নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও পাকিস্তান। এছাড়া জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ সরকারের সহযোগিতায় প্রস্তুত রয়েছে সংস্থাটি। আর বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে অন্তর্বর্তী সরকার কী পরিকল্পনা নেয়, সেটা দেখতে চায় বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
চীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, বেইজিং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় বিনিময় ও সহযোগিতা জোরদার করতে চায়। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বকে আরো এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে।
গতকাল চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেছে এবং এটিকে স্বাগত জানায় চীন। চীন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করে।’
এদিকে ইইউর উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি জোসেপ বোরেল ফনটেল গতকাল এক বিবৃতিতে জানান, ইইউ নতুন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি সংকট কাটিয়ে ওঠার প্রয়াসে সমর্থন জানাচ্ছে। এর মাধ্যমে সুশাসন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে একটি শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন ক্রান্তিকালে প্রবেশ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য মাঠ প্রস্তুত করা এবং আন্দোলনকালে প্রাণহানি ও সহিংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।’
তিনি আরো বলেন, ‘এটি গণতান্ত্রিক পথে দেশের অগ্রযাত্রা এবং বাংলাদেশের জনগণ ও তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিপূর্ণতা লাভের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।’
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ও জনগণকে যেকোনো সহযোগিতা দিতে জাতিসংঘ প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিবের উপমুখপাত্র ফারহান হক। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সংস্থাটির সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন তিনি।
ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, জাতিসংঘের মহাসচিব বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অভিনন্দন জানিয়েছেন কিনা বা তার সঙ্গে কথা বলেছেন কিনা।
জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিবের উপমুখপাত্র বলেন, ‘তিনি তার সঙ্গে কথা বলেননি। তবে বাংলাদেশে নিযুক্ত আবাসিক সমন্বয়ক বৃহস্পতিবার শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া যেন শান্তিপূর্ণ হয়, তা নিশ্চিত করতে তিনি ও কান্ট্রি টিম সক্রিয় রয়েছে।’
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের কোনো বক্তব্য আছে কিনা তা জানতে চাওয়া হয়। জবাবে উপমুখপাত্র বলেন, ‘আপনারা শুনেছেন যে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ায় সরকার গঠনের প্রত্যাশার কথা আমরা বলে আসছি। আমরা নিশ্চিতভাবেই সেই প্রত্যাশা করে যাব।’ বাংলাদেশে সহিংসতা কমে আসা ও জনসাধারণের কাছ থেকে বেশি মাত্রায় সংযত আচরণ ভালো লক্ষণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক আন্দোলনে কয়েকশ মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা তদন্তে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা চাওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন আরেক সাংবাদিক। এ ব্যাপারে জাতিসংঘের বক্তব্য জানতে চান তিনি। জবাবে ফারহান হক বলেন, ‘বাংলাদেশের নতুন সরকারের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘকে কী ধরনের অনুরোধ জানানো হয়, তা তারা দেখবেন। বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ যে ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করবে, আমরা অবশ্যই যেকোনো উপায়ে তাদের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি।’
বাংলাদেশে হিন্দুসহ অন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের কোনো প্রতিক্রিয়া বা বক্তব্য আছে কিনা তা জানতে চাওয়া হয়। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলেছি যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় বাংলাদেশে যেসব সহিংসতা হচ্ছে, তা কমিয়ে আনা হোক, সেটা আমরা নিশ্চিত করতে চাই। নিশ্চিতভাবেই যেকোনো ধরনের বর্ণবাদী আক্রমণ বা বর্ণভিত্তিক সহিংসতায় উসকানির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান।’
এছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার বলেছেন, ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে অন্তর্বর্তী সরকার কী পরিকল্পনা নেয়, যুক্তরাষ্ট্র সেটা দেখতে চায়।’ গত বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র এ কথা বলেন।
ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস শপথ নিয়েছেন। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো যোগাযোগ আছে কিনা। জবাবে ম্যাথিউ মিলার বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এবং ঢাকায় নিযুক্ত আমাদের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। আমি জানি না, তিনি তার (প্রধান উপদেষ্টা) সঙ্গে কথা বলেছেন কিনা।’
যোগাযোগের প্রকৃতিটা কেমন এমন প্রশ্নের জবাবে ম্যাথিউ মিলার বলেন, ‘তিনি (ইউনূস) ১ ঘণ্টা বা ২ ঘণ্টা আগে শপথ নিয়েছেন।’ আরেক প্রশ্নে সাংবাদিক বলেন, তিনি যোগাযোগের বিষয়টি নির্দিষ্ট করছেন না। তবে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে এ যোগাযোগ সম্পর্কে তিনি জানতে চান।
জবাবে ম্যাথিউ মিলার বলেন, ‘আমি গোপনীয় কূটনৈতিক সম্পর্কের কথা বলছি না। তবে আমরা একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছি, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক পরিকল্পনা কী, যুক্তরাষ্ট্র সেটা দেখতে চায়।’
আরেক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশ সরকারের (অন্তর্বর্তী) প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আপনি কি পররাষ্ট্র দপ্তর বা প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন? জবাবে পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি, আমাদের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। আমরা ড. ইউনূসকে স্বাগত জানিয়েছি। আমরা তাকে সাম্প্রতিক সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছি। আমরা বলেছি, যেহেতু বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে, সুতরাং আমরা এ সরকার ও ড. ইউনূসের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।’
এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নেয়ায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অভিনন্দন জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স হ্যান্ডলে দেয়া পোস্টে তিনি এ অভিনন্দন জানান।
ড. ইউনূসকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে সম্প্রীতিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আপনার সাফল্য কামনা করছি। আমি সামনের দিনগুলোয় পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা আরো গভীর করতে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।’










