রাষ্ট্রকাঠামোয় ক্ষমতার ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশন প্রস্তাবিত জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত দিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। বিএনপি ও তাদের সমমনা ১২ দলীয় জোট এনসিসি গঠনের বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ পার্টিসহ (এবি পার্টি) কয়েকটি দল এনসিসি গঠনের পক্ষে মত দিয়েছে। আর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এনসিসি গঠনে ইতিবাচক মত দিলেও সেটি নির্বাচনের পরে করার কথা বলেছে। গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংস্কার নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় ধাপের সংলাপের দ্বিতীয় দিনে এনসিসি গঠনের প্রস্তাবটি প্রাধান্য পায়।
জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন জানায়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্যদের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদগুলোয় নিয়োগ তদারক করতে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে কাজ করবে এনসিসি। এর লক্ষ্য নির্বাহী বিভাগের একতরফা কর্তৃত্ব সীমিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।
এনসিসি গঠনে দ্বিমত পোষণ করেছে বিএনপি। দলটি মনে করছে, এটি গঠন হলে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা কমে যাবে, ফলে ভারসাম্য নষ্ট হবে। গতকাল আলোচনা শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এনসিসিকে সাংবিধানিকভাবে অনেক ক্ষমতা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তাদের জবাবদিহি নেই। অথরিটি আছে, পাওয়ার ফাংশন আছে কিন্তু অ্যাকাউন্টেবিলিটি নেই, এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমরা গণতান্ত্রিক দল হিসেবে সমর্থন জানাতে পারি না। এ ফাংশনগুলো আলাদা করে আরেকটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করার মধ্য দিয়ে একটা ইমব্যালেন্স সৃষ্টি করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘একটি ভারসাম্যমূলক রাষ্ট্রকাঠামো, সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য কী করতে পারি সেটা আমাদের চিন্তা করা উচিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকলে অতীতের নির্বাচনগুলো এভাবে হতো না। হয়তো কিছুটা আপত্তি থাকত, কিছু ভুলত্রুটি হতো। তাহলে আমাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। যদি আমরা নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে, আইনিভাবে ফাংশন করতে দিই, তাহলে এ নির্বাহী বিভাগ ও সংসদ সম্পূর্ণভাবে স্বৈরাচারী হওয়া থেকে চিরতরে রক্ষা পাবে।’
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তাবের আলোচনা প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘নির্বাচনের জন্য কমিশনের প্রস্তাব হচ্ছে ইলেকটোরাল কলেজ করা হবে এবং প্রায় ৭০ হাজার ভোটার থাকবে। স্থানীয় সরকার পর্যায়ের সব নির্বাচিত প্রতিনিধি এখানে ভোটার হিসেবে থাকবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যাপারে আমরা বলেছি, বিদ্যমান ব্যবস্থাতেই সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন। সংসদে উভয় পক্ষের সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। পরবর্তী সময়ে যদি জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে নতুন কোনো প্রস্তাব আসে বা জনগণ ও দেশের জন্য কল্যাণকর হয় তখন দেখা যাবে।’
আলোচনার বিরতিতে বিএনপির সমমনা ১২ দলীয় জোটের মুখপাত্র ও বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘আমরা এনসিসি গঠনের বিপক্ষে। এ মুহূর্তে এনসিসি গঠনের জন্য সময়ক্ষেপণ করা অপ্রয়োজনীয়।’
বিরতিতে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য যেসব কাজ করা দরকার, সরকারকে সেসব বিষয় সম্পন্ন করার জন্য আমরা বলেছি। এনসিসি গঠনের বিষয়ে আমরা ইতিবাচক মত দিলেও বিষয়টি নির্বাচিত সংসদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। এ মুহূর্তে এনসিসি গঠন প্রয়োজন মনে করছি না। এটা করা হলে সরকারের মধ্যে আরেকটি সরকার মনে হবে। তবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় আগামীতে আমরা এটাকে ভাবনায় রাখব। এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন। সেটাকে প্রাধান্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া দরকার।’
এদিকে গতকাল জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ থেকে ওয়াকআউট করেন সিপিবি ও গণফোরামের নেতারা। তবে কয়েক মিনিট পরে তাদের আবার সংলাপস্থলে নিয়ে যান কমিশনের সদস্যরা। জামায়াত নেতাদের বেশি কথা বলার সুযোগ দেয়া হয়েছে অভিযোগ তুলে তারা বৈঠকস্থল থেকে বের হয়ে যান।
জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টিসহ কয়েকটি দল এনসিসির গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু ভিন্নমতের কথা বলেছে। তবে সবাই এনসিসি গঠনের পক্ষে মত দিয়েছে।
