গ্রামাঞ্চলের ডিম উৎপাদনকারী কৃষকেরা এখন এমন ব্যবসায়ী খুঁজে নিতে পারেন, যিনি বেশি দামে ডিম কিনবেন। অন্যদিকে, বিভিন্ন শহরের ডিম ব্যবসায়ীরাও এমন সরবরাহকারী খুঁজে নিতে পারেন, যিনি কম দামে ডিম বিক্রি করতে রাজি। কোনো শহরে ডিমের দাম মূলত নির্ধারিত হয় সেখানে ডিমের সরবরাহ ও চাহিদার ওপর । মুঠোফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তারের ফলে তৈরি হয়েছে এমন একটি তথ্য-নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে হাজার হাজার ডিম উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ী বিভিন্ন এলাকার দাম তুলনা করতে পারছেন।
ডিম ও মুরগির মাংসের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের পোলট্রি শিল্পও বড় হয়েছে । হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভের (এইচআইইএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে মাথাপিছু ডিম খাওয়ার পরিমাণ ১৪৫ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে প্রতিদিন মাথাপিছু ডিম খাওয়ার পরিমাণ ৫ দশমিক ২ গ্রাম থেকে বেড়ে ১২ দশমিক ৭৩ গ্রামে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে মুরগি ও হাঁসের মাংসের মাথাপিছু দৈনিক ভোগ ২৮৫ শতাংশ বেড়েছে। এই বৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৮ গ্রাম থেকে ২৬ দশমিক ১৭ গ্রামে পৌঁছেছে।
পোলট্রি শিল্পের দ্রুত প্রবৃদ্ধি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সরবরাহ সীমিত করছে এমন কোনো কার্টেল নেই। দাম বাড়লে নতুন কোম্পানি ও কৃষকেরা পোলট্রি ব্যবসায় প্রবেশ করেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো ব্যবসায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধা না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে কার্টেল গঠন ও টিকিয়ে রাখা কঠিন।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও বলছেন, ডিম উৎপাদক বা ব্যবসায়ীদের পক্ষে কার্টেল গঠন করা বাস্তবে কঠিন। কারণ, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ডিম কেনাবেচা করছেন এবং মুঠোফোনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারদর সহজেই জানা যাচ্ছে। কোনো ব্যবসায়ী বেশি দাম চাইলে ক্রেতারা অন্য বিক্রেতার কাছ থেকে ডিম কিনতে পারেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ডিমের দাম বাড়ার পেছনে গরমের মাসগুলোতে ডিমের উৎপাদন কমে যাওয়াকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ডিমের দাম কম থাকায় অনেক প্রান্তিক খামারি লোকসান এড়াতে মুরগি বিক্রি করে খামার বন্ধ করে দেন। ফলে উৎপাদনও কমে যায়।
টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার হরিপুর গ্রামের ২৮ বছর বয়সী পশুচিকিৎসক ও খামারি ডা. সাব্বির হোসেনের খামারে রয়েছে ৩ হাজার ৫০০টি লেয়ার মুরগি। তিনি বলেন, “আমি দেশের সব জায়গার ডিমের দাম জানি। আমাদের কাছ থেকে ডিম কেনা আড়তদাররা দাম ঠিক করতে পারেন না, আমরাও পারি না। আসলে এমন কোনো কেন্দ্র নেই যেখানে ডিমের দাম নির্ধারণ করা হয়।”
তাঁর মতে, তথ্যপ্রযুক্তির কারণে এখন পোলট্রি খামারিরা সহজেই বিভিন্ন বাজারের দাম জানতে পারেন। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে (গত ১৭ সেপ্টেম্বর) তিনি জানান, প্রতিটি ডিম ১১ টাকা দরে বিক্রি করে আজ লাভ হয়েছে। তবে বছরের অনেক মাস তাঁকে কম দামে ডিম বিক্রি করে লোকসান গুনতে হয়েছে।
মধুপুরের লুচিয়া-নগরবাড়ির ছোট খামারি নজরুল ইসলাম (৫২) বলেন, তাঁর মতো ছোট কৃষকেরা যে ব্যবসায়ী বেশি দাম দেন, তাঁর কাছেই ডিম বিক্রি করেন। তাঁর ভাষায়, “ইন্টারনেটসহ মুঠোফোন থাকায় আমরা যেকোনো সময় বাজারদর জানতে পারি।”
ঘাটাইলের পাকুটিয়ায় নূর ডিমের আড়ত পরিচালনা করেন জাহাঙ্গীর খান (৪২) । তিনি প্রতিদিন কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় ২০ হাজার ডিম কিনে মৌলভীবাজার ও ঢাকার পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন।
