মাঘের শেষ ভাগে এসে শীতের দাপট অনেকটাই কমে এসেছে উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আমেজ এলাকায় যোগ করেছে ‘বাড়তি উষ্ণতা’। ভোটের মাঠে জোর প্রচারণায় ব্যস্ত প্রার্থীরা। সভা, সমাবেশ, জনসংযোগ—কোনো কিছুরই কমতি রাখছেন না কেউ। জেলায় সবচেয়ে ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনিও ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। প্রচারণার শুরু থেকেই আসন্ন নির্বাচনকে নিজের ‘শেষ নির্বাচন’ হিসেবে উল্লেখ করছেন প্রবীণ এ রাজনীতিবিদ। তার এই ‘শেষ নির্বাচনে’ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর তরুণ প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসনে ইসলামী আন্দোলনের একজন প্রার্থী থাকলেও মির্জা ফখরুল ও দেলাওয়ার হোসেনের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন এলাকার মানুষ।
১৯৯১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও-১ আসনে সব মিলিয়ে ছয়বার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জয় পেয়েছেন কেবল ২০০১ সালে। এবার সপ্তমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মাত্র একবার জয়ী হলেও এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয় বিএনপির এ বর্ষীয়ান নেতা। একসময় শিক্ষকতা পেশায় থাকার কারণে ছোট-বড় অনেকেই ‘স্যার’ হিসেবেই সম্বোধন করেন তাকে। তবে ভোটের পথ তার জন্য খুব একটা মসৃণ অবস্থায় নেই বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা। এজন্য অবশ্য মির্জা ফখরুলকে নয়, বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদেরই বেশি দায়ী করছেন তারা।
এলাকায় ফখরুলের জনপ্রিয়তা নিয়ে কথা হচ্ছিল হাজীপাড়ার বাসিন্দা মকবুল হোসেনের সঙ্গে। পেশায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক মকবুল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা এলাকায় ব্যাপক উৎপাত শুরু করেছেন। দখল, চাঁদাবাজিসহ অকারণে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছেন তারা। ফখরুল সাহেবকে তো ভোটের পর পাওয়া যাবে না। তিনি জিতলে এলাকার বিএনপি নেতাকর্মীদের দাপট আরো বেড়ে যাবে। এ কারণে অনেকেই হয়তো বিএনপির বদলে জামায়াতকে ভোট দেবে।’
এসব সমীকরণ আমলে না নিয়ে নিজের প্রচার-প্রচারণা ও জনসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন মির্জা ফখরুল। গতকাল দুপুরে সদর আসনের ফাড়াবাড়ী স্কুল মাঠে নির্বাচনী গণসংযোগে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের পুরনো মানুষ, পরীক্ষিত মানুষ, এটা আমার শেষ নির্বাচন। এবারে ধানের শীষে ভোট দিয়ে কাজ করার সুযোগ দেবেন। ভোট আপনাদের আমানত, এটা খেয়ানত করব না। আমরা বাপ-দাদার জমি বিক্রি করে রাজনীতি করি। সততার সঙ্গে কাজ করেছি, ভবিষ্যতেও করব।’ নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় গিয়ে নানা জাতীয় ইস্যু নিয়েও কথা বলছেন বিএনপি মহাসচিব।
ভোটের মাঠে ফখরুলকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি। বর্তমানে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য। তরুণ নেতা হিসেবে এলাকায় বেশ ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে তার। জামায়াতের নিজস্ব ভোট ব্যাংক এবং বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের ‘অত্যাচারে অতিষ্ঠ’ মানুষের ভোট নিয়ে জয়ের স্বপ্ন দেখছেন দেলাওয়ার।
নিজের নির্বাচনী প্রচারণায় এলাকার উন্নয়নে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি, দলীয় প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজির অভিযোগ তুলেও বক্তব্য রাখছেন দেলাওয়ার হোসেন। গতকাল এক নির্বাচনী জনসংযোগে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী জাতি আশা করেছিল এবার তারা চাঁদাবাজ, দখলবাজ, টেন্ডারবাজ ও লুটেরাদের হাত থেকে রেহাই পাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে যেভাবে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, লুটতরাজ, জুলুম-নির্যাতন ও মামলাবাজি হতো, এখনো সেভাবেই হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে এ ধরনের সব অপকর্ম কঠোর হস্তে দমন করা হবে।’
বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন ছাড়াও ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের (হাতপাখা প্রতীক) প্রার্থী খাদেমুল ইসলাম।
জেলা সদরের বাইরে ঠাকুরগাঁও-২ (বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর ও রানীশংকৈল আংশিক) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট সাত প্রার্থী। অতীতে আসনটিতে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল আওয়ামী লীগের প্রার্থী দবিরুল ইসলামের। তিনি ঠাকুরগাঁও-২ আসন থেকে সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমানে একাধিক মামলায় কারাগারে আছেন এ বর্ষীয়ান নেতা। তার অনুপস্থিতিতে আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী আব্দুস সালাম ও জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল হাকিমের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা।
জেলার তিন সংসদীয় আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে (পীরগঞ্জ ও রানীশংকৈল আংশিক)। মোট ১০ প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপির জাহিদুর রহমান, জাতীয় পার্টির হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ এবং জামায়াতে ইসলামীর মিজানুর রহমানের মধ্যে হবে বলে মনে করছেন এলাকার ভোটাররা।










