বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘তিস্তা এ অঞ্চলের অহংকার। কথা দিচ্ছি, তিস্তাকে ঘিরেই উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। যেকোনো কিছুর বিনিময়ে হলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।’
গতকাল দুপুরে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা ব্যারাজ হেলিপ্যাড মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় তিনি এ কথা বলেন। এদিন তিনি কুড়িগ্রাম ও টাঙ্গাইলেও নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর—
লালমনিরহাট: ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘কেউ কেউ শুরুতে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ছিলেন না। পরে পরিস্থিতি বুঝে অবস্থান বদলেছেন। আমরা বসন্তের কোকিল নই। আমরা দেশ ছেড়ে পালাই না, দেশেই থাকব। এবারের নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়। এবার দুটি ভোট—একটি ‘হ্যাঁ’, একটি দলীয়। ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি, ‘না’ মানে গোলামি। ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিজয় মানে জনতার বিজয়।’
বুড়িমারী স্থলবন্দর আধুনিকায়ন, বুড়িমারী-লালমনিরহাট-রংপুর পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়ককে চার লেন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘উত্তরবঙ্গ কি কারো সৎ মায়ের সন্তান যে তাকে উপেক্ষা, অবহেলা, অবজ্ঞা করতে হবে। আমরা কথা দিচ্ছি—এ বঞ্চিত এলাকা থেকেই বাংলাদেশের উন্নয়নের বিসমিল্লাহ হবে। যুগ যুগ ধরে এ এলাকার মানুষকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আপনাদের অনুভূতিকে সস্তা পুঁজি করে ক্ষমতার মসনদে পালাবদল করে অনেকে গিয়েছেন। জনগণের দিকে তাকানোর সময় পাঁচ বছরে একবার হয়। আর বাকি সময় জনগণকে তারা চেনেন না। আমরা সেই বসন্তের কোকিল না। আমরা বিপদেও আছি, সুখের সময়েও আছি। আমরা বিপদের সময় দেশ ছেড়ে যাই না। আমরা মাটি কামড়ে পড়ে থাকি, পড়ে থাকব। আমরা এই দেশ ও মাটির বুকেই আশ্রয় চাই, বিছানা চাই।’
সভায় সভাপতিত্ব করেন লালমনিরহাট জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির ও লালমনিরহাট-৩ আসনের প্রার্থী আবু তাহের। এতে ১১ দলীয় জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন।
কুড়িগ্রাম: দুপুর সাড়ে ১২টায় কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘একটি গোষ্ঠী আমার পেছনে লেগেছে। চারদিন আগে আমার এক্স আইডি হ্যাক করে যা তা চালিয়ে দিছে। আর অমনি একটা দল ঝাঁপিয়ে পড়ে তাইরে-নাইরে গান শুরু করেছে। লজ্জা! ওদের চুনোপুঁটি তো গাইল বটে, তাদের বড় বড় মাথাও গাইতে শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু তারা পেরে ওঠেনি। আমাদের সাইবার টিম তাদের শক্তভাবে কব্জা করে ধরে ফেলেছে। সত্য কখনো ধামাচাপা দেয়া যায় না। এরই মধ্যে মূল ষড়যন্ত্রকারীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। সত্য মেঘের আড়ালে ঢাকা থাকে না। সূর্যকে মেঘ ঢেকে রাখতে পারে না। সত্য এখন উদ্ভাসিত।’
কুড়িগ্রাম দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনপদ মন্তব্য করে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, ‘এ কুড়িগ্রাম থেকে শুরু হবে আমাদের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা। আমার কাছে দাবি জানাতে হবে না। বঞ্চিতদের আর মিছিল করতে হবে না। উন্নয়ন করা আমাদের ইমানি দায়িত্ব। কুড়িগ্রামকে কৃষি শিল্পের রাজধানীতে পরিণত করব আমরা। কৃষি বিপ্লব হলে সবাই কাজ পাবেন। বঞ্চিত এ এলাকায় যেন আল্লাহ মণিমুক্তায় ভরিয়ে দেন।’
তিনি বলেন, ‘কুড়িগ্রামের প্রধান দুঃখ তিনটি বড় নদী। এ নদীগুলো হত্যা করে মরুভূমি করা হয়েছে। রাষ্ট্রের বাজেট সব চুরি করা হয়েছে। ২৮ লাখ কোটি টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। আমাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ করে দিলে এসব টাকা পেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনব।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘রংপুরের সন্তান শহীদ আবু সাঈদ বুক পেতে দিয়ে বলেছে, অধিকার দাও, নাহলে গুলি কর। সাঈদ বুকে তিন তিনটি গুলি নিয়েছে বীরের মতো। এখান থেকে আন্দোলন গড়ে উঠেছে। সাঈদ, মুগ্ধ, হাদিসহ ১ হাজার ৪০০ শহীদ হয়েছে। এদের রক্তে নদী লাল হয়েছে। আমরা এ রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করব না। তারা জীবন দিয়ে দেশের যে আমানত আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন, সেই আমানত রক্ষায় প্রয়োজনে আমরাও জীবন দিতে প্রস্তুত।’
টাঙ্গাইল: বিকালে টাঙ্গাইল শহরের শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেছেন, ‘বিগত ৫৪ বছরে অনেক নির্বাচন হয়েছে। অনেক ওয়াদা দেয়া হয়েছে। কিন্তু ওয়াদা ওয়াদার জায়গায় রয়ে গেছে। জুলাই যুদ্ধে যুবকরা একটা দাবি করতেন—উই ওয়ান্ট জাস্টিস। আমরা এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে ইনসাফ থাকবে, যেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকবে, নিরাপত্তা থাকবে। আমরা আগামীতে মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাই।’
তিনি বলেন, ‘অনেক জুলুম-নির্যাতন সহ্য করার পরও দেশ ছাড়িনি, এই মাটি ছেড়ে যাইনি। আমরা দুঃখের সময় আপনাদের সঙ্গে, সুখের সময়ও আপনাদের সঙ্গে থাকব। আমরা জাতিকে পিছিয়ে নিতে চাই না। আমরা জাতিকে এগিয়ে নিতে চাই। ১২ ফেব্রুয়ারি সুষ্ঠু নির্বাচন জাতি আদায় করে ছাড়বে।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে দুটি ভোট। প্রথম ভোট ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে। ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে বাংলাদেশ জিতবে। ‘না’ ভোট জিতলে বাংলাদেশ পরাজিত হবে। ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি, ‘না’ মানে গোলামি। অনেকে এর আগে ‘হ্যাঁ’ও বলেনি, ‘না’-ও বলেনি। এখন হ্যাঁ ভোটের পক্ষে বলছেন—অভিনন্দন, মোবারকবাদ। দ্বিতীয় ভোটটা দেশ গড়ার ভোট। আগামীতে যারা সরকার চালাবে তারা, যারা অতীতে ভালো মানুষ প্রমাণিত হয়েছে তারা। বারবার সুযোগ পেয়েও যারা দুর্নীতিতে বিভিন্নভাবে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল তাদের নতুন করে আর দেখার কিছু নেই। এমনকি এখনো যারা দুর্নীতিতে লিপ্ত আছে তাদের আর নতুন করে দেখার সুযোগ নেই।’
এ সময় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান জেলার আটটি আসনের দলীয় ও শরিক দলের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা ও শাপলা কলি প্রতীক তুলে দেন।
টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের আমির আহসান হাবীব মাসুদ জনসভায় সভাপতিত্ব করেন।










