‘নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ প্রবাদটির সঙ্গে আমরা সকলেই পরিচিত। বনের এ মহিষ বহুকাল যাবত গবাদিপশু হিসেবে সুপরিচিত হলেও ঈদ-উল-আজহার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে রূপান্তরিত হতে পারেনি। কোরবানির জন্য গবাদিপশু হিসেবে আমাদের নিকট সর্বাধিক পছন্দ গরু। আর তার পরপরই ছাগল। এছাড়া মহিষ, ভেড়া, উট, দুম্বা ও গাড়ল কোরবানি দেয়া হয়ে থাকে। তবে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেগুলো গরু ও ছাগলের মতো পছন্দের তালিকার শীর্ষে নয়। বিবিএস নিউজ-২০২২ এর তথ্য মোতাবেক, গত ৭-৮ বছর ধরে প্রতি বছর যে পরিমাণ গবাদিপশু কোরবানি হয়ে থাকে তারমধ্যে মহিষের পরিমাণ মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ। শতকরা হারে এত কম সংখ্যক মহিষ জবাই হওয়ার মূল কারণ দেশে মহিষের তুলনামূলক কম উৎপাদন এবং মহিষের মাংসের কম গ্রহণযোগ্যতা।
কোরবানির জন্য গবাদিপশুতে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। চলতি বছরে কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭৩৯টি। চাহিদার তুলনায় দেশে ২১ লাখ ৪১ হাজার ৫৯৪টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে (সূত্র: ডিএলএস-২০২৩)। অথচ একসময় ভারত ও মায়ানমার থেকে কোরবানির সময় পশু না এলে দেশে কোরবানির চাহিদা পূরণ হতো না। ২০১৪ সালে ভারত সরকার বাংলাদেশে গরু প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। এতে কোরবানির পশুর ব্যাপক সংকট দেখা দেয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বিভিন্ন এনজিও, পিকেএসএফ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট খামারিদের যৌথ প্রচেষ্টায় আজ আমরা দেশে উৎপাদিত পশু দিয়েই কোরবানির চাহিদা পূরণ করছি। এই খাতটি দিনে দিনে সম্প্রসারিত হচ্ছে। অনেক শিক্ষিত উদ্যোক্তা এগিয়ে এসেছে। আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর খামার গড়ে উঠছে।
স্বাদ প্রায় একই রকম হলেও মহিষের মাংস গরুর মাংসের মতো ভোক্তাদের নিকট ততোটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেনি। এর অন্যতম কারণ হলো, একসময় আমাদের দেশে যেসব মহিষ জবাই করা হতো তার অধিকাংশই ছিল হাড্ডিসার, বৃদ্ধ বয়সের মহিষ। এসব মহিষের মাংস সাধারণত শক্ত, গাঢ় কালো এবং মোটা আঁশযুক্ত হয়ে থাকে। এ ধরনের মাংস থেকে তীব্র গন্ধ আসার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া এ জাতীয় মাংসে অনেক সময় প্যারাসাইট বা মাংসের পোকা দেখা যায়। মাংস চিবানো কঠিন হয়।এ ধরনের মাংসে intramuscular fat (মাংসের সঙ্গে মিশে থাকা চর্বির পরিমাণ) এর পরিমাণ কম থাকায় মাংসের সরসতা এবং স্বাদ কম হয়। এতে দীর্ঘকাল যাবত মহিষের মাংসের প্রতি ভোক্তাদের আগ্রহ বেশ কম ছিল। তবে আশার কথা হলো, হাড় জিরজিরে মহিষের দিন ফুরিয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি, প্রজনন কৌশল ও উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা মহিষের মাংসের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়ছে। গরুর মাংসের চেয়ে সস্তা এবং পুষ্টিগুণ বহুলাংশে বেশি হওয়ায় সচেতন নাগরিক সমাজের নিকট মহিষের চাহিদা বেড়েছে।
