বেশ কয়েক বছর আগে একাডেমিক একটি কাজে আমি মুর্তজা বশীরের একটি সাক্ষাত্কার নিতে তার বাসায় গিয়েছিলাম। সবসময়ই তিনি ফুরফুরে মেজাজে থাকতেন, উৎসাহ নিয়ে কথা বলতেন, ‘হন্তদন্ত’
ভঙ্গিতে নানা স্মৃতিচারণা করতেন, সেদিনও এর ব্যতিক্রম ছিল না। অনেক কথা বললেন, (স্বভাবতই
যেসব কথার বেশির ভাগই আমি এর আগে আরো অনেকবার শুনেছিলাম) তার ইতালি যাত্রার কথা, তার শিল্পের ইন্সপিরেশনের কথা, স্ত্রী টুলুর কথা, বাবার কথা, বন্ধুদের কথা, শিক্ষক জীবনের অভিজ্ঞতা এবং আরো আরো বিষয়।
যা-ই হোক, বাসায় এসে পরের দিন আমি সাক্ষাত্কারটি ট্রান্সক্রিপ্ট করতে বসলাম, তখন দেখা গেল সাক্ষাত্কারটি থেকে আমি যতই একটি গঠনমূলক আলোচনার সারাংশ বের করে আনতে চাইছিলাম, আলোচনাটি ঠিক ততই ইমোশনাল, ততই শিল্পের ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা—যেন কথাগুলোকেই তখন শিল্পীর ‘স্বয়ং শিল্পের বহিঃপ্রকাশ’
হিসেবে ধরে নিতে হচ্ছিল।
সাধারণত আমরা যখন কথা বলি, প্রতিটি বাক্যের মধ্যেই বৈষয়িক কিছু সত্যকে স্বীকার বা অস্বীকার করে করে এগিয়ে যাই। সেখানেই বিষয় বা সামাজিকতার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। আমরাও নিজেদের সেই রকম একটি বৈষয়িক জীব হিসেবেই উপস্থাপন করি। এমনকি, বেশির ভাগ শিল্পীই এই দায়বদ্ধতার বাইরে নিজেকে নিয়ে যেতে চান না। মুর্তজা বশীরের ক্ষেত্রে আমি লক্ষ করেছি, বিশেষত শেষ জীবনে বৈষয়িকতার প্রতি যেকোনো দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে (যেন অবান্তর) কথামালার প্রতিই তার অধিক আগ্রহ!
অনেকেই এই অবান্তর কথা বা কথামালাকে বার্ধক্য হিসেবে ধরে নেন। বৈজ্ঞানিকভাবে তা সত্যও হতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের নিজস্ব একটি গড়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে এই বৈজ্ঞানিক বস্তুত সত্যটি খুবই মিথ্যায় পর্যবসিত হয়, (আমি
মনে করি) যেখানে কোনো বার্ধক্যের প্রসঙ্গ আনা যায় না, সেখানে থাকে কেবল ব্যক্তির একান্ত নিজস্বতম অন্তঃপ্রক্রিয়ার ক্রমিক প্রতিফলন। ফলে শিল্পী বশীর তাই তার নিভু নিভু বার্ধক্যে বসেও ‘হড়হড়’
করে যা কিছু বলেন, বলে যান, সেটা তার শিল্পেরই প্রতিফলন হিসেবে ধরে নিতে হয়। আর আমাদেরও যুক্তির কঠিন বিচারে ফেলে এসব কথাকে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয় না। সে কারণেই কথাগুলো আরো গতিশীল, আরো স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো ‘অপর’ কিংবা কোনো ‘বৈষয়িক ক্ষেত্র’
তৈরি করার তার প্রয়োজন পড়ে না।
একটা ছোট উদাহরণ দিই। সেদিনের সাক্ষাত্কারে মুর্তজা বশীর তার বাবা ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর স্মৃতি টেনে বলছিলেন—
‘খাকের সঙ্গে খাক মিশে যাবে-- খাক
অর্থ মাটি। তোমার সৃষ্টি মাটি দিয়ে এবং যেখানের মাটি দিয়ে তুমি সৃষ্টি, সেখানকার মাটির সঙ্গেই তুমি মিশে যাবে, অন্য কেউ তোমাকে গ্রহণ করবে না। আমার বাবা তার মৃত্যুর আগে বলে গিয়েছিলেন তার মায়ের কবরের পাশে যেন তার কবর করা হয় আর অন্যপাশে তার স্ত্রীর কবর হয়। বাবার মৃত্যুর এক বছর আগে মা মারা গেলেন, দাদি আর মায়ের কবরের মাঝখানে বাবার কবর খোঁড়া হয়েছিল, অথচ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বাবার কবর খোঁড়া হলো ফজলুল হক হলের মধ্যে!’
