খুলনার শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে রাসায়নিকের অভাবে প্রায় দুই মাস বন্ধ প্যাথলজি বিভাগের বেশির ভাগ পরীক্ষা। আগে যেখানে ২২ ধরনের রক্ত পরীক্ষা করা হতো, এখন সেখানে হচ্ছে পাঁচ ধরনের। কবে নাগাদ এসব সেবা চালু হবে তা জানে না হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট কেউ।

হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ডা. সুকুমার সাহা বলেন, বেশ কয়েকটি পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে রি-এজেন্টের অভাবে। কবে থেকে এ পরীক্ষা চালু হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, হাসপাতালটিতে রয়েছে চিকিৎসক সংকটও। আবার অবহেলায় পড়ে আছে বহু মূল্যবান যন্ত্রপাতি। ফলে খুলনার একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা মুখ থুবড়ে পড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন এখানে প্রায় ৫০০-৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। হাসপাতালটির প্যাথলজি বিভাগের সামনে প্রতিনিয়ত রোগী ও রোগীর স্বজনরা হতাশ হয়ে ফিরছেন। কাউন্টার খোলা থাকলেও পরীক্ষা হচ্ছে না। প্যাথলজি বিভাগের এ দুরবস্থার কারণে বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, নগরের গোয়ালখালী এলাকায় ২০১০ সালের ৩০ মার্চ ১১ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয় বিশেষায়িত এ হাসপাতালটি। কাগজে-কলমে ২৫০ শয্যার হলেও ১ যুগের মাথায় বর্তমানে ১০টি বিভাগে ১৭৪টি শয্যা নিয়ে চলছে হাসপাতালটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, রি-এজেন্টের অভাবে চলতি বছরের ১৪ অক্টোবর থেকে হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে হরমোন পরীক্ষা, টি ফোর, টি থ্রি, টিএসএইচ, ট্রোপো নাইন, এইচবিএ ওয়ানসি, পিএস, এএইচবিআইসি, সিরাম ক্রিটেনিনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। শুধু ভাইরাস পরীক্ষা ছাড়া অন্য কোনো পরীক্ষাই এ হাসপাতালে হচ্ছে না।

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এসব পরীক্ষা সরকারিভাবে করানোর সুযোগ থাকলেও বর্তমানে হাসপাতালের ‘দালালনির্ভর’ নামসর্বস্ব ল্যাবগুলো থেকে বাধ্য হয়ে পরীক্ষা করিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজন। প্যাথলজির পর গত ১১ ডিসেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে গেছে রেডিওলজি সেবাও। আবদুল মজিদ নামের এক রোগী বলেন, এখানে আসার পর চিকিৎসকরা পাঁচটি টেস্ট দিয়েছেন। এর মধ্যে চারটি বাইরে থেকে করাতে হয়েছে। এজন্য তার অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওইদিন রোগীদের কাছ থেকে সকালে টাকা ও স্লিপ জমা নিয়ে বেলা ১১টায় জানানো হয়, কম্পিউটার টেকনিশিয়ান চার মাস বেতন না পাওয়ায় তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। বর্তমানে সেই জায়গায় নতুন লোক না আসা পর্যন্ত আর আল্ট্রাসনো হবে না। কম্পিউটার টেকনিশিয়ান আউট সোর্সের মাধ্যমে অতিরিক্ত জনবল হিসেবে কন্ট্রাক্ট সার্ভিসে ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে তাকে চার মাস বেতন না দেয়ায় আর কাজে যোগদান করবেন না।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগেও সেবা নেই। নিউরো সার্জারি, অর্থোপেডিক্স সার্জারি বা কার্ডিওলজির মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ বিভাগ থাকলেও সেগুলোতে নেই কোনো সেবা। ২৪ লাখ টাকা মূল্যের অর্থোপেডিক্সের একটি ড্রিল মেশিন এখনো পড়ে রয়েছে স্টোরে।

হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, আলট্রাসাউন্ড, এক্স-রে বন্ধ হয়ে গেছে। এমআরআই হলেও তার রিপোর্ট দেয়া হয় না। ভাস্কুলার সার্জারি বিভাগে দায়িত্বে রয়েছেন দুজন মাত্র চিকিৎসক। তারাও চলতি মাসে অবসরে গেলে এই বিভাগও বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বহির্বিভাগে টিকিট কেটে ডাক্তার না দেখিয়ে ফেরত যেতে হচ্ছে রোগীদের।

দীর্ঘদিনের বুকের ব্যথা নিয়ে নড়াইলের কালিয়া থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আফরোজা বেগম বলেন, খুব ভালো হাসপাতাল জেনে এখানে এসেছিলাম। টিকিট কাটার পর জানতে পারলাম এখানে পরীক্ষা করানো যায় না, ডাক্তার নেই। তাই বাধ্য হয়ে অন্য হাসপাতালে যাচ্ছি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, অপর্যাপ্ত শয্যা ও ডায়ালাইসিস মেশিনস্বল্পতায় সবচেয়ে করুণচিত্র হাসপাতালের কিডনি বা নেফ্রোলজি বিভাগে। এখনে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রায় প্রতিদিনই সিরাম ক্রিয়েটিনিন ও ইলেক্ট্রেলাইট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু তা হচ্ছে না।

কিডনি রোগীরা দীর্ঘ সিরিয়াল দিয়ে ছয় মাসের জন্য ২০ হাজার টাকায় সিডিউল নিলেও ডায়ালাইসিস করাতে গিয়ে পড়ছেন বিপাকে। বেশির ভাগ সময় হাসপাতালে থাকছে না হেপারিন, ব্লাডলাইন, ডায়ালোজার, বিপট পানিসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। ফলে বাইরে থেকে উচ্চমূল্যে এগুলো কিনতে হচ্ছে।

হাসপাতালের নেফ্রোলজি (কিডনি) বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. ইনামুল কবির বলেন, আমার বিভাগে বিভিন্ন মালামালের সংকট রয়েছে। এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালকের কাছে চাহিদাপত্র দেয়া হয়েছে।

কিডনি বিভাগে ভর্তি হালিমা খাতুন বলেন, ডায়ালাইসিস করার সময় আগে কিছু সরঞ্জাম হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা হতো। এখন তা করা হচ্ছে না। বিপট পানি, হ্যান্ডগ্লাভস ও ব্লাড সেট সবকিছুই কিনে আনতে হচ্ছে।

হাসপাতালটির পরিচালক ডা. আবদুস শাকুর বলেন, চিকিৎসক সংকটের বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। সর্বশেষ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানের সঙ্গে চিকিৎসক সংকটের কথা বলা হয়েছে। তিনি আশ্বাস দেয়ার পরও কোনো চিকিৎসক পদায়ন হয়নি। হাসপাতালে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হচ্ছে। ৪২ জন মেডিকেল কর্মকর্তার মধ্যে এখানে আছেন মাত্র ১২ জন।

তিনি আরো বলেন, গত বছর সাবেক পরিচালক ডা. রেজা সেকেন্দার এমএসআরের মালামাল ক্রয় না করে মন্ত্রণালয়ে ১৪ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছেন। এ কারণে এমএসআরের মালামালের অভাবে চিকিৎসা সংকট এখনো বিরাজমান। আমি পাঁচবার তিন লাখ টাকা করে স্পট কোটেশন করেছি। তার পরও আমরা পরিস্থিতি সামাল দিয়ে উঠতে পারছি না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, আবু নাসেরের সার্বিক বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়েছে। আমরা তাদের একটি চিঠিও পেয়েছি। দ্রুত ব্যবস্থা নেব।