খুব চেনা এক সময়। কিংবা অচেনা। চার দেয়ালে বন্দি জীবন। বাইরে তখন মৃত্যুভয় আর এক অচেনা ভাইরাসের কড়া পাহাড়া। থমকে গেছে পৃথিবী। সেই সময় ঘরবন্দী জীবনকে ক্যামেরায় জমা করে ছুঁড়ে দিচ্ছে সবাই অন্য সবার সামনে। এমন ঘটনা আমাদের চেনা। তবে মানুষ হয়েছিল বাধ্য। অন্য আরেকটা চিত্রও পরিচিত। সাজানো গোছানো ব্যবস্থা। রঙিন আলোয় মোড়া স্টুডিও। যেখানে কিছু মানুষ স্বেচ্ছায় বন্দি। তারা কী করছেন, কী খাচ্ছেন, কার সঙ্গে শুচ্ছেন সবই ধরা হচ্ছে ক্যামেরায়। ড্রইং রুমে বসে সেসব দেখছে সারা দুনিয়ার দর্শক।
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, এই দুই ভিন্ন প্রান্তের বাস্তবতার মধ্যে মিলের সুতোটি বড়ই অদ্ভুত এবং গভীর। এক পাশে বিশ্বজোড়া এক অদৃশ্য মহাশত্রুর কঠিন অনুশাসনে ঘেরা লকডাউন, আর অন্য পাশে সেলুলয়েডের ফ্রেমে মোড়া গ্ল্যামারাস রিয়ালিটি শো—‘বিগ বস’। দুটোই যেন এক একটা রিয়েলিটি শো, তফাত শুধু এই যে একটিতে স্ক্রিপ্ট লেখে সময়, অন্যটিতে নির্দেশ দেন কোনো অদৃশ্য ‘বিগ বস’।
১৯৪৯ সালে প্রকাশ হয় জর্জ অরওয়েলের তার উপন্যাস ১৯৮৪। এতে এমন এক পৃথিবীর ছবি এঁকেছিলেন, যেখানে দেয়ালে দেয়ালে ঝোলানো পোস্টারের চোখ মানুষকে অনুসরণ করে। আর তার নিচে লেখা থাকে, ‘বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ।’ সেই জগতে নজরদারি ছিল ভয়ের নাম। মানুষ নিজের ঘরেও ফিসফিস করে কথা বলত, এমনকি সামলে রাখত মুখের ভাব। অবস্থা এমন হয়েছিল যে মনের ভেতরের চিন্তাকেও সন্দেহের চোখে দেখত নিজেরাই। অরওয়েল হয়ত কল্পনাও করেননি, মাত্র পঞ্চাশ বছর পর ঠিক সেই নামেই একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান জন্ম নেবে। সেখানে মানুষ নিজের ইচ্ছায় ক্যামেরার সামনে দিনরাত কাটাতে যাবে, আর কোটি কোটি দর্শক অভূতপূর্ব আগ্রহে তাদের দেখবে।

বিগ ব্রাদার প্রথম সিজনের প্রতিযোগিরা। ছবি: বিগ ব্রাদার উইকি-ফ্যানডম
১৯৯৯ সালে নেদারল্যান্ডসে সম্প্রচার শুরু হয় ‘বিগ ব্রাদার’। অনুষ্ঠানের ধারণাটির উদ্ভাবক ডাচ টেলিভিশন প্রযোজক জন ডি মোল। ভাবনাটি আপাতদৃষ্টিতে সরল। একদল অপরিচিত মানুষকে একটি বাড়িতে রাখা হবে, বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ থাকবে না। ফোন নেই, খবরের কাগজ নেই, আছে শুধু সহবাসীরা আর বাড়ির প্রতিটি কোণে বসানো ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন। নির্দিষ্ট সময় পরপর সদস্যরা নিজেদের মধ্যে ভোট দিয়ে কাউকে বিদায়ের জন্য মনোনীত করেন। দর্শকের ভোটে ঠিক হয় কে বাড়ি ছাড়বেন। এভাবে একে একে সবাই সরে যান, শেষে টিকে থাকা মানুষটিই বিজয়ী।
তবে মূল গল্পের শুরুটা হয়েছিল নেদারল্যান্ডের বিখ্যাত প্রযোজনা সংস্থা ইনডেমলের অফিসে। এই কোম্পানির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জন ডি. মল। ১৯৯৭ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, জন ডি. মল তার টিমের কয়েকজন সদস্যের সাথে একটি ব্রেইনস্টর্মিং সেশনে বসেন। এই টিমে ছিলেন প্যাট্রিক স্কোল্টাস এবং দুই ভাই—বার্ড রুমার, পল রুমার। তাদের উদ্দেশ্য ছিল টেলিভিশনের জন্য একদম নতুন এবং চমকপ্রদ কিছু তৈরি করা। সেই সময় টিভিতে মূলত স্ক্রিপ্টেড ড্রামা, শো অপেরা, আর গেম শো-এর রাজত্ব ছিল। জন ডি. মল চাইছিলেন এমন কিছু বানাতে যা স্ক্রিপ্টেড নয়, বরং একেবারেই আসল।