এখানে কয়েকটা ছোট ছোট বিষয়—এক. মানুষের প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে মানুষের আগমনের সেই শতসিদ্ধ ‘ডিলেমা’,
শিল্পীর ইচ্ছা হলো মাটিকে তার বস্তুরূপ থেকে পরিত্রাণ দেয়া। দুই. বাবার কবর কিংবা কবরে বাবার শায়িত হওয়ার প্রসঙ্গটি নিয়ে পুনরায় ডিলেমা, যেন মা ও স্ত্রীর কবরের মাঝখানে শায়িত হতে পারলেই মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থায় তার বাবার অধিক শান্তি লাভ হতো। তিন. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্তক্ষেপে সেই ‘অধিক শান্তি লাভে’র পথে বাধা এবং তাতে শিল্পীর বশীরের অল্প-বিস্তর আক্ষেপ।
আমরা যদি চিন্তা করি তাহলে এর কোনোটাকেই কি আমরা যুক্তির বিচারে সমাধা করতে পারব? মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত কিন্তু মাটিকে অপার্থিব করে তোলা ছাড়া বা পার্থিব জীবনেই অপার্থিবের ‘মিছে’
সন্ধান ছাড়া আর কিছুই কিন্তু এখানে আবিষ্কার করা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে, পার্থিব মূল্যায়নের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর কবর যতখানি পাবলিক রোমাঞ্চের তৈরি করে, পারিবারিক কবরস্থান ঠিক ততখানি করতে পারে কি? কিন্তু বশীর চান, এই পার্থিব রোমাঞ্চের ওপর দিয়ে আরেকটি অপার্থিব রোমাঞ্চের মঞ্চ তৈরি করতে। সে কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্তক্ষেপে পারিবারিক কবরস্থানের সেই ‘অপার্থিবতা’
বিনষ্ট হয়ে যায়, তখন শিল্পীর আক্ষেপ চলে আসে।
২.
‘অপার্থিব’কে আমরা ফ্যান্টাসি বলেও অবিহিত করতে পারি। এবং অবশ্যই সৎ অর্থে। কারণ শিল্পকে আরম্ভ হতে হয় ফ্যান্টাসি থেকে, বাস্তবতা তার পর এসে যুক্ত হয়। সে হিসেবে আমার মনে হয় শিল্পী বশীরের ইন্সপিরেশনাল যেই গ্রাউন্ড, বৈদেশিক শিল্পের প্রতি তার যেই প্রীতি, তার পিকাসো কিংবা চতুর্দশ শতকের তার দুচ্চিও, জোত্তো—
এই গ্রাউন্ডটা যথেষ্টই যুক্তিগ্রাহ্য। তিনি যখন বলেন, ‘ছাত্র অবস্থায় আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল ভ্যাঁনগগ। ছাত্রাবস্থা শেষে আমাকে অনুপ্রেরণা দেয় মোদিগ্লিয়ানি। পিকাসো এখনো আমার সবচেয়ে প্রিয় শিল্পী। আমার যখনই কোনো সমস্যা হয়েছে, নিজের কাজের ব্যাপারে পিকাসো দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছি।’
তখন তার অবস্থানকে আমার সার্বিক মনে হতে কোনো দ্বিধা নেই।
একদা শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য্যসহ মুর্তজা বশীরের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, সেটাও কয়েক বছর আগে। সেখানে দুজন শিল্পী নিজেদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে নানা গল্প করেন। কথাবার্তাগুলো ধরে রাখার জন্য আমি তখন আমার সেলফোনের রেকোর্ড অন করে রাখি। প্রাসঙ্গিক তাই, সেখান থেকে শিল্পী বশীরের দু-তিনটি বাক্য এখানে উল্লেখ করা যায়। শিল্পী বশীর তার ওয়েস্টার্ন ইনফ্লুয়েন্স বা তার শিল্পসত্তার পরিচয়টা এভাবে দিতে চাচ্ছেন কিংবা দিতে গিয়ে কুণ্ঠিত হচ্ছেন না—
