শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, যুগ যুগ ধরে নিপীড়িত ও বঞ্চিত শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শ্রম সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও জনআকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সবার জন্য একটি মর্যাদাকর শ্রমপরিবেশ গড়ে তোলায় সহায়তা করতে আমরা শ্রম সংস্কার কমিশন কাজ করবে।
তিনি বলেন, শ্রম সংস্কার কমিশন বাংলাদেশের সব শ্রমিকের অধিকারের সুরক্ষা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নে সচেষ্ট থাকবে।
শ্রম অধিকার ও শ্রমিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব করার লক্ষ্যে গত ১৭ নভেম্বর বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে ১০ সদস্য বিশিষ্ট শ্রম সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। উক্ত কমিশনের ১ম সভা আজ বৃহস্পতিবার বিজয়নগরে অবস্থিত শ্রম ভবনে অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন কমিশন প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, শ্রমিকের জন্য গণতান্ত্রিক শ্রম আইন, শোভন ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, কাজের নিরাপত্তা, জাতীয় ন্যূনতম ও ন্যায্য-মর্যাদাপূর্ণ মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা, সংগঠিত হওয়া ও দরকষাকষির অধিকার এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার, অবাধে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার, দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন ও ব্যবসায়ী সংগঠনের চর্চা, শিল্প খাত বিকাশের স্বার্থে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি পর্যালোচনা ও সুপারিশসহ ন্যায্য অংশীদারত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কমিশন প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন করবে। যে সুপারিশগুলো সুষ্ঠু শ্রমিক ও শিল্প স্বার্থ এবং শিল্পসম্পর্ক চর্চা, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং মর্যাদাকর বাংলাদেশ গড়ে তোলার অভিযাত্রায় অবদান রাখবে।
বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ যুগ যুগ ধরে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কৃষি খাতে নিয়োজিত আছেন। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে শিল্প খাতেও। ‘শ্রমিক’ হিসেবে শিল্প খাতের শ্রমিকদের আইনগত স্বীকৃতি থাকলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সিংহভাগ শ্রমিকের আইনগত স্বীকৃতিই নেই। আবার দেশে ও বিদেশে কর্মরত আমাদের শ্রমিক ভাইবোনেরা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেও অদ্যাবধি তারা রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রত্যাশিত মর্যাদা লাভ করতে পারেননি এবং সামাজিকভাবেও তারা মর্যাদাহীন অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো শ্রমিককে ছোট করে দেখা আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ হয়ে গেছে।
ঘরে ঘরে গৃহশ্রমিক নির্যাতন, প্রতিনিয়ত নির্মাণ শ্রমিকদের মৃত্যু, শিপব্রেকিং কিংবা পরিবহন খাতের দুর্ঘটনা শ্রমিকদের প্রতি নীতিনির্ধারক ও সমাজের অবহেলাজনিত দৃষ্টিভঙ্গিকেই ফুটিয়ে তোলে বলে কমিশন প্রধান উল্লেখ করেন।
এছাড়াও সমাজের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অংশ সুইপার বা পরিচ্ছন্নতা কর্মীদেরকে সমাজকাঠামোর বাইরে রেখে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ কিংবা বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয় জানিয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সব শ্রমিক এবং দেশের বাইরে কর্মরত সব অভিবাসী শ্রমিক, সবার অধিকার সুরক্ষা ও কল্যাণে ভূমিকা রাখাসহ তাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনে এ কমিশন প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে বলে তিনি জানান।
শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান বলেন, শ্রমিকরা নিজেদের কাজ নিজেরাই খুঁজে নিচ্ছেন। কর্মবাজারে নতুন নতুন শ্রম খাত তৈরি হচ্ছে। আইটি, পরিবহন, খাবার সরবরাহ ইত্যাদি খাতে প্রচুর মানুষ কাজ করছেন কোনো ধরনের আইনগত সুরক্ষা ছাড়াই। দেশের ৮৫ শতাংশের বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদেরকে অদ্যাবধি আইনগত সুরক্ষার আওতায় আনা যায়নি। আবার প্রতিবছর ২০ লাখের বেশি শ্রমশক্তি কর্মবাজারে যুক্ত হচ্ছে। ফলে চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা চরম আকার ধারণ করেছে। শ্রমিকদের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি, এ দূরত্বসুলভ আচরণ পরিহার করে উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে তাদেরকে প্রাপ্য সম্মান দেয়ার বিষয়ে কমিশন কাজ করবে।
তিনি বলেন, সার্বিকভাবে এ দেশে এখনো কোনো ‘জাতীয় ন্যূনতম মজুরি’ ঘোষণা করা হয়নি। শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা তাৎক্ষনিক পরিশোধের জন্য 'জররী বিসদকালীন তহবিল'ও নেই। যারা শ্রম আইনের বাইরে রয়েছে তাদের জন্য অদ্যাবধি মজুরির কোনও মানদক্ষও ঠিক করা হয়নি। যার ফলে দেশে তীব্র হয়ে উঠেছে মজুরি বৈষম্য, আর বেড়েই চলছে আয়বৈষম্য- অগ্রগতির পথে যা বড় অন্তরায়।
সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ আশাবাদী করলেও এ বিপুল শ্রমশক্তি সঠিকভাবে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা না করায় এবং অটোমেশনের কারণে কাজ হারাচ্ছেন লাখ লাখ কর্মক্ষম নারী শ্রমিক। কাঙ্ক্ষিত মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ডে-কেয়ারসহ নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ না থাকায় চাকুরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক নারী। অথচ শ্রমবাজারে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলে উন্নয়নের পথে দেশ অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে ৪র্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন, শ্রমিক ও উদ্যোক্তাদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ওপর আমাদেরকে গুরুত্ব দেয়ার বিষয়ে সভায় উল্লেখ করা হয়।
শ্রম সংস্কার কমিশনের ১ম সভায় অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শ্রম কর্মসংস্থান এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. মাহফুজুল হক, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটি বাংলাদেশ এবং ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) সভাপতি তপন দত্ত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের অধ্যাপক ও গবেষক ড. জাকির হোসেন, বাংলাদেশ লেবার কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এবং সলিডারিটি সেন্টারের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর অ্যাডভোকেট এ কে এম নাসিম, বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভা প্রধান তাসলিমা আখতার প্রমুখ।










