সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমরা সংসদে ১০০টি আসন সংরক্ষিত নারীদের জন্য বরাদ্দ করার প্রস্তাবনা দিয়েছি। যেন নারীরা বৈষম্যের স্বীকার না হয়। নারীরা যদি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকে তাহলে বৈষম্য কমে আসবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে যেভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা ত্রুটিপূর্ণ। এ জন্যই নিয়মকানুন ও সংস্কার দরকার ও নতুন আইনের খসড়া দরকার।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন হওয়ার কথা। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় এটি নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ একটি প্রতিষ্ঠান। গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন করতে হলে নিয়োগ পদ্ধতি বদলাতে হবে, আইনকানুন পরিবর্তন করতে হবে। যারা অন্যায় করেছে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আমাদের বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারবে। নির্বাচন সংক্রান্ত আইনগুলো অধ্যাদেশ আকারে জারি করে যত দ্রুত কার্যক্রম শুরু করা যায় তত দ্রুত নির্বাচন হবে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে সকাল নয়টায় সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের (সিজিএস) অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারের অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজন ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ: সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান প্রসঙ্গ’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা বলেন তিনি। সংলাপটি পরিচালনা করেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।

সংলাপের শুরুতে জিল্লুর রহমান বলেন, সংস্কার শব্দটি ঘৃণিত শব্দে পরিণত হয়েছে। সংস্কার জরুরি। সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ গত ৫৩ বছরে প্রতিষ্ঠানকে ঠিক করতে পারেনি। আমাদের আগে নজর দিতে হবে সঠিক ব্যবস্থা করার। নেতা ভুল করতে পারে কিন্তু সিস্টেম ঠিক থাকলে শুধরাবার সুযোগ থাকে।
অ্যাম্বাসেডর এম শফিউল্লাহ বলেন, বিগত বছরে আমরা দেখেছি যে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে নিয়োগ দিয়ে থাকে। রাষ্ট্রপতিকে জনগণ নিয়োগ দেবে। তাহলে রাষ্ট্রপতিকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হবে। বর্তমানে কোনো দলের ম্যান্ডেট নেই। সঠিক ও সুষ্ঠু নির্বাচন আমাদের দরকার বিশ্বে পরিচিতি পেতে।
অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। জুলাই-আগস্টে আন্দোলন হয়েছে অর্থনীতির জন্য, চাকরির জন্য। সংস্কার করে পরে ক্ষমতা হস্তান্তর করা সম্ভব নয়। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের মধ্যে স্বস্তি আনতে হবে। আমাদের বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিবেশ নেই। বছরের পর বছর অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নষ্ট করে দিয়েছে। এত সংস্কার করার পর নির্বাচিত সরকার যদি তা না মেনে নেয় তাহলে জনগণ আবার অসহায় হয়ে পড়বে। আমাদের তথ্যের অভাব রয়েছে। বিভিন্ন চুক্তির তথ্য আমরা জানি না। বর্তমান সরকার যদি উন্নতি না দেখাতে পারে তাহলে তাদেরকে ব্যর্থতা নিয়ে চলে যেতে হবে।
ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, বাংলাদেশ ওয়েস্ট মিনিস্টার সিস্টেমে চলে না। এখানে জয়ীরা সব নিয়ে নেয়। বাংলাদেশে তিনটি বডির মধ্যে সেপারেশন অব পাওয়ার আনা খুব জরুরি। সংস্কার রাতারাতি সম্ভব নয়। সংবিধান সংস্কার কমিশনের রিপোর্টে পার্লামেন্টকে দ্বিকক্ষ করার প্রস্তাব এসেছে। এর সঙ্গে আমি একমত। আইনসভায় সংবিধান সংস্কারে নারী আসন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এ নারী আসনে তারাই আসে যেসব পুরুষ আসন পায় না। নারী আসনে নির্বাচনের মাধ্যমে আসতে হবে। সেন্সিটিভ বিষয়ে প্রয়োজনে গণভোট নিতে হবে। জুডিশিয়ারিকে আলাদা করতে হবে।
