পাশে দাঁড়িয়ে হতাশ চোখে তাকিয়ে আছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেদির হাওরের কৃষক সেফুল মিয়া। তিন একর জমিতে বোরো আবাদ করতে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করেছিলেন। কিন্তু অতিবৃষ্টি আর উজানের ঢলে অর্ধেক ফসল তলিয়ে গেছে। যা বাঁচানো গেছে, তাও আধাপাকা অবস্থায় কাটতে হয়েছে। এখন সে ধান তিনি বিক্রি করছেন মাত্র ৬০০ টাকা মণে। উৎপাদন খরচের হিসাবে এতে প্রতি মণে ৩০০-৪০০ টাকা লোকসান হচ্ছে। হতাশ কণ্ঠে এসব কথা জানান সেফুল মিয়া। মলিন মুখে বলেন, ‘ঋণ শোধ করমু না সংসার চালামু, এই চিন্তায় আছি।’
হাওরাঞ্চলে এবার বোরো মৌসুমে প্রায় সব কৃষকের অবস্থাই এমন। টানা বৃষ্টি ও মেঘলা আকাশের কারণে ফসল শুকাতে পারছেন না হাওর অঞ্চলের কৃষকরা। এতে বোরো ধানের দাম আরো কমে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা। কৃষকরা জানিয়েছেন, কাটা ধান ভেজা থাকায় তা থেকে অঙ্কুর গজাচ্ছে। এতে সেই ধান বাজারে বিক্রির অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই নামমাত্র মূল্যে ধান বিক্রি করছেন তারা। এতে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচও উঠছে না। অথচ সরকারিভাবে কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা, অর্থাৎ মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা দাম নির্ধারণ থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই।
আলাপকালে কৃষকরা জানান, নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে যখন বোরো ধান পাকা শুরু হয়, তা কেটে ঘরে তোলার মুখে আকস্মিক ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে তলিয়ে গেছে প্রায় শতভাগ হাওর। খালিয়াজুরীসহ মদন, মোহনগঞ্জ, কেন্দুয়া, আটপাড়া, কলমাকান্দা, বারহাট্টা ও জেলা সদরের হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে কৃষকরা কোনোভাবে ধান কাটতে পেরেছেন, তারাও এখন পড়েছেন নতুন সংকটে। ভেজা ধান শুকানোর জায়গা নেই, মাঠেই পচে যাচ্ছে সেগুলো। দুদিন ধরে রোদ ওঠার পর কিছু ধান শুকানো গেলেও সঠিক দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা।
মাঠে ব্যাপারী (ফড়িয়া) এবং বাজারে ক্রেতার অভাব আর সরকারি গুদামে বিক্রির কঠিন শর্ত, সব মিলিয়ে কৃষকের হাতে থাকা ধানও হয়ে উঠেছে বোঝা। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ ধানের দাম ৭৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা থাকলেও এখন তা কমে ৬০০ টাকায় নেমে এসেছে, যা উৎপাদন খরচের প্রায় অর্ধেক। নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার বিধান সরকার জানান, তিনি শুরুতে প্রতি মণ ৭৫০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু গতকাল দাম কমে ৬০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, পর্যাপ্ত রোদের অভাবে ধান ঠিকমতো শুকানো যাচ্ছে না, ফলে দাম আরো পড়ে যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে সরকার ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করলেও কৃষকরা সাড়া দিতে পারছেন না। সরকারি গুদামে ধান বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট মান ও আর্দ্রতার শর্ত পূরণ করতে হয়। তবে বৃষ্টির কারণে অধিকাংশ কৃষকের ধানেই আর্দ্রতা বেশি থাকায় তা গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না।
জেলা খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ৩ মে নেত্রকোনায় আনুষ্ঠানিকভাবে ধান-চাল ক্রয় অভিযান উদ্বোধন করেন জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। উদ্বোধনের পর গতকাল পর্যন্ত নেত্রকোনা সদর ও কলমাকান্দা উপজেলায় ১১ হাজার টন ধান কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
প্রান্তিক চাষীরা বলছেন, শুধু মানের শর্তই নয়; প্রক্রিয়াগত জটিলতাও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধান বিক্রির জন্য ব্যাংক হিসাব খোলা, তালিকায় নাম ওঠানো, গুদামে ধান পৌঁছে দেয়াসহ নানা প্রক্রিয়া তাদের জন্য বাড়তি ভোগান্তি তৈরি করছে। ফলে অনেকেই সরকারি ক্রয় কার্যক্রমের বাইরে থাকছেন, বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, নেত্রকোনার উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম জানান, আগাম বন্যায় নেত্রকোনায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১৮ হাজার ৪০০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর জমির ফসল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৬০ হাজার কৃষক।
এদিকে কিশোরগঞ্জ জেলার কয়েকটি হাওর ঘুরে দেখা যায়, ইটনা, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, নিকলীসহ বিভিন্ন এলাকায় একই অবস্থা। কোমর পানির মধ্যেই ধান কাটছেন কৃষকরা। খলায় এনে শুকাতে না পেরে ভেজা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অনেক জায়গায় সে ধানে অঙ্কুর গজাচ্ছে। মিঠামইনের গোপদীঘির গ্রামের কৃষক আলাল মিয়া বলেন, ‘ঋণ করে সাত বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। খলায় আনার পর ৬০০-৭০০ টাকা দাম বলে। ভেজা ধান কেউ নিতে চায় না। সরকার ১ হাজার ৪৪০ টাকায় ধান কিনবে বলে শুনেছি, তবে সে খবরও ঠিকমতো পাইনি। পেলেও কী, তলিয়ে যাওয়া ধানের রঙ ও ভালোভাবে না শুকানোর কারণে সরকারি গুদামে ধান নেবে না।’
নিকলীর কৃষাণী আমেনা খাতুন বলেন, ‘রোদ নাই, ধান শুকায় না। খলাতেই নষ্ট হচ্ছে। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। সরকারি গুদামে দিতে গেলে শুকনো ধান লাগে, চকচকে রঙ লাগে, সে সুযোগ তো এবার আমরা পাইনি।’ ধান ব্যবসায়ী মজলু খাঁ বলেন, ‘ভেজা ধান কিনলে ঝুঁকি বেশি থাকে। শুকাতে খরচ, ওজন কমে যাওয়া ও মান নষ্টের কারণে কম দামেই ধান কিনছি।’ তবে কৃষকদের অভিযোগ, সংকটাবস্থার সুযোগে ফড়িয়ারা ইচ্ছেমতো দাম চাপিয়ে দিচ্ছেন।
কিশোরগঞ্জের সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোশারফ হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে জেলার ১৩ উপজেলা থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে ১৮ হাজার ৩৩০ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত মান বজায় থাকলে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা হবে।
পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত মান বজায় রেখে ধান গুদামে দিতে হবে, এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়া হবে না।’ মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে তিনি বলেন, ‘মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা যাতে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করতে না পারেন, সে বিষয়ে জেলা মনিটরিং কমিটির সভায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন বণিক বার্তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার প্রতিনিধি)










