প্রকল্প গ্রহণে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জনগণের করের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিনিয়োগের সুফল, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশগত গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করেই প্রকল্প নেয়া হবে।’ একই সঙ্গে অর্থনীতির সুফল সব মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পিকেএসএফ ভবনে আয়োজিত ‘রিকভারি অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট’ (রেইজ) প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ‘স্টেপিং ফরওয়ার্ড: দ্য ইনাগুরেশন অব রেইজ-২’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিকেএসএফ চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, সম্মাননীয় অতিথি ছিলেন বিশ্বব্যাংকের অ্যাক্টিং ডিভিশনের ডিরেক্টর ফর বাংলাদেশ অ্যান্ড ভুটান ড. গেইল এইচ মার্টিন। স্বাগত বক্তব্য দেন পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের। এছাড়া বিভিন্ন অংশীজন উপস্থিত ছিলেন।

পরিকল্পনা কমিশনে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্প জমা আছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেকোনো প্রকল্প আসার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড বজায় রাখতে হবে। প্রথমত, সেই প্রকল্পের রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট কী, দ্বিতীয়ত এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে কিনা এবং তৃতীয়ত পরিবেশগত দিক বিবেচনায় এটি কতটা যুক্তিযুক্ত—এ বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে। এ মানদণ্ডগুলো মিট না করলে আমরা সেই প্রজেক্ট করব না। কারণ এটা সরকারের টাকা না, এটা বাংলাদেশের মানুষের টাকা; ট্যাক্স পেয়ারের টাকা। প্রতিটি প্রজেক্টের পেছনের ভাবনা ও এর বেনিফিট সাধারণ মানুষকে জানতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের স্লোগান হচ্ছে অর্থনীতিকে গণতন্ত্রায়ণ করা। এর অর্থ হলো বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা এবং তারা অর্থনীতির সুফল পাচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করা। যারা সবসময় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাইরে থেকে গেছে, তাদের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। এ দর্শনের অংশ হিসেবে সরকার মেগা প্রজেক্টের পরিবর্তে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে জোর দিচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষক কার্ড এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। আগামী বাজেটে এর প্রতিফলন দেখা যাবে।’

মন্ত্রী আরো বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিকে অংশগ্রহণমূলক করতে হবে। সবাই যেন অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারে, সেটিই সরকারের লক্ষ্য।’

পিকেএসএফের কার্যক্রমের প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির কাজ সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ কার্যক্রমে সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।’

পিকেএসএফকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬’-এ ভূষিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সংস্থাটির চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান বলেন, ‘বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের সিংহভাগই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকেন্দ্রিক এবং জিডিপিতে এর অবদান বর্তমানে ৩০ শতাংশের বেশি। এ খাতের উন্নয়নে পিকেএসএফ প্রায় ৪০ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে সংগঠিত করেছে এবং এর মাধ্যমে প্রায় ৭০ লাখ পূর্ণকালীন কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে। এ নীরব বিপ্লবকে টেকসই করতে বৈদেশিক সাহায্যের পাশাপাশি দেশীয় অর্থের সংস্থান প্রয়োজন।’

বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর গেইল মার্টিন বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতি বছর ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান প্রয়োজন, যেখানে গত কয়েক বছরে গড়ে ৯ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। আমাদের কেবল কর্মসংস্থানের সংখ্যা বাড়ালেই চলবে না, চাকরির গুণগত মান এবং তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির দিকেও নজর দিতে হবে, যাতে তারা পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। রেইজ প্রকল্পের প্রথম ধাপ অত্যন্ত সফল হয়েছে। পরবর্তী ধাপে আমরা নারীদের কর্মসংস্থানে বিশেষ গুরুত্ব দেব।’

বিশেষ অতিথি নাজমা মোবারেক জানান, পিকেএসএফ অর্থায়নের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং কারিগরি, প্রযুক্তি ও বাজার সংযোগ সৃষ্টিতে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের টেকসই উন্নয়নে কাজ করছে। ভবিষ্যতে এসব উদ্যোগ আরো বিস্তৃত হবে বলে আশা করেন তিনি।

২০৩০ সালে সমাপ্ত হতে যাওয়া রেইজ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে সরাসরি উপকৃত হবেন ৪ লাখ ২৩ হাজার ১০০ জন। অংশগ্রহণকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে চর, হাওর, পার্বত্য ও উপকূলীয় এলাকার মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের তরুণদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। পাশাপাশি দলিত, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী তরুণদের অন্তর্ভুক্তকরণে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১ হাজার ৬০০ নারীকে ‘হোম বেজড চাইল্ডকেয়ার’ উদ্যোক্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।