অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আগামীকাল সোমবার। দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষীদের জবানবন্দি, জেরা ও আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের জন্য এ দিন ধার্য করেন বিচারক। কক্সবাজার জেলা দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইলে আদালতে এ রায় ঘোষণা করা হবে।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর এলাকায় চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় দুটি এবং রামু থানায় একটি মামলা দায়ের করে। ঘটনা ধামাচাপা দিতে সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং মাদক আইনে মামলা দুটি দায়ের হয়। টেকনাফ থানায় দায়ের করা এসব মামলায় নিহত সিনহার সঙ্গী সাইদুল ইসলাম সিফাতকে আসামি করা হয়। এছাড়া রামু থানায় মাদক আইনে দায়ের করা মামলাটিতে আসামি করা হয় নিহতের অপর সঙ্গী শিপ্রা দেবনাথকে।
একই বছর ৫ আগস্ট নিহত সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে ৯ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কক্সবাজার আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এতে প্রধান আসামি করা হয় টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সাবেক ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে। মামলার অন্য আসামিরা হলেন- টেকনাফ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন, কনস্টেবল আবদুল্লাহ আল মামুন, সহকারি উপপরিদর্শক (এএসআই) লিটন মিয়া, এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মোহাম্মদ মোস্তফা।
মামলাটি টেকনাফ থানায় নথিভূক্ত করার পর আদালত তদন্তভার দেন র্যানবকে। একই সঙ্গে পুলিশের দায়ের করা মামলা তিনটিও র্যাপবকে তদন্ত করার আদেশ দেন আদালত। ৬ আগস্ট সকালে মামলাটি টেকনাফ থানায় নথিভুক্ত করে তদন্তের জন্য র্যাকবকে হস্তান্তর করা হয়। ওইদিন বিকেলে মামলায় অভিযুক্ত ৯ জনের মধ্যে সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।
একই দিন পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মোহাম্মদ মোস্তফা নামে কোনো পুলিশ সদস্য জেলা পুলিশে কর্মরত ছিল না। পরে সেদিনই আত্মসমর্পণকারী আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।
র্যা ব মামলার তদন্তকালীন ২০২০ সালের ১১ আগস্ট গ্রেফতার করে পুলিশের দায়েরকৃত মামলার তিন সাক্ষী টেকনাফের মারিশবনিয়া এলাকার মো. নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আয়াজ ও নিজাম উদ্দিনকে। পরবর্তীদের তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়। একই দিন তাদের ১০দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
মামলা তদন্তের এক পর্যায়ে ২০২০ সালের ১৮ আগস্ট এপিবিএন’র তিন সদস্য এএসআই শাহজাহান মিয়া, কনস্টেবল মো. রাজীব ও কনস্টেবল মো. আবদুল্লাহকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করে র্যায়ব। ওইদিনই তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ড আবেদনও করা হয়।
২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর কনস্টেবল রুবেল শর্মাকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে র্যা ব। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে ওইদিনই রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। কারাগারে থাকা এ ১৪ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের মধ্যে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও কনস্টেবল রুবেল শর্মা ছাড়া অন্য ১২ আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর র্যা ব-১৩ কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের জেষ্ঠ্য সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) খাইরুল ইসলাম ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন।
অভিযুক্তদের মধ্যে ১৪ জন কারাগারে থাকলেও টেকনাফ থানার কনস্টেবল সাগর দেব পলাতক ছিলেন। অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয় ৮৩ জনকে। একই দিন পুলিশের দায়ের করা মামলা তিনটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর আদালত অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করে পলাতক আসামি কনস্টেবল সাগর দেবের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। সেই সাথে পুলিশের দায়ের তিনটি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলা থেকে সাইদুল ইসলাম সিফাত ও শিপ্রা দেবনাথকে অব্যাহতি প্রদান করেন আদালত।
এরপর জেষ্ঠ্য বিচারিক হাকিম তামান্না ফারাহ’র আদালত থেকে মামলাটির কার্যক্রম জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেনের আদালতে স্থানান্তর করা হয়। ২০২১ সালের ২৪ জুন পলাতক আসামি কনস্টেবল সাগর দেব আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। আদালত ওইদিনই তাকে কারাগারে পাঠান।
২০২১ সালের ২৭ জুন আদালত ১৫ আসামির বিরুদ্ধে বিচার কাজ শুরুর আদেশ দেন। সেই সাথে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ২৬ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত দিন ধার্য করেন। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে আদালতের বিচার কার্যক্রম স্থগিত থাকায় ধার্য দিনগুলোতে সাক্ষ্যগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে ২০২১ সালের ২৩ আগস্ট থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮ দফায় ৮৩ জনের মধ্যে ৬৫ জন সাক্ষ্য দেন। এর মধ্যে প্রথম দফায় ২৩ থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনদিনে দুজনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়। দ্বিতীয় দফায় ৫ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চারদিনে সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয় চারজনের। তৃতীয় দফায় ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনদিনে সম্পন্ন হয় আটজনের।
চতুর্থ দফায় ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্ব পর্যন্ত দুদিনে সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা করা হয় ছয়জনকে। পঞ্চম দফায় ১০ থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত তিনদিনে ১৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়। ষষ্ঠ দফায় ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত তিনদিনে সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয় ২৪ জনের। সপ্তম দফায় ১৫ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত তিনদিনে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ ৬ জন সাক্ষ্য দেন। এদের মধ্যে ৫ জনের জেরা সম্পন্ন হলেও তদন্ত কর্মকর্তার জেরা অসম্পন্ন ছিল।
সর্বশেষ অষ্টম দফায় ২৯ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনদিনে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়। এরপর ৬ ও ৭ ডিসেম্বর আসামিরা ফৌজদারী কার্যবিধি ৩৪২ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দেন।
সবশেষে চলতি বছর ৯ থেকে ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত মামলায় উভয় পক্ষের আইনজীবীগণ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শেষ দিনে আদালত ৩১ জানুয়ারি মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।
এছাড়া মেজর সিনহা নিহত হওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। গঠিত কমিটি তদন্ত শেষে একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। তবে ওই তদন্ত প্রতিবেদনে কী ধরণের বিষয়বস্তু উলল্লেখিত ছিল তা প্রকাশ পায়নি। একই ইস্যুতে কক্সবাজারের পুলিশ সুপারসহ একযোগে দেড় সহস্রাধিক পুলিশ সদস্যকে অন্যত্রে বদলি করে তদস্থলে নতুন পুলিশ সদস্যদের পদায়ন করা হয়।
সিনহা হত্যার রায় কাল
অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আগামীকাল সোমবার। দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষীদের জবানবন্দি, জেরা ও আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের জন্য এ দিন ধার্য করেন বিচারক। কক্সবাজার জেলা দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইলে আদালতে এ রায় ঘোষণা করা হবে।