তিনি বলেন, “প্রতিদিন সকালে আমি মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাজারদর সম্পর্কে ধারণা নিই। এরপর কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ফোন করে একটি দাম প্রস্তাব করি ।”
জাহাঙ্গীর খান জানান, ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে চাহিদা বাড়লে গ্রামাঞ্চলের বাজারেও ডিমের দাম বেড়ে যায়। “কৃষকেরা মুঠোফোনের মাধ্যমে বাজারদরের তথ্য পেতে পারেন বলে তাঁরা ভালো দামে ডিম বিক্রি করার সুযোগ পান,” বলেন তিনি।
ঘাটাইলের পোড়াবাড়ির সেতু এন্টারপ্রাইজের অন্যতম মালিক কেরামত আলী খান (৪৮)। তিনি প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ডিম ঢাকার কাপ্তানবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন।
তিনি বলেন, “আমি মূলত টাঙ্গাইল ও জামালপুরের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ডিম কিনি । আমি যখন কিনি বা বিক্রি করি, তখন স্পষ্ট উপলব্ধি করি উভয় ক্ষেত্রেই দাম নির্ভর করে চাহিদা ও সরবরাহের ওপর।”
এ খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ঢাকার তেজগাঁওয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ডিম কেনাবেচা হয়। এটি ঢাকায় প্রতিদিন বিক্রি হওয়া প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডিমের একটি ছোট অংশ। আর সারা দেশে বাণিজ্যিকভাবে প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি ডিম উৎপাদন হয়।
ডিম ব্যবসায়ী সংগঠন এগ ট্রেডার্স মাল্টিপারপাস সমিতির নেতা আমানত উল্লাহ বলেন, “দাম নির্ভর করে সরবরাহ ও চাহিদার ওপর। কেউ এটা প্রভাবিত করতে পারে না।”
ঢাকার কাছে আশুলিয়ায় নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রে কাজী ফার্মস প্রতিদিন প্রায় ৭ লাখ ডিম নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে। কাজী ফার্মসের পরিচালক কাজী জাহিন হাসান বলেন, “আমরা প্রতিদিন আমাদের সব ডিম বিক্রি করার চেষ্টা করি, কারণ ডিম পচনশীল পণ্য।”
তিনি জানান, প্রতিদিন সকালে ক্রেতারা একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তাঁদের প্রস্তাবিত দাম এবং কত পরিমাণ ডিম কিনতে চান, তা জানান। এরপর প্রতিষ্ঠানটি সব দর যাচাই করে এমন একটি সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে, যে দামে তাদের পুরো মজুত ডিম বিক্রি করা সম্ভব।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যদি ৭ লাখ ডিম বিক্রি করতে হয় এবং প্রত্যেক ক্রেতা গড়ে ৫০ হাজার ডিম কিনতে চান, তাহলে সর্বোচ্চ দরদাতা ১৪ জন ক্রেতার কাছেই পুরো ডিম বিক্রি করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে ১৪তম সর্বোচ্চ দরটিই বিক্রয়মূল্য হিসেবে নির্ধারিত হবে। সর্বোচ্চ দর দেওয়া ১৪ জন ক্রেতাই একই দামে ডিম পাবেন। এতে ক্রেতাদের মধ্যে ন্যায্যতার অনুভূতি বজায় থাকে।
অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি পণ্যভিত্তিক নিলাম ব্যবস্থা, যেখানে একাধিক ক্রেতা গোপন দর দেন এবং শেষ পর্যন্ত সবাই একই দামে পণ্য কেনেন।
কাজী জাহিন হাসান বলেন, “আমাদের ক্রেতাদের অন্য বিক্রেতার কাছ থেকেও ডিম কেনার সুযোগ রয়েছে। তাঁরা আমাদের কাছ থেকে কিনছেন, কারণ অন্যান্য বিক্রেতার তুলনায় আমাদের দাম প্রতিযোগিতামূলক।”
তিনি বলেন, বর্তমানে ডিমের চাহিদা সরবরাহের তুলনায় বেশি হওয়ায় নিলামে দাম কয়েক মাস আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে ফেব্রুয়ারিতে সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি থাকায় তাঁদের নিলামে ডিমের দাম প্রতি পিস মাত্র ৭ টাকা ৪৩ পয়সায় নেমে এসেছিল। “এতে চলতি বছর প্রায় পাঁচ মাস ডিম উৎপাদনকারীরা লোকসান করেছেন,” বলেন তিনি।
তাঁর মতে, চাহিদা যখন সরবরাহের চেয়ে বেশি থাকে, তখন ডিমের দাম বাড়ে। এতে ভোক্তারা অসন্তুষ্ট হন, কিন্তু কৃষকেরা লাভ করার সুযোগ পান। আবার সরবরাহ যখন চাহিদার চেয়ে বেশি হয়, তখন দাম কমে যায় । এতে ভোক্তারা স্বস্তি পেলেও খামারিরা লোকসানে পড়েন। “ডিম ও সবজির মতো কৃষিপণ্যের দাম কখনো স্থির থাকে না,” বলেন কাজী জাহিন হাসান।”