বাংলাদেশে দুই ধরনের মহিষ আছে। জলাভূমি মহিষ ও নদীর মহিষ। জলাভূমির মহিষ শুধু সিলেট বিভাগের জেলাসমূহে পাওয়া যায়, যা দেশের মোট মহিষের ১৪ শতাংশ। দেশের অন্যান্য বিভাগে নদীর মহিষ পাওয়া যায়। উৎপত্তি অনুসারে এসব মহিষ আবার চার শ্রেণিতে বিভক্ত (ক) আদি নদীর মহিষ (খ) দেশি নদীর মহিষ (গ) ভারত থেকে আমদানিকৃত উন্নত নদীর মহিষ ও (ঘ) শংকর জাতের নদীর মহিষ। এক সময় দেশব্যাপী মহিষের বিচরণ থাকলেও চারণভূমির অভাবে এ অঞ্চলগুলোতে মহিষের বিচরণ কমেছে। অন্যদিকে উপকূলীয় চরাঞ্চলসহ পদ্মা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকা ও দেশের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে চারণভূমির আধিক্যসহ অন্যান্য তুলনামূলক সুবিধা থাকায় এসব অঞ্চলে মহিষ পালন বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের মোট মহিষের শতকরা প্রায় ৪০ শতাংশ উপকূলীয় অঞ্চলে পালিত হয়। ‘free range buffalo’বা ‘উন্মুক্তভাবে ছাড়া মহিষ’ নামে যা সমধিক পরিচিত। দীর্ঘকাল ধরে এসব চরে সনাতন পন্থায় মহিষ লালন হলেও বেশ কিছুকাল ধরে আধুনিক পদ্ধতির ছোঁয়ায় মহিষের উৎপাদন বেড়েছে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কারিগরি ও প্রযুক্তিগত চিকিৎসা সেবা পৌঁছে যাওয়ার ফলে রোগ বালাইয়ের কবল থেকে রক্ষা পাচ্ছে মহিষ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি অধিদপ্তরের গবেষণা মোতাবেক, গরুর মাংসের তুলনায় মহিষের মাংসে ৪০ শতাংশ কম কোলেস্টেরল থাকে, ১২ শতাংশ কম চর্বি থাকে, ৫৫ শতাংশ কম ক্যালোরি থাকে, ১১ শতাংশ বেশি প্রোটিন থাকে এবং ১০ শতাংশ বেশি খনিজ থাকে। মহিষের মাংসে ৩ দশমিক ৪২ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে, যা গরুর মাংসের তুলনায় অনেক বেশি। এ আয়রন গর্ভবতী মায়েদের দেহে আয়রনের ঘাটতি মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মহিষের মাংসে ২ দশমিক ৮৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১২ থাকে, যা গরুর মাংসের তুলনায় বেশি। যা শিশুদের দৈহিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য। এছাড়া মহিষের মাংসে মানুষের শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী উচ্চমাত্রার ওমেগা-৩ এবং ওমেগা-৬ এর ভালো সমন্বয় পলিআনস্যাচ্যুরেটেড ফ্যাট রয়েছে, যা রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে আনতে সহায়তা করে। ফলে নিয়মিত মহিষের মাংস ভক্ষণকারীর হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং অন্যান্য প্রদাহজনিত রোগের ঝুঁকি কম থাকে। সামগ্রিক পুষ্টি মান বিচারে মহিষের মাংস গরুর মাংসের তুলনায় সন্দেহাতীতভাবে উৎকৃষ্ট হওয়ার পরও কোরবানির জন্য শীর্ষ পছন্দের তালিকায় শুধু গরু বা ছাগল থাকা কতটা যৌক্তিক?
প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশের মহিষ খাত যথাযথভাবে বিকশিত হয়নি। এ খাতে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। উৎপাদন বাড়লে ভোক্তা বাড়বে। গরু-ছাগলের পাশাপাশি আমরা যদি মহিষ কোরবানিতে উদ্বুদ্ধ হই তাহলে অবহেলিত মহিষ খাত বিকশিত হবে, বাড়বে কর্মসংস্থান। বাড়তি আয়ের মুখ দেখবে উপকূলসহ দেশের মহিষ ঘন প্রান্তিক মহিষ খামারিরা। নিশ্চিত হবে দেশের আপামর মানুষের পুষ্টির নিরাপত্তা।
লেখক : ব্যবস্থাপক, পিকেএসএফ










