আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী। সম্প্রতি লন্ডনে অনুষ্ঠিত প্রধান উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যকার বৈঠক এবং বিএনপির আগামী দিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিকা মাহজাবিন
শুরুতেই লন্ডনে অনুষ্ঠিত প্রধান উপদেষ্টা ও তারেক রহমানের মধ্যকার বৈঠক নিয়ে জানতে চাই।
দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ। এ বৈঠকের ফলাফল নিয়ে শুধু বাংলাদেশের নয়, বহির্বিশ্বেরও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল। এর অন্যতম কারণ বিগত ১৬ বছর দীর্ঘ ত্যাগের মধ্য দিয়ে জনগণ গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছেন। অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ও পঙ্গুত্ববরণের পর জনগণের গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার যে প্রত্যাশা সেটি নির্বাচন ব্যতীত সম্ভব নয়। এর মাধ্যমে জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক অধিকার ও মালিকানা ফিরে পাবে। সেজন্য এ বৈঠক ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হলো, এ বৈঠকের মাধ্যমে একটি মিল ঘটেছে। আমরা কীভাবে দ্রুত নির্বাচনের দিকে যেতে পারি সে বিষয়ে ঐক্য হয়েছে। এটিই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের দিনক্ষণ না আসার কারণে যে শঙ্কা ও অনিশ্চিত পরিবেশ ছিল সেটি থেকে জাতি বেরিয়ে এসেছে; এক ধরনের স্বস্তি বিরাজ করছে। নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আস্থা এসেছে।
বৈঠকের ফলাফল নিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বা বিএনপি কি সন্তুষ্ট?
বিএনপি ও তারেক রহমানের সন্তুষ্টির চেয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে এ বৈঠক কতটুকু সফল হয়েছে সেটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের প্রত্যাশিত ফলাফল এসেছে বলে মনে করি। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে—এমন প্রত্যাশা নিয়ে জনগণের যে আশঙ্কা ছিল সেটি থেকে জনগণের মধ্যে স্বস্তি এসেছে। এ বৈঠক নিয়ে তারেক রহমান সাহেব অত্যন্ত ইতিবাচক ছিলেন। সেভাবেই বিএনপি কাজ করেছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষ থেকেও জাতির প্রত্যাশা পূরণের বিষয়টি কাজ করেছে।
লন্ডনের বৈঠক নিয়ে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বিবৃতি দিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। এটিকে বিএনপি কীভাবে দেখছে?
কোনো দলের বিবৃতি নিয়ে কথা বলতে চাই না। সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং কথা বলার অধিকার থাকবে। এ সংস্কৃতি বাংলাদেশে আসতে হবে। কেউ দ্বিমত পোষণ করেছে বিধায় তার বিরুদ্ধে কথা বলে আরেকটি বিতর্ক সৃষ্টি করতে হবে, এমনটি আমরা মনে করি না। বিএনপির রাজনীতিতে আমরা এক ধরনের গুণগত পরিবর্তন আনতে চাই। আর সেটি হলো সহিষ্ণুতা। অন্যের মতামতের প্রতি দ্বিমত পোষণ করেও সম্মান দেখাতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে না পারলে হাজার সংস্কার করেও কোনো লাভ হবে না। বাংলাদেশের বড় সমস্যা ছিল যে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া বিগত দেড় দশকে যা ঘটেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে।
বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে সংস্কার ও বিচারের বিষয়ে পর্যাপ্ত অগ্রগতি অর্জন করা প্রয়োজন হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়গুলো পূরণ না হলে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কোনো প্রভাব পড়বে কি?
যৌথ বিবৃতিতে কোন কাজগুলো করতে হবে সে বিষয়ে বলা হয়েছে। আমরা ঐকমত্য পোষণ করেছি। সংস্কারগুলোও ঐকমত্যের পরিপ্রেক্ষিতে হবে। বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং তারেক রহমান উভয়ই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। সুতরাং যে বিষয়গুলোয় সবাই ঐকমত্য পৌঁছাবে, সেসব ক্ষেত্রে সংস্কার হবে। আর যেসব প্রস্তাবে ঐকমত্য হবে না, সেগুলো নিয়ে প্রত্যেকটি দল তাদের ম্যান্ডেট আগামী নির্বাচনে জাতির কাছে নিয়ে যাবে এবং পরবর্তী সংসদে তা নিয়ে আলোচনা হবে। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে জয়ী হতে পারলে আগামী সংসদে আমরা পাস করব। এগুলো এক-দেড় মাসের মধ্যে সমাধান করা খুবই সহজ—সেটি সংস্কার হোক কিংবা অন্য কোনো বিষয়।
এ বৈঠকের পর নির্বাচন বিলম্বিত হওয়া কিংবা এ নিয়ে আর কোনো অনিশ্চয়তা দেখেন কিনা।
বিলম্বিত হওয়ার সুযোগই নেই। গণতন্ত্রের জন্য মানুষ দীর্ঘদিন ত্যাগ স্বীকার করেছে। নির্বাচন যত বিলম্বিত হবে ততই তা দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে। ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচনের যে সিদ্ধান্ত এসেছে, ওই সময় নির্বাচন হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। এছাড়া ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের ব্যাপারে প্রায় সব দলের ঐক্যমত্য আছে। অনেক দল সেটি বলেছেও।
নির্বাচন প্রসঙ্গের বাইরে দেশের অর্থনীতিতে, বিশেষত পুঁজিবাজার, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কারে সরকার কি কোনো প্রভাব ফেলছে বা কোনো অগ্রগতি আনতে পেরেছে?