গতকালের আলোচনা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের জানান, তার দল এনসিসি গঠনের পক্ষে। এর মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে। তবে এনসিসি গঠন ও এর আওতা নিয়ে ভিন্নমতের কথা জানান তিনি।
এনসিসিতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতিকে না রাখার পক্ষে মত দিয়েছে জামায়াত। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘তিন বাহিনী প্রধানের নিয়োগও এ কমিটির আওতায় না রাখার পক্ষে জামায়াতে ইসলামী। তবে বিষয়টি আরো আলোচনার দাবি রাখে।’
চলমান দ্বিতীয় ধাপের সংলাপ গত মঙ্গলবার বয়কট করলেও গতকাল অংশ নেয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ফোন করে ‘নিরপেক্ষ থাকবেন’ বলে আশ্বস্ত করায় তারা বৈঠকে যোগ দিয়েছে বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। এ প্রসঙ্গে গতকাল বৈঠকের বিরতিতে দলের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এর মধ্যে আমাদের সঙ্গে সরকারের অনেক কথা হয়েছে। কাল (মঙ্গলবার) দুপুরে প্রধান উপদেষ্টা আমাদের আমিরের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। আমরা আমাদের কথা বলেছি, তিনি উপলব্ধি করেছেন। আশ্বস্ত করেছেন, তার সরকার নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে। কোনো বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর প্রতি ঝুঁকে যাবেন না। তার সঙ্গে কথা বলার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আজকে বৈঠকে আসার সিদ্ধান্ত নিই।’
এনসিসি গঠনের পক্ষে অবস্থান জানিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘যারা এনসিসি গঠনের বিপক্ষে, তারা মূলত ফ্যাসিবাদী কাঠামোয় থেকে যেতে চান। এনসিসি গঠনের প্রস্তাবকে এনসিপি সমর্থন জানায়।’
তবে এনসিসি গঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাদের দ্বিমতের কথা তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এখানে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান নিয়োগের ক্ষমতা থাকা উচিত নয়। পাশাপাশি এনসিসিতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতিকেও রাখা উচিত নয়। এটা নিয়ে আরো আলোচনার প্রয়োজন আছে।’
এনসিসি গঠনের পক্ষে মত দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘বৈঠকে বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি কিছু রাজনৈতিক দল, যারা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বকীয়তা, স্বাধীনতা ও শক্তিশালীকরণের কথা বলতেন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ বন্ধের কথা বলতেন, তারাও আজ এনসিসি গঠনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন। কেউ কেউ বলতে চাইছেন, এটা এখন গঠন না করে পরে করা যেতে পারে। বিশেষ করে বামপন্থী কিছু সংগঠন এমন অবস্থান নিয়েছে। বিষয়টি আমাদের কাছে রহস্যজনক মনে হয়েছে।’
যারা দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে অনাগ্রহী, তারাই কেবল এনসিসি নিয়ে দ্বিমত করতে পারে বলে মন্তব্য করেন গাজী আতাউর রহমান। তিনি আরো বলেন, ‘ইসলামী আন্দোলন এনসিসির কার্যপরিধির মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান নিয়োগের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করে। এটা নির্বাহী বিভাগের হাতে থাকতে পারে। তবে বিচার বিভাগ যেহেতু স্বাধীন, তাই প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টিও এনসিসির কার্যপরিধির মধ্যে থাকার বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন মত দিয়েছে।’
আলোচনা শেষে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘এবি পার্টি এনসিসি গঠন ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতিতে সম্মত।’
এছাড়া বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ আরো কয়েকটি দল এনসিসি গঠনের পক্ষে মত দিয়েছে।
এদিকে এনসিসি গঠনে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের সম্মতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। সংলাপ শেষে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে দেখা গেছে, তারা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণমূলক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। এ বিষয়ে অধিকাংশ দলই একমত হয়েছে, যদিও কয়েকটি দল ভিন্নমত পোষণ করেছে।’
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, ‘আমাদের কাছে দুটি প্রস্তাব এসেছে। একটি হলো ইলেকটোরাল পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং অন্যটি বিদ্যমান বিধান সংস্কার করে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা পুনর্বিন্যাস। সবাই এ বিষয়ে একমত হয়েছে।’