আব্দুল হক বলেন, ব্রিটিশ কলোনিতেও রবার্ট ক্লাইভকে বিচারে আনা হয়েছে। আমাদের ৬ মাস হয়েছে কিন্তু এখনো কোনো অপরাধীর বিচার হয়নি। সিরিয়াতে খুব অল্প সময়ের মধ্যে অপরাধীর বিচার হয়ে গিয়েছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি করা দরকার যেমনটি ভিয়েতনামে করেছে স্কিল ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে, যার জন্য তারা বিনিয়োগের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া। আমাদের পুঁজি বা বিদেশী বিনিয়োগ আনতে হবে।
অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, আমাদের মন মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। অনেক আগে থেকেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নিয়োগ হয়ে এসেছে আমাদের দেশে। জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন তৈরি করা উচিত। দ্রুততম সময়ে যে সংস্কার করা জরুরি তা করা দরকার।
ড. জাহেদ উর রহমান বলেন, আমরা শেখ হাসিনার পতন চেয়েছি। তার পতনের পর আমরা কিছু আশা চাপিয়ে দিয়েছি। কমিশনের কাজ করার জন্য ইচ্ছা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কার জনগণের ভেতরে থাকলে কোনো রাজনৈতিক দল সে সংস্কার বিরোধী হতে পারবে না।
সংস্কারের জন্য নির্বাচন লাগবে উল্লেখ করে জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রস্তাবনা যা তৈরি হয়েছে, কিছুর সঙ্গে আমরা একমত আবার কিছুর সঙ্গে একমত না। নির্বাচন লাগবে সংস্কার করার জন্য। বাংলাদেশে এখন সিস্টেম তৈরি করতে হবে, রাষ্ট্রে পরিবর্তন আনতে হবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জনগণের জন্য তৈরি করা। বিরোধী দল ও সরকারের মধ্যে কন্সেন্সাস থাকতে হবে।
মানুষের পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে সোহরাব হাসান বলেন, মানুষ পরিবর্তন না হলে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন হবে না। প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন না হলে মানুষ পরিবর্তন হবে না। শেখ হাসিনা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বাধা দিয়েছে তাই তার পতন হয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐক্যমত থাকতে হবে।
ছাত্র প্রতিনিধি মুনমুন মাহজাবিন বলেন, দ্বিকক্ষ বিষয়ে আমি একমত। কর্ম কমিশনে পুলিশ ভেরিফিকেশনে ভিন্ন দলকে সমর্থন দিলে তাকে গেজেটে বাদ দেয়া হয়। এ জিনিসগুলোকে ঠিক করতে হবে। তাদেরকে কেন বাদ দেয়া হচ্ছে সেটির ব্যাখ্যা দিতে হবে। ভয়ের সংস্কৃতি এখনো আছে। স্বাধীন মত প্রকাশে এখনো বাধা আছে। ৫ থেকে ৬ মাস হয়ে গেছে কিন্তু এখনো এটির কোনো সমাধান আসেনি। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে দলের লোকদেরকে নিয়োগ দেয়া হয়। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া উচিত। সরকারি চাকরিজীবী বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কেউ ভুল করলে ওই প্রতিষ্ঠানই তার বিচার করে। এতে ছাড় দেয়ার একটা সুযোগ চলে আসে। এগুলো সংশোধন করা উচিত।
সংলাপে আলোচকদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ; সাবেক কূটনৈতিক, অ্যাম্বাসেডর এম শফিউল্লাহ; সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) চেয়ার মুনিরা খান; বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, সাবেক জজ, কলামিস্ট ও আইনি পরামর্শদাতা ইকতেদার আহমেদ; বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আব্দুল হক; গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী; সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক, ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ; রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি মেম্বার ড. জাহেদ উর রহমান; ইষ্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসী; সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল; সিনিয়র সাংবাদিক আবু সাঈদ খান; এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু; গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি; জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এম এ আজিজ; প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান; পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে এস মং ও ছাত্র প্রতিনিধি মুহাম্মদ খালিদ খান।