শিশির ভট্টাচার্য্যকে লক্ষ্য করে তিনি বলছেন, ‘শিশির, তুমি হলে রিয়েল ওরিয়েন্টাল আর্টিস্ট। ওরিয়েন্টাল আর্টিস্ট কল্পনা থেকে কাজ করে। আর আমি হলাম রিয়েল ওয়েস্টার্ন আর্টিস্ট। পিকাসো মডেল দেখে এঁকে গেছেন। মেমোরি থেকে কাজ কম কিন্তু তার, অ্যাকসেপ্ট কয়েকটা ড্রইং, বাদ বাকি ম্যাক্সিমাম কাজই হলো ওই। মদিরের সব কাজ তো মডেল থেকেই করা। আমি হলাম টিপিক্যাল ওয়েস্টার্ন আর্টিস্ট।’
আমার প্রশ্ন, বরং, একজন টিপিক্যাল ওয়েস্টার্ন আর্টিস্টের কাছেও কি এই বৃহত্তর বিভূতি বাংলা কম কিছু পেল?
৩.
বাংলাদেশের শিল্পচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নির্মিত হয়েছিল ১৯৪৮ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে। এই সময় এখানকার শিল্পচর্চার ধারা নির্মিত হয়েছে মূলত পাশ্চাত্য শিল্পধারাকে লক্ষ্য করে। চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে পৃথিবীতে আধুনিক শিল্পচর্চার যে ধারা চলছিল, এ অঞ্চলও তার থেকে দূরে ছিল না। অ্যাবস্ট্র্যাক্ট, অ্যাবস্ট্র্যাক্ট এক্সপ্রেশনিজম, কিউবিজম, স্যুররিয়ালিজম, এসব ধারা কমবেশি এখানে চর্চিত ছিল। দেশের শিল্পীরাও উচ্চশিক্ষার জন্য পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে গমন করেন। পরবর্তী সময় ফিরে এসে ঢাকায় শিল্পচর্চা শুরু করেন। ফলে নতুন নতুন নানা ধরন, রীতি-বৈচিত্র্য, অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় আধুনিকতার অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে।
এ সময়েরই উল্লেখযোগ্য শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম শিল্পী মুর্তজা বশীর।
শিল্পী মুর্তজা বশীর তার শিল্পজগতে প্রবেশের ক্ষেত্রে নানাবিধ পারিবারিক বাধাকে অতিক্রম করেছেন। এক রক্ষণশীল মুসলিম পরিবার আর বিখ্যাত প্রভাবশালী, জ্ঞানী পিতার আচ্ছাদন থেকে বেরিয়ে সৃজনশীল হয়ে ওঠা কেবল ডানপিটে আর অহংকার নিয়ে বেড়ে ওঠা সেই অভিমানী কিশোরের পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল। পরে সেই কিশোরই প্রচণ্ড সৃজনীশক্তি আর শিল্পের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ নিয়ে বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় নতুন পথ নির্মাণ করেছিলেন।
জীবনোপলব্ধিতে পরিপূর্ণ একজন শিল্পী স্বভাবতই সত্য প্রকাশে অবিচল থাকেন। শিল্পী বশীরের প্রতিটি বিশ্বাস, অহংকার, আনন্দ তার চিত্রপটে বিকশিত হয়েছে। তিনি বারংবার বলেছেন শিল্পীর সততা চিত্রপটে প্রকাশ পায়, আর তা থেকে বোঝা যায় একজন দর্শকের উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। চিত্রকর আর দর্শকের আত্মিক যোগাযোগ তৈরি করে ক্যানভাস। শিল্পীর যদি তার শিল্পের প্রতি সততা না থাকে, শিল্প যদি পণ্য হিসেবেই গ্যালারিতে উপস্থাপিত হয়, তাহলে সেখানে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
