মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব ঈদুল আজহার মূল চেতনা আনন্দোৎসবে সবার অন্তর্ভুক্তি আর তাই হাদিসে বিধান রয়েছে উৎসর্গকৃত পশুর মাংসকে তিন ভাগ করার। যার এক ভাগ পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়স্বজন ও আরেক ভাগ দরিদ্র মানুষের জন্য। সমাজে ধনী-গরিব ও পরিবার-প্রতিবেশীদের মাঝে আনন্দ ভাগাভাগি করে সামাজিক সংহতিকে (যাকে ইবনে খালদুন বলেছেন আসাবিয়া) সুদৃঢ় করাই কোরবানির দীক্ষা। আর তাই ঈদ উপলক্ষে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সবাই আনন্দ ভাগাভাগি করে সামাজিক সম্পর্কগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে রাজধানী ঢাকা থেকে মানুষ ছুটে যায় শেকড়ের কাছে।
এবারের ঈদযাত্রায় একটি স্বস্তির বিষয় হচ্ছে সড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রীর চাপ বাড়লেও বাড়িমুখী যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটা কমে গেছে। বণিক বার্তায় প্রকাশ, তৈরি পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় এবারের ঈদ ছুটি ধাপে ধাপে শুরু হওয়ায় দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে হঠাৎ অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ নিতে হচ্ছে না। তাছাড়া সরকারি কর্মচারীদের ছুটি একদিন বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
পদ্মা সেতুর ফলে দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখী মানুষের যাত্রাপথও এখন আর আগের মতো দুর্দশাময় নয়। আমরা প্রত্যাশা করব, সবাই যেন ট্রাফিক আইন মেনে চলে নির্বিঘ্নে ঘরে ফিরে ছুটি কাটিয়ে আবার নিরাপদে কর্মস্থলে ফিরতে পারে, সেজন্য প্রশাসন তাদের তৎপরতা জারি রাখবে।
তবে এ বছর এমন এক সময়ে সবাই ঈদ উদযাপন করছে, যখন স্মরণকালের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য দিনাতিপা ত কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতিতে ঈদ যেন সবার অংশগ্রহণে উৎসবমুখর হয়, সেদিকে নজর দেয়া জরুরি। বস্তুত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস মাংস কেনা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কঠিন হয়ে গেছে। এ সময়ে সমাজে প্রান্তিক আয়ের মানুষের জন্য একটু ভালো খাবারের উপলক্ষ হয়ে উঠবে এ ঈদ। তাই শুধু সামর্থ্যবানদের মধ্যে ঈদের আনন্দ যেন সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটি স্মরণে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ধর্মীয় যে বিধান রয়েছে, সেটি অনুশীলন প্রয়োজন। কোরবানি যেন শুধু ধনীদের ভোজনোৎসব না হয়, কারণ নির্ধনীদেরও স্রষ্টাপ্রদত্ত অধিকার আছে এ আনন্দোৎসবে ভাগীদার হওয়ার।
এ বছর ঈদ উপলক্ষে কোরবানির পশুর কোনো সংকট নেই, এটি খুবই ইতিবাচক সংবাদ। পশু আমদানি না করে দেশীয় পশুসম্পদের মাধ্যমেই কোরবানির ঈদ উদযাপন করা সম্ভব হচ্ছে। এ সফলতার ধারা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তবে উদ্বেগজনক যে চলতি বছর পশুর দাম অনেক বেড়েছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে পশুর দামে। এজন্য বিগত বছরের তুলনায় পশুর দাম বাড়লে বিক্রি কমে যেতে পারে। এমনটি হলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পশু পালনকারী ও খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
কোরবানির ঈদে প্রশাসনকে আরেকটা বিষয় নিয়ে সজাগ থাকতে হবে, তা হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এটি সময়মতো করতে পারলে নগরীর পরিবেশ স্বাস্থ্যকর থাকবে। এজন্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে ডেঙ্গু যেভাবে বিস্তার লাভ করেছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বর্জ্য নির্দিষ্ট সময়েই পরিষ্কার করা দরকার। উল্লেখ্য, ২০১৫ সাল থেকে রাজধানীতে সিটি করপোরেশন কোরবানির জন্য প্রতি ওয়ার্ডে কয়েকটি স্থান নির্দিষ্ট করে দিত। কিন্তু এ বছর সেটি থাকছে না। নগরবাসীর পক্ষ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া না পাওয়ায় হয়তো সিটি করপোরেশনের এ উদ্যোগ থমকে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। কিন্তু সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এ উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল। না হলে অতীতের মতো যেখানে সেখানে পশু কোরবানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা তৈরির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও ঢাকার উভয় সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণ করবে। এটি করা হলে নগরীর পরিবেশের জন্য তা সহায়ক হবে।
কোরবানির ঈদে একটি বড় ইস্যু হলো কাঁচা চামড়ার বেচাকেনা। এ উৎসবে জবাই করা পশুর চামড়ার ওপর আমাদের চামড়া শিল্পগুলো অনেকখানিই নির্ভরশীল। এরই মধ্যে সরকার কিছুটা বাড়িয়ে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু একটা বিষয় লক্ষ রাখতে হবে এ চামড়ার মূল্যের প্রকৃত ভাগীদার অসহায় গরিব মানুষ। তাদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে চামড়ার ন্যায্যমূল্য যেন নির্ধারিত হয় সেটি লক্ষ রাখতে হবে।
বিশ্বব্যাপী চলা অর্থনৈতিক অভিঘাতের এ সময়ে দেশের সাধারণ মানুষ খুব কষ্টে আছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে অনেক মানুষ। বিআইডিএসের জরিপ অনুযায়ী নগরে বৈষম্য বাড়ছে। এমন সময়ে ঈদ উদযাপন যেন বৈষম্যের মাত্রায় নতুন সংযোজন না হয়, ঈদ যেন সবার অংশগ্রহণে উৎসবমুখর হয় সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। যাপিত জীবনে ঈদ বয়ে আনুক সীমাহীন আনন্দ ও অপার্থিব আনন্দের ছোঁয়া। সবাইকে জানাই ঈদ মোবারক।