জন ডি. মল। ছবি: বিগ ব্রাদার উইকি-ফ্যানডম
দীর্ঘ আলোচনার পর তারা একটি ধারণা দাঁড় করান। প্রাথমিক নাম দেয়া হয়েছিল ‘দ্য গোল্ডেন কেজ’ বা ‘সোনার খাঁচা’। প্রাথমিক আইডিয়াটা ছিল বেশ ভয়ংকর। ঠিক করা হয়েছিল ৬ জন মানুষকে একটি বিলাসবহুল বাড়িতে এক বছরের জন্য আটকে রাখা হবে। যিনি শেষ পর্যন্ত টিকবেন, তিনিই পাবেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। কিন্তু শর্ত ছিল, এই বাড়িতে কোনো নিয়ম থাকবে না। প্রতিযোগীরা চাইলে একে অপরের সাথে মারামারিও করতে পারবেন। তবে খুব জলদি জন ডি. মল বুঝতে পেরেছিলেন, এক বছর সময়টা টেলিভিশনের জন্য বড্ড দীর্ঘ। নিয়ম ছাড়া মানুষকে আটকে রাখলে তা চরম বিপদের কারণ হতে পারে। তাই এই আইডিয়াকেও তারা বাতিল করে দেন।
এই কনসেপ্টটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার আগে, জন ডি. মল দুটি ভিন্ন জায়গা থেকে বড় বড় অনুপ্রেরণা পান। প্রথমটি হলো ১৯৯১ সালের ‘বায়োস্ফিয়ার টু’ এক্সপেরিমেন্ট। এটি ছিল এরিজোনা মরুভূমিতে তৈরি একটি বিশাল কাঁচের গম্বুজ, যেখানে ৮ জন বিজ্ঞানীকে বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল—এটা দেখার জন্য যে মানুষ একটি কৃত্রিম পরিবেশে কীভাবে টিকে থাকে।

