটা সবার জন্যই একটু কঠিন, বিশেষ করে আমার জন্য। তবে কাজটা নতুন করে শুরু করলে এবার ঠিকঠাকভাবে শেষ করতে পারব, ইনশাআল্লাহ।

নিজের কাজের ক্ষেত্রে এমন কোনো সীমা আছে, যেটা আপনি ভবিষ্যতে অভিনয়ের মাধ্যমে ভাঙতে চান?

রবীন্দ্রনাথের কোনো একটা সুন্দর চরিত্রে অভিনয় করার আকাঙ্ক্ষা আছে। আমি অনেক আগে থেকেই এ কথা বলে আসছি। এমন একটা চরিত্র, যেখানে আমাকে দেখতে একদম রবীন্দ্রনাথের ওই চরিত্রের মতো লাগবে।

এ সময়ে চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে পরীমনির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী, যেটা আগে একসময় ভাবতেন না?

আমার কাছে প্রথমে গল্প। এরপর দেখি, ডিরেকশন কে দিচ্ছে। এমন অনেক গল্প আছে, যেগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ, খুব সুন্দর ও গোছানো। কিন্তু কখনো কখনো এমন একজনের হাতে গল্পটা পড়েছে, যিনি পুরো গল্পটাকে ম্যাসাকার করে দিয়েছেন। ফলে শেষ পর্যন্ত গল্পটাই আর দাঁড়ায়নি।

দর্শকের ভালোবাসা ও সমর্থনকে কীভাবে দেখেন?

দর্শকের ঋণ কোনোদিন শোধ করা যাবে না। যদি আমাকে কেউ পছন্দ না করত, আমি নিশ্চয়ই এ জায়গায় আসতে পারতাম না। আমার মনে হয়, আমি পরীমনি আজকে যতটুকু আছি, তার সমস্ত কিছুই আমার দর্শকদের সাপোর্ট, ভালোবাসা এবং আশীর্বাদের কারণে। ওনারা আমাকে চান বলেই আজকে আমি টিকে আছি। যদি না চাইতেন, আমি কখনো এ জায়গায় থাকতে পারতাম না।

মিডিয়ায় আপনার কাজের চেয়ে ব্যক্তিগত বিষয়ই বেশি গুরুত্ব পায়। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

এটা আসলে খুবই দুঃখজনক। আমার ব্যক্তিগত জীবনের ছোটখাটো বিষয়ও সহজেই বড় খবর হয়ে যায়। এই ধরেন আমি সুইমিংপুলে গোসল করতে গেলাম, শিরোনাম হয়ে গেল সুইমিংপুলে উষ্ণতা ছড়াচ্ছেন পরীমনি। কিন্তু অনেকদিন পর ভালো একটি কাজ করলেও সেটি সেভাবে গুরুত্ব পায় না। আমি এখন বেছে কাজ করছি, বাকি সময়টা সন্তানদের দিচ্ছি। গিয়াস উদ্দিন সেলিমের মতো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করছি, তাই আমার মনে হয়, সেই কাজটিই বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা। গণমাধ্যমের উচিত ব্যক্তিগত বিষয়ের চেয়ে একজন শিল্পীর কাজকে সামনে আনা। কারণ শিল্পীর পরিচয় তার কাজ।

শিশুদের আপনি খুব ভালোবাসেন, আপনার দত্তক নেয়া দুটি শিশুও আছে। শিশুদের নিয়ে ভবিষ্যতে আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে?

আমার যদি সামর্থ্য থাকত আমি পৃথিবীর সব এতিম শিশুর মা হতাম। ছোটবেলাতেই বাবা-মাকে হারিয়েছি বলে এতিম শিশুদের কষ্টটা আমি বুঝি। আমি অনেক আদর-যত্নে বড় হলেও জানি, একটি শিশুর জীবনে মা ও পরিবার কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো অনাথ শিশু যদি মা ও একটা পরিবার পায়, সেটা তার জন্য অনেক বড় আশীর্বাদ। আমি বড় কোনো চ্যারিটি করতে চাই না, নিজের মতো করে শিশুদের দায়িত্ব নিতে চাই যেন তারা সুন্দর ও টেনশনমুক্তভাবে মায়ের কোলে বড় হতে পারে।

আপনার জীবনে আর কী প্রত্যাশা আছে?

সুস্থভাবে, সুন্দর করে বেঁচে থাকতে চাই। আমি সত্যিই ১০০ শিশুর মা হতে চাই, যাদের নিজ হাতে লালন-পালন করব। আমি কোনো অনাথ শিশু দেখতে চাই না। তাদের একটা ঠিকানা হোক, তারা যেন বলতে পারে, ‘পরীমনি আমার মা।’ নিজেকে এভাবেই দেখতে চাই।

ব্যক্তিগত বিষয়গুলো আপনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এতটা অকপটে প্রকাশ করেন কেন?

আমি আসলে আমার জীবনের কোনো কিছুই লুকাইনি। প্রেমের সময় যেমন লুকাইনি, তেমনি মাতৃত্বের পুরো যাত্রাটাও সবার সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছি। মা হওয়ার সময় বেবি বাম্প, শরীরের পরিবর্তন থেকে শুরু করে মাতৃত্বের অভিজ্ঞতাও অকপটে শেয়ার করেছি।

একইভাবে পরিবার, বন্ধু কিংবা কাছের মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্কও আমি লুকাই না। ভালো লাগলে বলি, খারাপ লাগলেও বলি। কে কীভাবে নেবে, সেটা নিয়ে ভাবি না। আমি যেভাবে জীবনটা উপভোগ করি, সেভাবেই প্রকাশ করতে চাই। আমার জীবনটা একটা খোলা বই।

আপনার কাছে সুখ বলতে কী বোঝায়?

