জাতীয় পার্টির (জাপা) ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুর। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই দলটির প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মূলত তাদের সঙ্গেই বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি প্রার্থীদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে ভোটারদের অভিমত। দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে জাপা প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় অন্য আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে।

রংপুরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিন হেভিওয়েট প্রার্থী। তারা হলেন জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম ও এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। জাতীয় নেতা হলেও ভোটের মাঠে তাদের কেউই এবার সহজ জয় পাচ্ছেন না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

জিএম কাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত রংপুর-৩ আসনে। এবারো জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী জানিয়ে জিএম কাদের বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রংপুরের মানুষ আমাকে ভালোবাসে। মানুষের মধ্যে আগ্রহ, উৎসাহ আগের তুলনায় বেশি। আমার বিশ্বাস, যদি সঠিক পরিবেশ থাকে তাহলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে আমি জয়লাভ করব।’

জিএম কাদের বিপুল ভোটে জয়ের প্রত্যাশার কথা বললেও মাঠের বাস্তবতা এতটা সহজ নয় বলে মনে করেন রংপুর সদরের ভোটাররা। তারা বলছেন, জাতীয় পার্টি, লাঙ্গল প্রতীক কিংবা জিএম কাদেরের প্রতি মানুষের এক ধরনের সহানুভূতি থাকলেও এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। এবার আসনটি দখলে নিতে জোর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিএনপি প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু ও জামায়াতে ইসলামীর মাহবুবুর রহমান বেলাল। জিততে হলে বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে জিএম কাদেরকে ‘ফাইট’ দিতে হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা।

বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানও। অন্য দলের শীর্ষ নেতারা যখন ভোটের প্রচারে দেশজুড়ে চষে বেড়াচ্ছেন, সেখানে জিএম কাদের নির্বাচনের শুরু থেকেই নিজ আসনের মাঠ কামড়ে পড়ে আছেন। এর বাইরে গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি। এ বিষয়টিও তার অবস্থানকে এলাকায় জটিল করে তুলেছে।

রংপুর-২ আসন থেকে নির্বাচনে লড়ছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম। এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আনিছুল ইসলাম মণ্ডল। স্থানীয়রা বলছেন, এ আসনে এবার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেই। একই আসনে বিএনপি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোহাম্মদ আলী সরকার, যিনি একসময় জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ছিলেন।

রংপুর-৪ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। ভোটের মাঠে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী আখতারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীও জাতীয় পার্টির প্রার্থী, আবু নাসের শাহ মো. মাহবুবার রহমান। বিএনপির প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসারও এলাকায় রয়েছে জনপ্রিয়তা। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, শুরুতে এলাকায় আখতারের জনপ্রিয়তা খুব একটা ছিল না। ১১ দলীয় জোটের সমর্থনের পর জামায়াতের তৎপরতায় বর্তমানে ভোটের মাঠ কিছুটা গুছিয়ে নিতে পেরেছেন এনসিপির এ শীর্ষ নেতা।

স্থানীয় এ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস দিলেও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী আখতার হোসেন। গতকাল এক পথসভায় তিনি বলেন, ‘আগে যারা আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে বিএনপি-জামায়াতকে ভোট দিতেন, এখন তারা বিএনপিকে ঠেকাতে এনসিপি-জামায়াত তথা ১১ দলীয় জোটকে ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দেশী-বিদেশী যত ষড়যন্ত্রই থাকুক না কেন, জনগণ ১১ দলীয় জোটকে বিজয়ী করে সরকার গঠন করবে।’

রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনে এবার এক অদ্ভুত ও জমজমাট লড়াই হতে যাচ্ছে। এখানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী উভয় দল থেকেই অধ্যাপক গোলাম রব্বানী নামে দুজন প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছেন। একই নাম ও একই পদবি হওয়ায় এই দুই প্রার্থীকে নিয়ে এলাকায় ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী এসএম ফখর উজ-জামান জাহাঙ্গীরও বেশ শক্তিশালী অবস্থানে আছেন। সব মিলিয়ে ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও লাঙ্গলের মধ্যে এক হাড্ডাহাড্ডি ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছেন স্থানীয় ভোটাররা।

রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনটি ‘ভিআইপি’ পরিচয়ের কারণে বরাবরই অনন্য। এ আসন থেকে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ভোটে জয়ী হয়ে সংসদে গেছেন। এবারের নির্বাচনে অবশ্য জুলাই আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদের ‘স্মৃতি’ এক বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার কবর জিয়ারতে এসেছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াত আমির শফিকুর রহমান। আসনটিতে ধানের শীষের সাইফুল ইসলাম এবং জামায়াতের জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তা নুরুল আমিনের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে অবশ্য আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা নুর মোহাম্মদ মণ্ডল বিএনপিকে সমর্থন দেয়ার গুঞ্জনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এ লড়াই কেবল দুই দলেই সীমাবদ্ধ নেই; প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন জাতীয় পার্টির নূর আলম মিয়াও। এবি পার্টির ছাদেকুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের সুলতান মাহমুদসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও মাঠে সক্রিয় রয়েছেন; যা পীরগঞ্জের নির্বাচনী সমীকরণকে একটি বহুমাত্রিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রূপ দিয়েছে।

অন্যদিকে রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া ও আংশিক সিটি করপোরেশন) আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মঞ্জুম আলীর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় লাঙ্গল প্রতীক লড়াই থেকে ছিটকে পড়েছে। বর্তমানে পাঁচ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও মূল লড়াই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে ধানের শীষের মোকাররম হোসেন সুজন ও দাঁড়িপাল্লার মো. রায়হান সিরাজীর মধ্যে।

রংপুর নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুরের আট উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০২। এর মধ্যে নারী ভোটার ১৩ লাখ ৬ হাজার ৩৩৩ ও পুরুষ ভোটার ১২ লাখ ৯২ হাজার ৮৩৮ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৩১ জন। জেলার ছয়টি আসনে মোট কেন্দ্রের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭৩টিতে। ছয়টি আসনে পোস্টাল ভোটের সংখ্যা ২৩ হাজার ৫৬৭।