জর্জ অরওয়েল, ছবি: ব্রিটানিকা ও ১৯৮৪-এর প্রচ্ছদ, ছবি: ভাইবস অ্যান্ড স্ক্রাইবস
জন ডি.মল দেখলেন, যখনই মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়, তখন তাদের মধ্যে ক্ষমতা, বেঁচে থাকা ও ইগো নিয়ে লড়াই শুরু হয়। তিনি ঠিক এটাই টেলিভিশনের পর্দায় আনতে চেয়েছিলেন। দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণাটা এসেছিল বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখক জর্জ অরওয়েলের লেখা ‘কালজয়ী উপন্যাস’ ১৯৮৪ থেকে। উপন্যাসের সেই বিখ্যাত লাইন—‘বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ’—এই ধারণা থেকেই তিনি তার শো-এর নাম ‘দ্য গোল্ডেন কেজ’ থেকে বদলে রাখলেন ‘দ্য বিগ ব্রাদার’।
নাম আর কনসেপ্ট তো তৈরি হলো। কিন্তু একে টিভির পর্দায় আনাটা মোটেই সহজ ছিল না। জন ডি. মল ঠিক করলেন, শো-এর মেয়াদ ১ বছর থেকে কমিয়ে ১০০ দিন করতে হবে। নিয়ম-কানুন কঠোরভাবে সাজানো হলো। প্রতিযোগীদের নিজেদের কাজ নিজেদেরই করতে হবে, নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে খাবারও জোগাড় করতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, তাদেরকে শো-এর কাল্পনিক চরিত্র ‘বিগ ব্রাদার’-এর সমস্ত আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। প্রতি সপ্তাহে প্রতিযোগীদের ‘কনফেশন রুম’-এ গিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে ভোট দিতে হবে, যাকে বলা হবে নমিনেশন। আর যাদের নাম সবচেয়ে বেশি আসবে, তাদের ভাগ্য টেলিফোনে ভোট দেওয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করবেন দর্শকেরা।
কিন্তু একটি বড় প্রশ্ন তখনও রয়ে গেছিল: টানা ১০০ দিন ক্যামেরায় নজরদারিতে থাকলে মানুষের মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে? এর জন্য জন ডি. মল মনস্তাত্ত্বিকদের একটি দল নিয়োগ করেন। তারা প্রতিযোগীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতেন এবং শো চলাকালীন যেকোনো ইমার্জেন্সির জন্য ২৪ ঘণ্টা সাইকোলজিক্যাল সাপোর্টের ব্যবস্থা রাখতেন। অবশেষে এলো সেই মহেন্দ্রক্ষণ। নেদারল্যান্ডসের শহর আলভেরায় তৈরি হলো ‘বিগ ব্রাদার’-এর প্রথম হাউস।
বাড়িটিতে ২৪টি ক্যামেরা এবং ৫৯টি মাইক্রোফোন এমনভাবে লুকানো ছিল, যে কোনো প্রতিযোগী টেরই পেতেন না কোথা থেকে তাদেরকে দেখা বা শোনা হচ্ছে। ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯, নেদারল্যান্ডের ‘ভিরনিকা’ চ্যানেলে প্রচার হলো ‘বিগ ব্রাদার’-এর প্রথম এপিসোড। ৯ জন প্রতিযোগী প্রবেশ করলেন সেই অচেনা বাড়িতে।
শো শুরু হওয়ার সাথে সাথেই ডাচ মিডিয়া এবং সমাজে রীতিমতো ঝড় উঠে গেল। ‘বিগ ব্রাদার’ শুরু হতেই সমালোচকেরা রে রে করে উঠলেন। অনেকেই এটিকে রুচিহীন এবং মানুষের মর্যাদা হানিকর বলে আখ্যা দিলেন। নেদারল্যান্ডের কিছু রাজনৈতিক নেতা শোটির সম্প্রচার বন্ধ করে দিতেও বললেন। তাদের মতে, মানুষকে খাঁচায় পশুর মতো বন্দি করে টিভির পর্দায় দেখানোটা সম্পূর্ণ অনৈতিক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সমালোচনা যত বাড়ল, শো-এর টিআরপি-ও রকেটের গতিতে আকাশ ছুঁতে লাগল। ডাচ দর্শকেরা রীতিমতো আসক্ত হয়ে পড়লেন। তারা বুঝতে পারলেন না, কেন কিছু সাধারণ মানুষের ঘুম থেকে ওঠা, দাঁত মাজা, রান্না করা, ঝগড়া করা দেখতে তাদের এত ভালো লাগছে। আসলে এই শো মানুষকে মানুষের আসল রূপ দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল—মেকআপ ছাড়া, স্ক্রিপ্ট ছাড়া। মানুষের আসলে কেমন, সেই কৌতূহলই ‘বিগ ব্রাদার’কে সুপারহিট করে তুলেছিল।

প্রথম সিজন জয়ী বার্ট স্প্রিং। ছবি: ইয়াহু
প্রথম সিজনে ফিনালে সম্প্রচারিত হওয়ার দিন নেদারল্যান্ডের রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। ডাচ জনগণের অর্ধেকের বেশি মানুষ সেদিন টিভির পর্দায় চোখ রেখেছিলেন—প্রথম বিজয়ী বার্ট স্প্রিংয়ের জয় দেখার জন্য। ইন্টারনেট তখনও এতটা উন্নত না হওয়া সত্ত্বেও, 'বিগ ব্রাদার'-এর লাইভ স্ট্রিমিং ওয়েবসাইটে এত বেশি ট্রাফিক এসেছিল যে সার্ভার ক্র্যাশ হয়ে গিয়েছিল। নেদারল্যান্ডের এই অভাবনীয় সাফল্যের পর, জন ডি. মল এবং এন্ডেমেলস কোম্পানি আর কখনোই পেছনে ফিরে তাকাননি।
২০০০ সালের মধ্যে জার্মান, পর্তুগাল, আমেরিকা, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেনে ‘বিগ ব্রাদার’-এর স্বত্ব বিক্রি হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে ‘বিগ ব্রাদার’-এর এক আলাদা স্ট্যাটাস তৈরি হয়। চ্যানেল সিবিএস-এর সম্প্রচারিত শোটি ব্রিটিশ পপ কালচারের একটা অভেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়। এরপর একে একে আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এর স্থানীয় সংস্করণ তৈরি হতে শুরু করে। প্রতিটি দেশ নিজেদের সংস্কৃতি, মানসিকতা এবং দর্শকের রুচি অনুযায়ী শো-এর ফরম্যাটে ছোটখাটো পরিবর্তন আনে। কিন্তু মূল কাঠামো—সেই আইসোলেশন, নমিনেশন—একই থাকে।