আধুনিক চিত্রকর হিসেবে মুর্তজা বশীরকে আমাদের বিশেষভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। পাশ্চাত্যের সকল জনরা সম্পর্কে অবহিত হয়ে নিজের স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পাওয়া, নিজস্ব রীতি তৈরি করা, আবার জীবনব্যাপী তা প্রতিফলিত করা—এসব কিছুই যেকোনো আধুনিক ভাবাপন্ন শিল্পীর জন্য কঠোর অনুশীলন আর নিরীক্ষার বিষয়। মুর্তজা বশীর অনায়াসেই সেই পথ পাড়ি দিয়েছেন। নির্মাণ করেছেন নতুন শিল্প ভাষা, নতুন করণকৌশল। গভর্নমেন্টস ইনস্টিটিউট অব আর্টসে তার
শিল্পী জীবনের সূচনা হয় ১৯৪৯ সালে।
জীবনের শুরুর দিককার এ সময়টিকে শিল্পী বশীর এভাবে ব্যক্ত করেছেন, ‘প্রথম জীবনে যখন আমি আর্ট কলেজ থেকে পাস করেছি, তখন আমার মধ্যে একটা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, বাম রাজনীতি করার ফলে মেহনতি মানুষ, সমাজ, তাদের দুঃখ, ভালোবাসা, প্রেম প্রভৃতি এঁকেছি ক্যানভাসে। পরে ইতালিতে শিল্প শিক্ষার জন্য গিয়ে এঁকেছি নিসর্গ, আর সমাজের নিম্নবর্গীয় মানুষের ছবি। করাচিতে থাকাকালীন মধ্যবিত্ত বাঙালির অবসর জীবন, চুল বাঁধা, ধানকোটা, বিশ্রাম দৃশ্যের ছবি এঁকেছি। ৯৩-এর পর যেসব ছবি এঁকেছি, সেখানে বিত্তবান সমাজের নারীদের এঁকেছি, কিন্তু তাদের অভিব্যক্তিতে রয়েছে বেদনা, তাদের চোখে এক ধরনের দুঃখ, যা আমি আঁকতে চেয়েছি।’
তিনি ল্যান্ডস্ক্যাপ নির্মাণে অনাগ্রহী ছিলেন। একাকী নারী চরিত্র তার অন্যতম প্রিয় বিষয় হিসেবে ক্যানভাসে এসেছে। এ ব্যাপারে মুর্তজা বশীরের সরল স্বীকারোক্তিটি এমন, ‘আমি একজন পুরুষ, তাই বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ থেকেই নারীদেহ এঁকেছি, পৃথিবীর সব শিল্পীই তাই। এটার মধ্যে আছে বায়োলজিক্যাল ডিজায়ার, এছাড়া কিন্তু আর কিছু নাই।’
শিল্পী মুর্তজা বশীরের ক্যানভাস ছিল ভীষণভাবে নিরীক্ষাধর্মী।
তিনি রঙ, ফর্ম, প্যাটার্ন নিয়ে ছিলেন ভীষণ মনোযোগী, নতুনত্ব তৈরি করা ছিল তার বৈশিষ্ট্য। তার ছবিতে উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার অত্যন্ত দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়। বলিষ্ঠ রেখা, উজ্জ্বল বর্ণ তার ক্যানভাসকে বাঙ্ময় করে তোলে। নিরীক্ষাপ্রবণ শিল্পী মুর্তজা বশীর মূর্ত-বিমূর্ততাকে নতুন উপলব্ধিতে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করেছেন। কিউবিজমের প্রভাবকে তিনি নিজস্ব ক্রমপরিবর্তনশীল ধারায় সরলীকরণ করে পরস্ফুিট করেছেন।
তিনি আজ নেই, তার ছবিগুলো আছে। কম হোক, সেই সব ছবি আমরা আরো আটাশি বছর দেখে কাটাতে পারব।
লেখক: চিত্রশিল্পী ও গবেষক