এক্ষেত্রে খুব একটা প্রত্যাশা নেই। কারণ এমন অন্তর্বর্তী পরিস্থিতিতে অনেক কিছু করা যায় না। জনগণ আস্থা পায় না। সিদ্ধান্ত তৈরির প্রক্রিয়ায় ধীরগতি থাকে। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা নির্বাচিত সরকারের অধীনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা নিতে চান। ফলে তাদের সিদ্ধান্তগুলোও স্থগিত থাকে। সেজন্য আগামী সরকারকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
দেশের ব্যাংক খাত থেকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেয়া হয়েছে। অথচ দীর্ঘমেয়াদি ঋণের উৎস হওয়ার কথা ছিল পুঁজিবাজার। ভালো কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে যায়নি। পুঁজিবাজার দলীয়করণের মাধ্যমে লুটপাট করে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগ ও অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজার বড় একটি জায়গা। তাই পুঁজিবাজারকে আবার গড়ে তুলতে হবে। এখানে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জোগান হতে হবে পুঁজিবাজার থেকে। সেজন্য এখানে পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। ইকুইটি, বন্ড থেকে শুরু করে আরো অনেক প্রডাক্ট রয়েছে সেগুলো দাঁড় করাতে হবে। পুঁজিবাজার যদি ঘুরে দাঁড়ায় দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে। অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীরাও সে পুঁজি ব্যবহার করতে পারবে। এছাড়া এখানে কর্মসংস্থানের একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে।
ব্যাংকের বিষয় বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজনৈতিক লুটপাটের মাধ্যমে এ খাতকে যে জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেখান থেকে পুনরুদ্ধারে আমাদের স্বল্পমেয়াদি আমানত ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিয়ে ভাবতে হবে। এক-দুই বছরের জন্য আমানত নিয়ে দশ বছরের ঋণ দেয়া হয়। এগুলো অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা। ব্যাংক খাতকে এ ধরনের ব্যবস্থা থেকে সরে আসতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংক আইন পরিবর্তন এবং ব্যাংকগুলোর ওপর পারিবারিক কর্তৃত্ব বন্ধ করা জরুরি। সবচেয়ে জরুরি হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতিতে মুদ্রানীতি প্রণয়নসহ ব্যাংক খাতের ওয়াচডগ হিসেবে তাদের যে প্রধানতম দায়িত্ব রয়েছে সেগুলো স্বতন্ত্রভাবে পালন করতে দিতে হবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পেশাদার ব্যক্তিদের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের কোনো সুযোগ নেই।
বিএনপির সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যে গভর্নরদের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, সেখানে কোনো দলীয়করণ ঘটেনি। বিএসইসির বেলায়ও তাই। যে কারণে ব্যাংক খাতে বিদ্যমান যেসব সংকট রয়েছে সেগুলো বিএনপির শাসনামলে ঘটেনি। শেয়ারবাজারে বিএনপির শাসনামলে কোনো কেলেঙ্কারি হয়নি। বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের ভূমিকা অনেক বেড়ে গেছে। তাই এগুলো স্বাধীনভাবে পরিচালিত হওয়ার পাশাপাশি ওয়াচডগ হিসেবে দায়িত্বপালনও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের উদারীকরণও জরুরি।
আসন্ন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে কি আপনারা সন্তুষ্ট? এ নিয়ে আপনাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছিল?
