কিছু বিষয় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্যের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন হবে। বাকিগুলো ভবিষ্যতে যারা দেশ পরিচালনা করবেন তাদের পথনির্দেশ তৈরি করে দেয়ার জন্য।’

গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে ‘দ্য স্টেট রিফর্মস অ্যান্ড ইলেকশন ডিসকোর্স ইন ট্রানজিশনাল ডেমোক্রেসিস: ফ্রম মাস আপরাইজিং টু ইলেকশন অ্যান্ড স্টেট বিল্ডিং’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী ‘ফার্স্ট পলিটিক্যাল সায়েন্স কনফারেন্স’-এ তিনি এ কথা বলেন।

দুই দিনব্যাপী এ কনফারেন্সের প্রথম দিনে গতকাল ১০টি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন সেশনে চেয়ার ও আলোচক ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ব্যারিস্টার এম মঈন আলম ফিরোজী, কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলামসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। আজ কনফারেন্সের দ্বিতীয় দিনে বাকি সেশনগুলো অনুষ্ঠিত হবে।

‘শ্যাডো রিফর্ম কমিশন’, ‘শ্যাডো ন্যাশনাল কনসেনসাস কমিশন’ ও ‘পলিটিক্যাল অ্যান্ড পলিসি সায়েন্স রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ যৌথভাবে কনফারেন্সটি আয়োজন করেছে।

কনফারেন্সে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান। এছাড়া উদ্বোধনী ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এএসএম আমানুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক নাছিমা খাতুন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এএসএম আমানুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক নাছিমা খাতুনসহ অন্যরা। এ অধিবেশন পরিচালনা করেন কনফারেন্সের আহ্বায়ক অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।

আলী রীয়াজ বলেন, ‘অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, যেসব দেশে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পটপরিবর্তন হয়েছে সেখানে ৬০ শতাংশ রাষ্ট্রই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। সফলতার মুখ দেখেছে ৪০ শতাংশ রাষ্ট্র। মূলত নির্বাচনই পারে স্বৈরশাসকের পথ বন্ধ করতে। বাংলাদেশ এখন এ চ্যালেঞ্জের মধ্যেই রয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করা অন্তর্বর্তী সরকারের একার কাজ নয়। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। সরকারও সেভাবেই কাজ করে চলেছে।’

পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্ব দ্রুতগতিতে পরিবর্তন হচ্ছে। অন্যান্য দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো ভারত-বাংলাদেশের যে “‍আন ইজি” সম্পর্কটি রয়েছে তা নিয়ে কাজ করা। বৈশ্বিক সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক সম্পর্কগুলো বাংলাদেশের কেমন হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে এখন থেকেই কাজ করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখানে আরো একটি চ্যালেঞ্জ হলো মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এটি নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘অনেক সময় যেসব সরকার ক্ষমতা হারিয়েছে, তাদের সমর্থকেরা ইচ্ছাকৃতভাবে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আটকে দিতে চায় এবং গণতন্ত্রকে দুর্বল করার চেষ্টা করে। তারা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেয়। যদি সরকার সত্য তথ্য দিয়ে এর জবাব দিতে না পারে এবং কিছুটা স্থিতিশীলতা বা সদিচ্ছা দেখাতে না পারে, তাহলে এটি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।’

ঢাবি উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আমরা এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে এ সময় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সব রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন দূর করে আমাদের একযোগে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার ও নেটওয়ার্ক বৃদ্ধিতে এ সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করি।’

দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, ‘রাষ্ট্র যখন ট্রানজিশনাল পর্যায়ে থাকে, তখন তা শক্তিশালী ও স্বচ্ছ ইনস্টিটিউশন গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করে। যদি আমরা এ সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারি, তবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ হবে উজ্জ্বল ও আশাব্যঞ্জক। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্ম ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছ নির্বাচন ও দুর্নীতি অবসানের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে। এ অভ্যুত্থান লাখো মানুষের মনে নতুন আশা ও প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে।’

কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এ কনফারেন্সে বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীসহ অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা তাদের গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ উপস্থাপন করছেন। এসব প্রবন্ধ বর্তমান বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচনকে ঘিরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা থেকে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ খুঁজে পেতে সহায়ক হবে। এ সম্মেলনকে আমরা যেন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি এবং জ্ঞান আহরণ, ভাবনার বিনিময়, ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের লক্ষ্যে একসাথে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করি।’