অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করাই বর্তমান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
জাতি ঐক্যবদ্ধ হলে অতি দ্রুতই বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে। শনিবার (১০ আগস্ট) বিকালে রংপুর
সার্কিট হাউজে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, নিরপরাধীদের কোনো হয়রানি নয়। তাদেরকে ফুলের
টোকাও দেয়া হবে না। আমরা অপরাধীদের বিচার করব। দেশে সহিংসতা বন্ধ হলে ১৭ কোটি মানুষকে
আরো বহু ওপরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, দেখা যাবে কতদিনে ভালো হয়। এখন আপনারাই
বিচার করেন কতদিন হলে ভালো হবে। এটা তো কেউ এখনো বলে নাই।
তিনি আরো বলেন, আমরা সবাই একটি পরিবার, সবাইকে ওপরে ওঠানোর চেষ্টা
করব। এখানে কেউ আমাদের বিদেশী আক্রমণকারী নেই, আমরা-আমরাই। আমরা একটি পরিবার হয়ে ঐক্যবদ্ধ
থাকতে চাই। এর আগে তিনি বেলা আড়াইটায় রংপুর সার্কিট হাউজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের
কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
তার আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূস রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোটা আন্দোলনে
আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে যান। তাদের শারীরিক অবস্থাসহ সার্বিক বিষয়ে খোঁজ-খবর নেন।
দুপুর পৌনে ২টায় রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন মিলনায়তনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের নানা দাবিসহ আগামীর বাংলাদেশ গড়তে তাদের প্রত্যাশার কথা শোনেন।
এ সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, নতুন বাংলাদেশ তরুণদের বাংলাদেশ। তরুণদের এখন কেউ টেনে রাখতে পারবে না। পথ পরিষ্কার করতে হবে। বেগম রোকেয়া নারীদের মুক্ত করেছেন। এখন রংপুর পুরো বাংলাদেশকে মুক্ত করবে।
এর আগে সকাল ১১টায় তিনি হেলিকপ্টারে করে রংপুরের পীরগঞ্জে মেরিন একাডেমিতে
আসেন। এরপর সড়ক পথে উপজেলার মদনখালী ইউনিয়নের জাফরপুর বাবনপাড়া গ্রামে কোটা আন্দোলনে
নিহত আবু সাঈদের বাড়িতে যান। সেখানে তার কবর জিয়ারতসহ পরিবারের সদস্যদের খোঁজ-খবর নেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের
সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, রংপুর বিভাগীয় কমিশনার জাকির হোসেন,
৬৬ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ
মোবাশ্বের হাসান, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলমসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন,
আবু সাঈদ যে স্বপ্নের জন্য বুক পেতে দিয়েছিল, আমাদের কাজ হলো সে স্বপ্নকে বাস্তবায়ন
করা। এটা গোটা জাতির কর্তব্য। আমি শুধু এখানে এসে কবর জিয়ারত করলাম, চলে গেলাম তা না।
এটা সারা জাতিকে বলতে চাই। যে লক্ষ্য নিয়ে বুক পেতে দিয়েছিল, যার কারণে কোটি কোটি ছেলে
মেয়ে বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। ভয় পায় নাই। আবু সাঈদের জন্য আমরা যে নতুন বাংলাদেশ
পেলাম, সেটি গড়ার দায়িত্ব আমাদের। তার কথা স্মরণ হবে এই কাজ করার মধ্য দিয়ে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, একটি মুক্তির জন্য আবু সাঈদ বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ছবি দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। একটা মানুষ বন্দুকের সামনে হাত উঠিয়ে দাঁড়িয়ে বলছে মারেন।
গুলি করেছে, একটু হেলে উঠে আবার দাঁড়িয়েছে।
পরে আবার একটা গুলি করেছে। আবু সাঈদ এখন পীরগঞ্জের না, তিনি এখন সারা বিশ্বের। আবু
সাঈদ যে কাজ করেছে এটি নিয়ে যুগ যুগান্তর কবিতা হবে, উপন্যাস হবে, নাটক হবে। মানুষ
তাকে সারা জীবন স্মরণ করবে। এই সেই লোক এখানে শুয়ে আছে।
তিনি বলেন, আমরা এ মাটির সন্তান। এটা আবু সাঈদের বাংলাদেশ। এটা এক
বাংলাদেশ, দুই বাংলাদেশ না। দেশ নিয়ে পার্থক্যকারীদের বিরুদ্ধে আমরা আবু সাঈদের মতো
রুখে দাঁড়াব। আমাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই।
তিনি আরো বলেন, আবু সাঈদ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার সন্তান।
আপনারা খেয়াল রাখবেন আর যেন দেশের কোথাও গোলযোগ না হয়। কেউ ধর্ম নিয়ে কথা না বলে। এটি
আমরা যেন নিশ্চিত করতে পারি। আমাদের ভাই, বোন, মা-বাবা সবাইকে রক্ষার দায়িত্ব আমাদের।
তিনি বলেন, ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা বড় হবে, স্কুলে আবু সাঈদের কথা পড়বে।
নিজে নিজে প্রস্তুত হবে। আমিও ন্যায়ের জন্য লড়ব, আমিও বুক পেতে দেব। আবু সাঈদ এখন ঘরে
ঘরে। প্রত্যেক ঘরে আবু সাঈদ রয়েছে।