২০০০ সালের জুলাইয়ে শুরু হয় বিগ ব্রাদার ইউএস। ছবি: সিবিএস করপোরেশন
বিশ্বজুড়ে এই বিশাল যাত্রার পর, অবশেষে ২০০৬ সালে এন্ডেমেলস সিদ্ধান্ত নেন এই মেগা ফরম্যাটটিকে ভারতে লঞ্চ করার। যেহেতু ভারতের যৌথ পরিবারের ধারণা খুব দৃঢ় এবং এখানে আবেগের কদর বেশি, তাই শো-এর ফরম্যাটে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। নামের ক্ষেত্রে ‘বিগ ব্রাদার’-এর পরিবর্তে রাখা হয় ‘বিগ বস’।
২০০৬ সালে সনি এন্টারটেইনমেন্ট চ্যানেলে প্রচার হয় ‘বিগ বস’-এর প্রথম সিজন। প্রথম সিজনে পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বলিউড অভিনেতা আরশাদ ওয়ারসি। প্রথম সিজনে প্রতিযোগীদের মধ্যে ছিলেন রাহুল রায়, রবি কিষণ, রাভি শাওনাতের মতো তারকারা। ‘বিগ বস’ তার প্রথম সিজনেই ভারতীয় দর্শকদের মনোযোগ কাড়তে শুরু করে। মানুষ প্রথমবারের মতো তারকাদের মেকআপ ছাড়া সাধারণ মানুষের মতো ঝগড়া করতে, কাঁদতে দেখে। দ্বিতীয় সিজনে সঞ্চালক হয়ে আসেন শিল্পা শেঠি, যিনি নিজেই ২০০৭ সালে যুক্তরাজ্যে ‘সেলিব্রিটি বিগ ব্রাদার’ জিতে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

ঘরের ভেতরে প্রতিযোগিরা। ছবি: টিভি ইনসাইডার
তৃতীয় সিজনে অমিতাভ বচ্চন শো সঞ্চালনের দায়িত্ব নেন। কিন্তু অনুষ্ঠানটি বেশি জনপ্রিয়তা পায় সালমান খানের হাত ধরে। তিনি রীতিমতো শোটির ‘ফেস’ হয়ে ওঠেন। চতুর্থ সিজন থেকে দীর্ঘ সময় ধরে এর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। সপ্তাহান্তে তার সঞ্চালনায় ‘উইকেন্ড কা ওয়ার’ পর্বটি দর্শকের কাছে প্রায় আলাদা একটি অনুষ্ঠানের মর্যাদা পেয়েছে। তিনি কখনো প্রতিযোগীদের তিরস্কার করেন, কখনো সান্ত্বনা দেন, কখনো আবার আয়না ধরে দেখিয়ে দেন তাদের আচরণের চেহারা। তার নিজস্ব স্টাইল, প্রতিযোগীদের সাথে তার যোগাযোগ ও কথোপকথন, দর্শকদের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা বিগ বসকে ভারতের টেলিভিশন শো জগতে অনন্য করে তুলেছে।
এদিকে কেবল হিন্দিতেই সীমাবদ্ধ না থেকে এই জনপ্রিয়তার ঢেউ খুব দ্রুত কন্নড়, বাংলা, তামিল, তেলেগু, মারাঠি এবং মালয়ালমের মতো প্রধান আঞ্চলিক ভাষাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। আঞ্চলিক সংস্কৃতির ছোঁয়া এবং স্থানীয় সেলিব্রিটিদের অংশগ্রহণ এই শোকে প্রতিটি ঘরের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে।