প্রস্তাবিত বাজেট নিয়েও মন্তব্য করতে চাই না। আগেই বলেছি এটা অন্তর্বর্তী সময়। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের বাজেট নিয়ে খুব বেশি সমালোচনা করার প্রয়োজন নেই। তবে তাদের চলতি বাজেট থেকে সরে এসে বর্তমান সংকট মোকাবেলা করতে পারে এমন একটি বাজেট প্রণয়ন করা উচিত ছিল। পুরনো বাজেটের ধারাবাহিকতা মানেই পুরনো লুটপাটের প্রকল্পের পুনর্মূল্যায়ন হয়নি। ওই প্রকল্পগুলোর পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। সেগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করে আগামী দিনে বাংলাদেশের যে অবকাঠামোগত পরিকল্পনা আসবে সেগুলোর জন্য দিকনির্দেশনা দিতে হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এটিই বোধহয় উচিত ছিল।
আর আগামী দিনে বিএনপি কী করবে তা আমাদের বাজেট প্রেজেন্টশনে বলা হয়েছে। যদিও সবকিছু বলা সম্ভব হয়নি, তারপরও অনেক কিছুর ধারণা দেয়া হয়েছে।
বন্দর ব্যবস্থাপনা বিদেশীদের হাতে দেয়াকে আপনারা কীভাবে দেখেন?
নির্বাচিত সরকার ব্যতীত অন্য কোনো সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়াকে ভালো মনে করি না। এগুলোর সঙ্গে জনমতের ব্যাপার সম্পৃক্ত—দেশের জন্য ভালো কোনটি, কারা কী বলছে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে এগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থের বিষয় যখনই আসবে সেখানে জনগণের অংশীদারত্ব ও মালিকানা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
২০০১-০৬ সালের বিএনপি ক্যাবিনেট নিয়ে অনেক বিতর্ক ছিল। এবারের ক্যাবিনেট কেমন হতে পারে? এ নিয়ে কি আপনারা কাজ করছেন?
নিশ্চয়ই প্রত্যেকবারের অভিজ্ঞতার আলোকে উন্নতির দিকেই যেতে হবে। দেশ গড়ার প্রত্যয় এবং অসংখ্য প্রাণ ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসেছি। বাংলাদেশের মানুষের মনোযোগের পরিবর্তনের ফলে যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা জেগেছে তেমন একটি ক্যাবিনেট বিএনপি যদি নির্বাচিত হয় তখন গঠন করবে বলে আমি আশা করি।
সুশাসন, দুর্নীতির মতো বিষয়ে বিগত সরকার সমালোচিত হয়েছে। এক্ষেত্রে বিএনপি কীভাবে কাজ করবে?
দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ নিয়ে মানুষের যে প্রত্যাশা সেটি অবশ্যই সুশাসনের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। এ ব্যাপারে ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে এখন থেকেই সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে, যদি দায়িত্ব পাই তাহলে স্বচ্ছতার সঙ্গে দেশটাকে দুর্নীতিমুক্ত করা হবে। এখানে স্বচ্ছতার প্রশ্ন বারবার আসবে। দুর্নীতিমুক্ত করার বিষয়টি কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপরও নির্ভর করে। সশরীরে গিয়ে কাজ কম করতে হলে দুর্নীতি কমানো যাবে। সরকারি অফিসে কম যেতে হলে দুর্নীতি কমবে। অনলাইনে কর এবং বিল প্রদানসহ অন্য বিষয়গুলোয় অটোমেশন করতে পারলে দুর্নীতি কমে আসবে। কাজটি আমরা করব বলে আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মোট কথা দায়বদ্ধতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হবে। আমি ওয়াচডগের কথা বলেছি। নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে চলতে দেয়ার চর্চা বৈশ্বিকভাবে রয়েছে। এ ধরনের ভালো চর্চার প্রচলনের পরিকল্পনা আছে। এগুলোয় যারা উত্তীর্ণ হবে তারাই থাকবে। অর্থাৎ মানদণ্ডগুলো নির্ধারণ করতে হবে। যাতে এ মানদণ্ডগুলোর বাইরে কিছু হলে তারা বাধাগ্রস্ত হন। সুতরাং একদিকে নীতি প্রণয়ন, অন্যদিকে উদারীকরণ ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত এবং নজরদারি থাকতে হবে। তৃতীয়ত, পৃথিবীর ভালো চর্চাগুলো গ্রহণ করে আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে। সব জায়গায় চেক অ্যান্ড ব্যালান্স থাকতে হবে। এতে সুশসান ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ বহুলাংশে নিশ্চিত হবে।
আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গেও আপনার কাছে জানতে চাই। ইরান-ইসরায়েল সংঘাত বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অনেক কিছুই বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশে এ যুদ্ধের প্রভাব কেমন হতে পারে বলে মনে করেন?