এ মুহূর্তে আপনার সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে পারছি, এটাই আমার জন্য সুখ। আমি আসলে আমার জীবনটাকে অনেক ভালোবাসি। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত—সেটা সুখের হোক বা দুঃখের—আমি উপভোগ করি। ভালো-মন্দ সবকিছুই অকপটে গ্রহণ করি। নিজের মনের কথাগুলো এভাবে বলতে পারাটাই আমার কাছে সুখ।

জীবনের কঠিন সময়ে কে আপনাকে সবচেয়ে বেশি সাহস জুগিয়েছেন?

আমার নানু ভাই। তিনি এখন আর নেই। জীবনের কঠিন সময়গুলোতে নানু ভাই-ই আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহস দিয়েছেন। তিনি আমার জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ ছিলেন।

পর্দার চরিত্রগুলোর আড়ালে থাকা ব্যক্তিগত পরীমনিকে মানুষ কতটা চেনে?

আসলে আমাকে মানুষ খুব কমই চেনে। কারণ আমি নিজেকে সেভাবে কাউকে চিনতে দিইনি। কারো যদি সত্যিই আমাকে জানার আগ্রহ থাকে, তাহলে আমি বলতে পারব, আমি আসলে কী, কী ভাবি, আমার জীবনটা কেমন। মানুষ যার যার মতো করে ভাবে, সবার পার্সপেক্টিভ আলাদা।

তাই এখন যে যা ভাবার ভাবুক, আমি সেটা ভাবা ছেড়ে দিয়েছি। নিজের কাছে নিজে সৎ থাকতে চাই। আমি যা করছি, তাতে কারো সঙ্গে অন্যায় করছি না বা কারো ক্ষতি করছি না—এটা জানলেই আমি সুখী। আমার মনে হয়, নিজের জগতে নিজে ঠিক থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মা হওয়ার পর আপনার মধ্যে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে?

আগে নিজেকে নিয়ে খুব একটা ভাবতাম না। কখন খাচ্ছি, কখন ঘুমাচ্ছি—এসব নিয়ে আমার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না। কিন্তু এখন কখন খেতে হবে, ঘুমাতে হবে, বাচ্চার যত্ন নিতে হবে—সবকিছুই একটা নিয়মে চলে আসছে।

কারণ এখন আমি আরেকটি জীবনের দায়িত্ব নিয়েছি। আগে শুধু নিজের জন্য ভাবতাম, এখন আমার ওপর নির্ভরশীল আরেকটি জীবনের জন্যও ভাবি।

সমালোচনাকে কীভাবে দেখেন?

আমি একজন সাধারণ মানুষ। তাই চোখের সামনে কোনো সমালোচনা পড়লে মন খারাপ হয়। বিশেষ করে যে মানুষটা আমি নই, যে কাজটা করিনি বা যে বিষয়টা আমার সঙ্গে যায় না, সেটা নিয়ে কিছু বলা হলে খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক। ‘পরী’ নাম হলেও আমি পরীদের মতো জীবনযাপন করি না।

তবে অন্যের চিন্তা বা জাজমেন্টের ওপর নিজের জীবন নির্ভর করাতে চাই না। আমি যা ভাবি বা করি, সেটা নিজের কাছে ঠিক মনে হলেই করি। নিজের জীবনটা নিজের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই পরিচালনা করতে চাই।

‘পরীমনি’ নামটি কীভাবে এল?

আমার জন্মগত নাম শামসুন নাহার স্মৃতি। আমি দেখতে সুন্দর ছিলাম বলে আমার নানু আমাকে ‘পরী’ নামে ডাকতেন। মূলত তিনিই আমার নাম রেখেছিলেন ‘পরী বিবি’। পরে আদর করে ডাকতে ডাকতে ‘পরী’ হয়ে যায়। বরিশালের ভাষায় ‘মনি’ বা ‘মনা’ বলে আদর করে ডাকার একটা প্রচলন আছে। সেভাবেই পরীর সঙ্গে মনি যোগ হয়ে ধীরে ধীরে ‘পরীমনি’ নামটা হয়ে যায়।

কাজের বাইরে আপনার সবচেয়ে বড় মানসিক আশ্রয় কোথায়?

আমার ছেলে। আমার ছেলের বাইরে আসলে কিছু নেই। এছাড়া আমার পারিবারিক কবরস্থান আছে। সেখানে গেলেই আমার খুব শান্তি লাগে। কবরস্থানে গেলেই মনে হয় আমি অনেক শান্তিতে আছি। মনে হয়, আমি নিরাপদে আছি। তখন আমার আর কোনো কিছু দরকার হয় না।

নতুন কাউকে নিয়ে আবার সংসার গড়ার ইচ্ছা আছে?

না, আর ইচ্ছা নেই। তবে একটা সময় খুব চেয়েছি, আমার নিজের একটা সংসার হোক, একজন ঠিকঠাক পার্টনার থাকুক। কিন্তু সবাইকে আল্লাহ সবকিছু একভাবে দেন না। হয়তো এ জায়গাটায় আমি একটু আনলাকি। তবে এখন এটা আমি মেনে নিয়েছি। আমার মনে হয়, জীবনের সেরা সময়টুকু আমি আমার বাচ্চাদের সঙ্গে কাটাচ্ছি। ওরা বড় হয়ে যাচ্ছে, আর তাদের সঙ্গে কাটানো সময়টাই এখন আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।