হিন্দি সংস্করণে বিভিন্ন সিজিনে উপস্থাপক আরশাদ ওয়ার্সি, শিল্পা শেঠি, অমিতাভ বচ্চন ও সালমান খান। তামিলের উপস্থাপক কমল হাসান ও তেলেগুতে জুনিয়র এনটিআর। ছবি: ব্র্যান্ড ইকুইটি
২০১৩ সালে বাংলার টেলিভিশন পর্দায় পা রাখে ‘বিগ বস বাংলা’। ইটিভি বাংলায় প্রচারিত শোর প্রথম সিজনে সঞ্চালকের দায়িত্বে ছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী। তার নিজস্ব স্টাইল আর প্রতিযোগীদের সাথে আড্ডা শোটিকে অন্যমাত্রা দিয়েছিল। বিগ বস বাংলার এই প্রথম সিজনে সেরা শিরোপা জিতে নিয়েছিলেন জনপ্রিয় গায়ক অনিক ধর।
এরপর কিছুটা বিরতি। ২০১৬ সালে ফিরে আসে বিগ বসের দ্বিতীয় সিজন। এবার সঞ্চালকের ভূমিকায় এন্ট্রি নেন টলিউড অভিনেতা জিত। এই সিজনে চ্যাম্পিয়ন হন অভিনেতা জয়জিত ব্যানার্জী। আবারও দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালে স্টার জলসায় সম্প্রচার শুরু হয়েছে বিগ বস বাংলার তৃতীয় সিজন, সঞ্চালনায় রয়েছেন সৌরভ গাঙ্গুলি।

‘বিগ বস বাংলা’র প্রতিযোগীরা। ছবি: স্টার জলসা
শুরুটা বিগ ব্রাদার দিয়ে। এরপর নাম হলো বিগ বস। নামের বদলটি লক্ষ্য করার মতো। ইংরেজিতে ‘ব্রাদার’ শব্দটিতে একটা আত্মীয়তার, এমনকি কিছুটা আড়ালে থাকা কর্তৃত্বের আভাস আছে। তা অরওয়েলের উপন্যাসের পরিহাসময় ভয়কে মনে করিয়ে দেয়। ভারতীয় সংস্করণে সেই ‘ব্রাদার’ হয়ে গেলেন ‘বস’, অর্থাৎ সরাসরি কর্তা।

বিশেষ পর্বে মঞ্চে প্রসেনজিতের সঙ্গে বিগ বস সঞ্চালক সৌরভ গাঙ্গুলি। ছবি: স্টার জলসা
এই বিগ বস কোনো দৃশ্যমান মানুষ নন, তিনি একটি গম্ভীর, অদৃশ্য কণ্ঠস্বর, যিনি ঘরের ভেতরের সবার জীবন নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি দৈনন্দিন কাজ বা টাস্ক ঠিক করে দেন, রসদের পরিমাণ নির্ধারণ করেন, নিয়ম ভাঙলে শাস্তি দেন, আবার হঠাৎ কোনো চমকে পুরো সমীকরণ উল্টে দেন। প্রতিযোগীরা তাকে ‘বিগ বস’ বলে সম্বোধন করেন সমীহের সুরে, ঠিক যেমন লোকে কোনো সর্বশক্তিমান অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে। অদৃশ্য থেকেও ঘরের প্রতিটি মানুষের উপর এই যে নিরন্তর কর্তৃত্ব, তা দর্শকের মনে অরওয়েলীয় ছায়াকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
আজ ‘বিগ বস’ বা ‘বিগ ব্রাদার’ শুধু একটি টিভি শো নয়। এটি একটি সামাজিক দর্পণ। গত ২৫ বছরে এই শো প্রমাণ করেছে যে মানুষের মনুষ্যত্ব বুঝতে কতটা ভালোবাসে। নেদারল্যান্ডের একটি ছোট্ট অফিসে জন ডি মলের সেই ‘গোল্ডেন কেজ’ আইডিয়াটি আজ মাল্টি বিলিয়ন ডলারের গ্লোবাল ফ্র্যাঞ্চাইজিতে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি বদলেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে দর্শকদের রিএকশন দেওয়ার ধরণও বদলেছে। কিন্তু এত কিছুর পরও সেই চার দেওয়ালের বন্দি দশা, সেই বিগ বসের গম্ভীর গলার আওয়াজ আর ১০০ দিনের বেঁচে থাকার লড়াই আজও কোটি কোটি মানুষকে টিভির সামনে আটকে রাখে। আর ঠিক সেখানেই নেদারল্যান্ড থেকে শুরু হওয়া সেই অদ্ভুত এক্সপেরিমেন্টের সার্থকতা।