যেকোনো যুদ্ধের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। সেজন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা। বিশ্বের এমন পরিস্থিতিতে এ ক্ষেত্রগুলো যত বেশি স্থিতিশীল থাকবে আমাদের পুরো ব্যবস্থা তত টেকসই হবে। অর্থনীতিকে শক্তিশালী কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার মান এবং আইনের শাসনসহ অন্য মৌলিক বিষয়গুলোয় আমরা যদি স্থিতিশীল থাকতে পারি তাহলে আমাদের অবস্থান ভালো পর্যায়ে থাকবে। বিশ্বে এমন কঠিন অবস্থা আসবে-যাবে কিন্তু তখন আমাদের অবস্থান স্থিতিশীল থাকবে।
পাশাপাশি জাতির স্বার্থে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমি আগেই বলেছি প্রত্যেকটি দলের নিজস্ব দর্শন ও চিন্তাভাবনা থাকবে। কিন্তু যেখানে জাতির স্বার্থ সেখানেই জাতীয় ঐক্য থাকতে হবে।
বাংলাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গারা রয়েছে। এখানে কোনো ঝুঁকি দেখছেন কি?
একটি ঝুঁকি আছেই। বদ্ধ জায়গার মধ্যে তারা থাকছে। তাদের লেখাপড়ার সে রকম সুযোগ এখনো আমরা সৃষ্টি করতে পারিনি। মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে কাজ করার জন্য তাদের যে শিক্ষা দরকার সেদিকে আমাদের মনোযোগী হতে হবে। তাদের সুনাগরিক হয়ে ফেরত গিয়ে ওই সমাজের সঙ্গে একীভূত হতে হবে। যতদিন এখানে আছে সেভাবেই তাদের তৈরি করতে হবে। এখানে থাকলেও যথাযথ শিক্ষিত নাগরিক না হলে আমাদের জন্যও এক ধরনের ভয়ের ব্যাপার রয়েছে। কারণ তারা অন্যদিকে ধাবিত হতে পারে। অর্থাৎ আমাদের দেশে যাতে অস্থিরতা সৃষ্টি না করে সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে তাদের ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টাকে আমাদের আন্তর্জাতিকীকরণ করতে হবে। যা বিগত সরকার পারেনি। বিএনপি সরকার দুইবার করতে পেরেছে, প্রথমবার জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এবং পরেরবার খালেদা জিয়ার সময়ে।
ভারত বাংলাদেশের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে। এখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কেমন দেখেন? বিএনপি নির্বাচিত হলে এ সম্পর্কটি কেমন হবে?
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তিতে থাকতে হবে তিনটি বিষয়। সেগুলো হলো পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ, কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের নয়, পরস্পরের স্বার্থ রক্ষা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা চলবে না। তিনটি বিষয়ের ওপর উভয় দেশের সম্পর্ক এগিয়ে যেতে পারে। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কে দীর্ঘদিন এ জায়গাগুলোয় সমস্যা হয়েছে। এ জায়গা থেকে বের হতে হলে ভারতকে এসব ক্ষেত্রে মনোযোগী হতে হবে। যেকোনো বিষয়ে বাংলাদেশ আলোচনা এবং সমাধান করতে পারবে। কিন্তু আমি বলছি যে সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি হবে এ তিন বিষয়। ভারতকে অতীতের মনোজগৎ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যেতে কষ্ট হবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরবেন কবে?
তিনি দীর্ঘদিন দেশের বাইরে আছেন, ফিরবেন নিশ্চিতভাবেই। অতিরিক্ত একদিনও দেশের বাইরে থাকার কোনো ইচ্ছে তার নেই। তিনি দেশে ফেরার জন্য অপেক্ষা করছেন, দলের নেতাকর্মীরা অপেক্ষা করছেন। প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তিনি। হয়তো যেকোনো দিন তিনি ফেরার তারিখ ঘোষণা করবেন বলে আমি আশা করি। তবে দিনক্ষণটি কবে হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন।
তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে যেমন মানুষের আগ্রহ রয়েছে, তেমনি উনার রাজনৈতিক কার্যক্রমে সংস্কারের প্রসঙ্গটি নিয়ে তীব্র আকাঙ্ক্ষাও জনগণের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। সংস্কার নিয়ে বিএনপি বছরের পর বছর কথা বলে আসছে। এ মুহূর্তে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো মিলে সংস্কার বিষয়ে ঐক্যমত্য প্রয়োজন। আর যেগুলোয় ঐকমত্য হবে না সেসব বিষয় রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কাছে নিয়ে যাবে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণকে পাশে নিয়ে সংস্কারে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রস্তুত। আসন্ন নির্বাচনই পারবে দেশকে যথাযথ সংস্কারের দিকে নিয়ে যেতে।










